আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৪-০৪-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

ধর্মযুদ্ধের নয়া ডিসকোর্স?

শিবলী নোমান
| সম্পাদকীয়

খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস মতে, যিশুখ্রিষ্টের পুনরুজ্জীবন লাভের পবিত্র দিন ইস্টার সানডেতে আমরা প্রত্যক্ষ করলাম নিকট সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় পরিকল্পিত হত্যাকা-। কলম্বোসহ শ্রীলঙ্কার তিনটি শহরের তিনটি চার্চ ও তিনটি হোটেলসহ বিভিন্ন স্থানে সর্বমোট আটটি বোমা বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছে পুরো শ্রীলঙ্কা। তামিল টাইগার কিংবা ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণের মৃত্যুর পর সম্ভবত এ প্রথমবার এভাবে বিশ্ব গণমাধ্যমের সংবাদ শিরোনামে উঠে এলো শ্রীলঙ্কা। আমাদের সামাজিক মাধ্যমের নীল দেয়ালে আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ভক্তের রক্তে রঞ্জিত যিশুমূর্তিকে। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী তিন শতাধিক জনের মৃত্যু হয়েছে এসব বিস্ফোরণে। আর স্বাভাবিকভাবেই চার্চে হামলা হওয়ায় নিহতদের অধিকাংশই খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী, যারা তাদের ধর্মীয় উৎসবের দিনে হাজির হয়েছিলেন যিশুর সান্নিধ্য লাভের আকাক্সক্ষায়।
শ্রীলঙ্কায় এ সিরিজ বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ দায় স্বীকার করেনি। তাই একবাক্যে বা এককথায় এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসা সমীচীন হবে না। কিন্তু এ হামলার পর থেকে একটি কথা মানুষের মুখে না হলেও মনের গভীর কোণে চেতনে বা অবচেতনে কিংবা অচেতনেই হয়তো উঁকি দিয়েছে যে, শ্রীলঙ্কায় খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের লক্ষ করে এ আঘাত কি গত মাসে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয় মসজিদে ঢুকে মুসলিম হত্যাকা-ের প্রতিশোধ? নাকি অন্য কিছু? এ প্রতিশোধজনিত ডিসকোর্স থেকেই মস্তিষ্কে উসকে দেয় ক্রাইস্টচার্চের ঘটনার স্মৃতি। ক্রাইস্টচার্চের হত্যাকা-ে হামলাকারীর ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো ছিল প্রতিশোধপরায়ণ ও হিংসাত্মক লেখায় পরিপূর্ণ। সেসব লেখার একটিতে উল্লেখ করা ছিল, এ হত্যাকা-টি ঘটানো হচ্ছে এবা আকারলুন্ড নামের একজনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রতিশোধ হিসেবে। মূলত ২০১৭ সালের এপ্রিলে সুইডেনের স্টকহোমে উজবেকিস্তানের এক নাগরিক লরি চাপা দিয়ে মেরে ফেলেছিলেন পাঁচজনকে। তাদেরই একজন এই এবা আকারলুন্ড, যিনি ছিলেন ১১ বছর বয়সি একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী। অর্থাৎ এটি অন্তত নিশ্চিত যে, ক্রাইস্টচার্চের হামলাটিও ছিল প্রতিশোধপরায়ণতা থেকে উদ্ভূত।
২০১৬ সালে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে তৈরি হওয়া হোস্টেজ সিচুয়েশনের ঘটনা আমাদের ভুলে যাওয়ার কথা নয়। সেখানেও কিন্তু হামলা ও হত্যাকা-ের মূল টার্গেট বা নিশানা ছিল বেকারিতে থাকা অমুসলিমরা, যেহেতু হামলাকারীরা ছিল ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী উগ্র ধ্যানধারণা ও মানসিকতাসম্পন্ন। 
তাহলে ধর্মের নামে, ধর্ম রক্ষার নামে দেশে দেশে নানা সময়ে যেসব সংগঠন তৈরি হয়েছে তাদের প্রাথমিক লক্ষ ছিল ভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসীদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়া। তাহলে কি আমরা ধর্মযুদ্ধ বা ক্রুসেডের দিনগুলোতে ফিরে যাচ্ছি? কেমন হতে যাচ্ছে একবিংশ শতাব্দীর এ ক্রুসেড?
এসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো পাওয়া যাবে আসল ক্রুসেডের ইতিহাসে, তা চলুন না বর্তমান থেকে ফিরে যাই ক্রুসেডের সেই টালমাটাল সময়টাতে। ইসলাম ধর্মের অন্যতম খলিফা হজরত ওমর (রা.) এর শাসনামলে জেরুজালেম মুসলিম শাসনের অধীনে আসে। এটি সেই শহর, যাকে নিয়ে তিনটি আব্রাহামিক ধর্মের টানাপড়েন। এ শহর ইহুদিদের কাছে পবিত্র, কারণ এখানেই কিং সলোমন স্থাপন করেছিলেন ইহুদিদের প্রথম মন্দির। খ্রিষ্টানদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এ শহরে যিশু তার ধর্ম প্রচার করতেন, অংশ নিতেন আলোচনায়। আর মুসলমানদের প্রথম কেবলা বায়তুল মোকাদ্দাস অবস্থিত এ শহরেই, তাছাড়া ইসলাম ধর্মমতে, এই জেরুজালেম থেকেই মিরাজের রাতে ঊর্ধ্বাকাশে গমন করেছিলেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তাই এ তিন ধর্মের মানুষই সবসময় চেয়েছে জেরুজালেমের অধিকার থাকুক শুধু তাদের নিজেদের হাতে। আর এ জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখিয়েই ১০৯৫ সালে পোপ দ্বিতীয় আরবান ক্রুসেডের ডাক দিয়েছিলেন। ক্রুসেডের প্রতি পোপের এ আহ্বানের পেছনের উদ্দেশ্য শুধুই ধর্মীয় নাকি পোপের কোনো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ছিল, তা নিয়ে একটি প্রচলিত ডিসকোর্স রয়েছে, যা এই লেখার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তবে মূল কথা হলো, ক্রুসেডের ডাক দিলেও এ যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা পোপের ছিল না; তাই তিনি বিভিন্ন খ্রিষ্টান অধ্যুষিত অঞ্চলের রাজা, সামন্তপ্রভু, ডিউক তথা নেতাদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন ক্রুসেডে অংশ নেওয়ার জন্য। অন্যদিকে ক্রুসেডের ইতিহাস থেকে দেখা যায়, জেরুজালেমের অধিকার ফিরে পাওয়া মুখে মুখে মূল উদ্দেশ্য হলেও ক্রুসেডে অংশ নেওয়া বিভিন্ন অঞ্চলের শাসক, রাজা ও ডিউকদের আকাক্সক্ষা ছিল নতুন নতুন ভূমির ওপর কর্তৃত্ব আরোপ করা। এ কারণেই ক্রুসেডের একদম প্রথমদিকে জেরুজালেম মুসলিমদের হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পরও ক্রুসেড থেমে যায়নি। আবার ১১৮৭ সালে জেরুজালেম ফের মুসলিমদের অধিকারে আসার পরও যেসব ক্রুসেড হয়েছে, সেখানে জেরুজালেম নয়, বরং অন্যান্য ভূখ-ের দিকেই ক্রুসেডারদের নজর ছিল বেশি। ফলে ক্রুসেড যে আসলে ধর্ম বা ধর্ম রক্ষার জন্য যুদ্ধ, প্রচলিত এ ডিসকোর্সের প্রতি আমার দ্বিমত আছে। ক্রুসেড কোনো ধর্মযুদ্ধ ছিল না, বরং ক্রুসেডের নামে যা হয়েছে তার লক্ষ্য ছিল পশ্চিমা সামন্তবাদের সম্প্রসারণ।
অর্থাৎ আমরা যেভাবে বা যতভাবেই বলতে চাই না কেন, সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ম বা ধর্ম রক্ষার নামে দেশে দেশে, বিশেষ করে অতি সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা ও হত্যাকা-ের যে চল শুরু হয়েছে, তা ধর্মযুদ্ধ বা ক্রুসেডের নয়া রূপÑ এ বক্তব্য প্রমাণ করা কঠিন, অনেক ক্ষেত্রে অবাস্তবও। আমাদের সবার আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা ধর্মযুদ্ধ চাই কি না। পৃথিবীতে এমন কোনো ধর্ম নেই, যা মানবকল্যাণের কথা বলে না বা বলেনি। তাহলে সেই একই ধর্মের নামে মানুষ হত্যা কখনও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সবশেষে বলা যেতে পারে কাহলিল জিবরানের বলা কথাটিÑ ‘তোমার দৈনন্দিন জীবন তোমার উপাসনালয় এবং তোমার ধর্ম।’
পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের ভেতর মানুষ জাগ্রত হোক। হ

ষ শিবলী নোমান
শিক্ষক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন
বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়