আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৪-০৪-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

ব্লাস্টের আক্রমণে ধানে চিটা

সখীপুর ও কচুয়ায় ফলন বিপর্যয়

আলোকিত ডেস্ক
| দেশ

চাঁদপুরের কচুয়ায় ব্লাস্টে আক্রান্ত হয়ে চিটা হওয়া ইরি ধান- আলোকিত বাংলাদেশ

টাঙ্গাইলের সখীপুর ও চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলায় নেক ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে ধান চিটা হয়ে যাচ্ছে। দূর থেকে মনে হয়, মাঠের ফসল পেকে গেছে। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখা যায়, ধানের পেটে চাল নেই! সব ধান চিটা হয়ে গেছে। এ বছর ধানের আশাতীত ফলন হলেও নেক ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে ধান চিটায় পরিণত হওয়ায় কৃষকের মুখের হাসি হারিয়ে গেছে। এখন তাদের মাঝে বিরাজ করছে শুধুই হাহাকার। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর
সখীপুর : ইরি-বোরো মৌসুমের শেষ সময় এখন। কয়েকদিন পরই ধান কাটার উৎসবে মেতে উঠবেন কৃষক। কিন্তু টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কৃষকের স্বপ্নে আগুন দিয়েছে ব্লাস্ট নামের ছত্রাক। ব্লাস্টের আক্রমণে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠে ধানের পেটে চাল নেই! সব ধান এখন চিটায় পরিণত হয়েছে। সরেজমিন উপজেলার কীর্ত্তনখোলা, ধুমখালী, গজারিয়া, কচুয়া, নয়াকচুয়া, কালিয়া, দেবরাজ, বেলতলী, পাথারপুর, ইছাদিঘী, কালিদাস, বড়চওনা, ছোটমৌশা, বেতুয়া, কালিয়ান বহেড়াতৈলসহ কয়েকটি এলাকায় একই চিত্র দেখা গেছে। কৃষকের চোখের সামনেই খেতের সোনার ফসলগুলো ধীরে ধীরে পুড়ে যাচ্ছে। এটি কৃষকের জন্য বড়ই নির্মম। উপজেলার হামিদপুর গ্রামের কৃষক আবু হানিফ বলেন, আমার ধানক্ষেতে তিন থেকে চারবার বিষ দেওয়ার পরও কোনো সুফল আসেনি। আমার ১ একর জমির ধানের শীষ একেবারে মরে গেছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে উপজেলার প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। রোপণের কিছুদিন পরই কিছু খেতে ব্লাস্টের আক্রমণ দেখা দেয়। এ পর্যন্ত উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের শতাধিক একর জমি ব্লাস্টে আক্রান্ত হয়েছে। কৃষি অফিস এ রোগে আক্রান্ত এলাকায় ব্যাপক প্রচারণাসহ কৃষককে নানা পরামর্শ দিচ্ছে। কৃষি অফিস আরও জানায়, সাধারণত ব্রি-২৮, ব্রি-২৯ জাতের ধানে এ ছত্রাকটি বেশি আক্রমণ করেছে। একাধিক কৃষক ও স্থানীয় সার-বীজ ডিলার জানান, ধানের চারা রোপণের কিছুদিন পর সবুজ পাতায় কালো দাগ দেখা দেয় এবং ধানের পাতা পচে যেতে থাকে। এ সময় কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে ট্রাইসাইক্লাজোল উপাদানের ট্রুপার-৭৫ ডব্লিউপি ও সেলট্রিমা জাতীয় ছত্রাকনাশক ছিটানোর পর প্রথম দিকে কিছুটা কমলেও পরে আবারও আক্রান্ত হয়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম বলেন, ট্রাইসাইক্লাজোল উপাদানের ট্রুপার-৭৫ ডব্লিউপি ও সেলট্রিমা জাতীয় কীটনাশক ছিটানোর পর নতুন করে এ রোগ আক্রমণ করার কথা নয়। কিন্তু এটি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। আমরা কৃষককে এ ছত্রাক প্রতিরোধে সার্বিক সহযোগিতা দিচ্ছি। এরপরও শেষ রক্ষা হবে কি না, জানি না। কচুয়া : চাঁদপুরের কচুয়ায় নেক ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে ইরি ধান চিটা হয়ে যাচ্ছে। এ বছর ইরি ধানের আশাতীত ফলন হয়েছে। কিন্তু নেক ব্লাস্ট ছত্রাকে আক্রান্ত হয়ে ধান চিটা হয়ে গেছে। সরেজমিন উপজেলার বিভিন্ন মাঠে গিয়ে দেখা যায়, খেতে ধান মরে সাদা হয়ে শীষ ঝুলে আছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, পাকা ধানে খেত ভরে আছে। অথচ কাছে গিয়ে দেখা যায়, চালবিহীন সাদা চিটায় ভরা শীষ শুকিয়ে ঝুলে পড়েছে।
এ বছর উপজেলায় ১২ হাজার ৭০৫ হেক্টর জমিতে ইরি ধান চাষ হয়েছে। বর্তমানে উপজেলার সব মাঠেই কোনো না কোনো জমির ধান নেক ব্লাস্ট ছত্রাকে আক্রান্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে ব্রি-২৮ জাতের ধান। কৃষি বিভাগ ৮ এপ্রিল থেকে তিনটি স্কোয়াড গঠন করে উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ব্লাস্ট দমনে কাজ করছে। কৃষি বিভাগের পরামর্শে এ রোগ নিয়ন্ত্রণে ট্রুপার, নাটিবো ও ফিলিয়া নামক কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু এসব কীটনাশক ব্যবহার করেও তেমন ফল পাচ্ছেন না কৃষক। কৃষিবিদদের মতে, উপযুক্ত সময়ে প্রতিষেধক হিসেবে কীটনাশক ব্যবহার না করলে এ ছত্রাক দমন করা সম্ভব হয় না।
উপজেলার নূরপুর গ্রামের কৃষক আলহাজ রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি ৯০ শতক জমি থেকে ১২ মণ ধান পেয়েছেন। একই গ্রামের কৃষক আবু তাহের জানান, তিনি ৩০ শতক জমি থেকে পেয়েছেন ৫ মণ এবং আইনগিরি গ্রামের কৃষক আ. আজিজ ৬৬ শতক জমি থেকে পেয়েছেন ১০ মণ ধান। নোয়াগাঁও গ্রামের কৃষক আমির হোসেন জানান, তিনি ৩০ শতক জমি থেকে ৫ কেজি ধান পেয়েছেন। তারা জানান, এতে তাদের চাষের খরচের এক-তৃতীয়াংশও উঠবে না।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আহসান হাবিব ও কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানান, এ ছত্রাক দমনে কৃষি বিভাগের লোকজন প্রতিদিন মাঠে কাজ করছেন। তারা ব্রি-২৮ ধান পরিহার করে ব্রি-৮১, ৮৮ ও ৭৪-এর ভিত্তি বীজ সংগ্রহ করে চাষাবাদ করার জন্য কৃষককে পরামর্শ দিচ্ছেন।