আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৪-০৪-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

কী হবে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনি শিল্পের?

এবি সিদ্দিক
| সম্পাদকীয়

কৃষিভিত্তিক রাষ্ট্রায়ত্ত চিনি শিল্পের (বিএসএফআইসি) ভবিষ্যৎ কি অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছে? লোকসানভিত্তিক এ করপোরেশনের লোকসান আর ব্যাংক ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। একে তো কাঁচামাল আখের সরবরাহ কমছে, তার ওপর আখ চাষিরা টাকা পাচ্ছেন না। মাসের পর মাস পার হয়ে গেলেও শ্রমিক-কর্মচারীরা বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। উৎপাদিত ও আমদানিকৃত চিনি বিক্রি হচ্ছে না। আর্থিক সংকটের কারণে করপোরেশনের প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। অর্থাৎ নানা সমস্যায় জর্জরিত এ করপোরেশন। ব্যাংক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি, যার ফলে ব্যাংকও এখন আর ঋণ দিতে চাচ্ছে না। উৎপাদন খরচের চেয়ে অর্ধেকেরও কম দামে চিনি বিক্রি করতে গিয়ে লোকসানের বোঝা ক্রমেই ভারী হচ্ছে। গত এক দশকের গড় হিসাবে বছরে লোকসান গুনতে হচ্ছে ৫০০ কোটি টাকার বেশি। প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী আর কর্মকর্তা বর্তমানে এ করপোরেশনে কর্মরত। মাসের পর মাস বেতন-ভাতা না পেয়ে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের অধীনে মোট ১৫টি চিনিকল চালু রয়েছে, যার মধ্যে তিনটি ব্রিটিশ আমল, নয়টি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আমল এবং তিনটি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্থাপিত হয়েছে। উত্তরবঙ্গে সবচেয়ে পুরোনো চিনিকল হলো নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল, যা ১৯৩৩ সালে তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু নাটোর ও পাবনা অঞ্চলে যে আখ উৎপাদন হতো, তা নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল থেকে অনেক দূরে হওয়ায় পরিবহনে অসুবিধা হতো এবং অনেক আখ নষ্ট হয়ে যেত বলে নাটোর চিনিকলটি নির্মিত হয়েছিল ১৯৮৫ সালে এবং পাবনা চিনিকলটি নির্মিত হয়েছিল ১৯৯৭ সালে। এ চিনিকলগুলো তৈরির সময় কোনো কোনো জায়গায় জমির মালিকানা ছেড়ে দিয়ে কাউকে অন্যত্র চলে যেতে হয়, আবার অনেক মানুষ অন্য অঞ্চল থেকে অভিবাসন করে এ এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলটি যখন তৈরি করা হয়, তখন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক কৃষক ও শ্রমিক আখ চাষ করার জন্য ও শ্রমিক হিসেবে কাজ করার জন্য উত্তরবঙ্গে অভিবাসন করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাদের অনেকেই আর ফেরত যাননি এবং তাদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্ম এখনও খামারে কাজ করছে। অন্যদিকে রংপুর (মহিমাগঞ্জ) চিনিকলটি নির্মিত হয় পাকিস্তান আমলে ১৯৫৫ সালে। সে সময় রংপুর চিনিকল নিজস্ব খামারের জন্য ১৯৫৪-৫৫ অর্থবছরে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ৫নং সাপমারা ইউনিয়নের সাপমারা, রামপুর, মাদারপুর, নরেঙ্গাবাদ ও চকরাহিমপুর মৌজার ১ হাজার ৮৪২ দশমিক ৩০ একর ভূমি অধিগ্রহণ করেছিল। এলাকাটি এখন সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম নামে পরিচিত। বাংলাদেশের চিনিকলগুলোয় বর্তমানে সরাসরি প্রায় ২২ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। আর আখ চাষের ওপর নির্ভর করে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৫০ লাখ মানুষের জীবিকা। কৃষিভিত্তিক চিনি শিল্পকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ এলাকায় রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎকেন্দ্র, ব্যাংক, হাটবাজার, অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। চিনির উপজাত চিটা গুড়, আখের ছোবড়া ইত্যাদি কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করেও বিভিন্ন শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে, যার মাধ্যমে বহু কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। যেমন আখের ছোবড়া কাগজ উৎপাদনে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করায় এ অঞ্চলে পাকশীতে নর্থ বেঙ্গল কাগজ কলটি তৈরি হয়েছিল। যদিও পরে অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার কারণে কলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। আখ থেকে চিটা গুড় উৎপাদন হয় বলে চিটা গুড় তৈরি করেও অনেক মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে। চিনিকলের কাছ থেকে আখ চাষের জন্য প্রয়োজনীয় সার/কীটনাশক/বীজ সরবরাহ করা হয় তা-ও আবার স্বল্প সুদে। চিনি শিল্প বিকাশে স্থানীয় প্রতিবন্ধকতার বাইরেও বিশ্বায়নের এ পৃথিবীতে উদার অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণও কিছু নতুন সংকটের সৃষ্টি করেছে, যার প্রভাব পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত চনিকিলগুলোর ওপর। ২০০২ সালের আগ পর্যন্ত বিএসএফাইসি কর্তৃক এককভাবে চিনি উৎপাদন ও আমদানি করে দেশব্যাপী বিস্তৃত বিপণন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নির্ধারিত দরে সুষ্ঠু বিপণনের মাধ্যমে ভোক্তাসাধারণের স্বার্থ সংরক্ষণ করে আসছিল। পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমান সরকার আবার বিএসএফআইসির মাধ্যমে চিনি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। ২০০২ সালে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে চিনি আমদানি অবাধ করা হয় (বিএসএফআইসি, ২০১৪)। বেসরকারি পর্যায়ে আমদানিকারকরা সাদা চিনি আমদানি করে বাজারজাত শুরু করে। পরে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে পরিশোধিত চিনি উৎপাদনের জন্য সরকারের নিবন্ধিত ছয়টি সুগার রিফাইনারি ২০০৪ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে উৎপাদনে আসে। ২০০২ সালে বেসরকারি উদ্যোগে চিনি আমদানি অনুমোদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় চিনি শিল্প উদারীকরণ। ২০০৪ সাল থেকে রিফাইনারিগুলো উৎপাদনে আসার আগে নিবন্ধনপত্রে শর্ত রয়েছে, উৎপাদিত পণ্যের ৫০ শতাংশ রপ্তানি করা হবে (বিএসএফআইসি, ২০১৪)। কিন্তু এ শর্ত প্রতিপালিত হচ্ছে না। উপরন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত ‘র’ সুগার আমদানি করার সময় মূলত দুটি যুক্তি দেওয়া হয়। ১. বেসরকারি রিফাইনারিগুলো বাড়তি ‘র’ সুগার আমদানি করে দেশে রিফাইন করে বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে। ২. বেসরকারি রিফাইনারিগুলো এ বাড়তি মজুত করা চিনি প্রয়োজনের সময় বাজারে ছেড়ে চিনির মূল্য নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবে। কিন্তু দেখা গেছে, এ প্রাইভেট রিফাইনারিগুলো বিদেশে তো রপ্তানি করছেই না, বরং স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে দেশের ১৫টি চিনিকলে উৎপাদিত চিনির বাজারের কাছে হুমকিস্বরূপ আবির্ভূত হচ্ছে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোর জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত চিনি শিল্প কৃষিভিত্তিক ভারী শিল্প হওয়ায় এ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যেমন বিশাল জনগোষ্ঠী জড়িত, তেমনি ভোক্তাদের মানসম্পন্ন চিনির জোগান দিতেও এই শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সেই সঙ্গে চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণ তো বটেই; বর্তমান সরকার ইতঃপূর্বে এ করপোরেশনের উন্নয়নে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। অজ্ঞাত কারণে সেগুলো থমকে আছে। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, নর্থ বেঙ্গল চিনিকলে কো-জেনারেশন পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ ও সুগার রিফাইনারি স্থাপন। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২৪ দশমিক ১৮ কোটি টাকা। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে কো-জেনারেশন পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে চিনিকলের নিজস্ব প্রয়োজন মিটিয়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। এ প্রকল্পের আওতায় একটি সুগার রিফাইনারিও স্থাপন করা হবে। যার মাধ্যমে ‘র’ সুগার থেকে হোয়াইট সুগার উৎপাদন করে দেশে চিনির চাহিদা পূরণে বিশেষ ভূমিকা রাখা হবে। ঠাকুরগাঁও চিনিকলের পুরোনো যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন এবং সুগারবিট থেকে চিনি উৎপাদনের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংযোজন শীর্ষক আরেকটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনায় অবস্থিত চিনিকল ও ডিস্টিলারি কারখানা কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বিডি) লিমিটেড। এর আধুনিকীকরণের জন্য গ্রহণ করা হয়েছে বিএমআর প্রকল্প। এতে ৭৩ বছরের পুরোনো যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে চিনিকলটির বর্তমান আখ মাড়াই ও চিনি উৎপাদনক্ষমতা সংরক্ষতি হবে। এছাড়ও সাম্প্রতিক অন্য যেসব উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে, তা হলো সনাতন ই-পুর্জি প্রথার পরিবর্তে একটি মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমে সব আখ চাষির কাছে মিলে আখ সরবরাহের আগাম বার্তা পৌঁছে দেওয়া (ই-পুর্জি)। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালের ১২ ডিসেম্বর একযোগে সব চিনি কলে ই-পুর্জি কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। ফলে লাখ লাখ চাষির দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে ডিজিটাল সেবা। নিশ্চিত করা হয়েছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। ই-পুর্জির সফলতার স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন ভারতের মস্থন অ্যাওয়ার্ড সাউথ এশিয়া ২০১০ পুরস্কার লাভ করে। এছাড়াও ডিজিটাল উদ্ভাবনী মেলা-২০১০-এ ই-সেবা ক্যাটাগরিতে জাতীয় পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কার লাভ করে। ই-পুর্জি ব্যবস্থাপনায় সফলতার পর সেবার পরিধি আরও বিস্তৃতি করতে চালু করা হয়েছে ই-গেজেট। এর মাধ্যমে চাষিরা ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্রে গিয়ে অনলাইনে পুরো মৌসুমের কেন্দ্র ও ইউনিটভিত্তিক আখ ক্রয়ের আগাম কর্মসূচি দেখতে পারেন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আখমাড়াই মৌসুমে ফরিদপুর চিনিকল পূর্ণাঙ্গরূপে চালু হয় এবং চলতি ২০১৬-১৭ আখ মাড়াই মৌসুমে সব চিনিকল চালুর কর্মসূচি নেওয়া হয়। ই-পুর্জি ও ই-গেজেট প্রচলনের পর চিনিকলগুলোতে এবার মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আখের মূল্য পরিশোধ করা। ভোক্তা যাতে সহজে চিনি পান, সে লক্ষ্যে ১ ও ২ কেজির প্যাকেটজাত চিনি বাজারজাত করা হচ্ছে, তা-ও আবার কম মূল্যে। সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু ২০১৫ সালের ২৮ মে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। চিনিকলের প্রেসমাড ও ইথানল প্লান্টের বর্জ্য থেকে বায়োকম্পোস্ট উৎপাদনপূর্বক রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জমিতে ব্যবহার করে জমির উবর্রতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশ দূষণ রোধ করতে কেরু অ্যান্ড কোম্পানিতে স্থাপন করা হয়েছে জৈব সারকারখানা। করপোরেশনের উন্নয়নের গতি হঠাৎ করে গত কিছুদিন ধরে থেমে গেছে। কোনো কাজই আর তেমন এগুচ্ছে না। বৃহৎ প্রকল্পের কাজ একেবারেই থেমে আছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এ শিল্পকে বহুমুখীকরণের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা-ও থেমে আছে। এ করপোরেশনের বড় সমস্যা হলো চিনি বিক্রি করতে না পারা। বেসরকারি আমদানিকারকরা বর্তমানে পরিশোধিত চিনি আমদানি করছে (যাবতীয় খরচসহ) ৪৮ হাজার টাকা প্রতি টন (প্রতি কেজি ৪৮ টাকা), আর বিক্রি করছে ৫০ হাজার থেকে ৫২ হাজার টাকায়। অন্যদিকে বিএসএফআইসির চিনির বিক্রি মূল্য হচ্ছে ৬০ হাজার টাকা টন (খোলা)। কাজেই বাজার সুবিধা নিচ্ছেন বেসরকারি আমদানি ও উৎপাদনকারীরা। বর্তমানে বিএসএফআইসির উৎপাদিত ও আমদানিকৃত মিলিয়ে লাখ টনের বেশি চিনি অবিক্রীত অবস্থায় আছে। বিগত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের সময় মুক্তবাজার অর্থনীতির দোহাই দিয়ে চিনি আমদানি, উৎপাদন (আমদানিকৃত ‘র’ চিনি হোয়াইট করণ) ও বাজারজাতকরণ ছেড়ে দেওয়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত চিনি শিল্পের ‘বারোটা’ বাজিয়ে দিয়ে গেছে। এছাড়া সরকার অন্যান্য সেক্টর করপোরেশনে ভর্তুকি দিলেও এ শিল্পে ভর্তুকি না দেওয়া আরেক জটিলতার কারণ। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনি শিল্প এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগুচ্ছে। হ

ষ এবি সিদ্দিক
সাংবাদিক