আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৬-০৪-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

ঢাকা-রাজশাহী রুটে বিরতিহীন ট্রেন উদ্বোধনীতে প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশেও সন্ত্রাসী হামলা চালানোর চেষ্টা হচ্ছে

আলোকিত ডেস্ক
| প্রথম পাতা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৃহস্পতিবার গণভবনে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পতাকা উড়িয়ে রাজশাহী-ঢাকা-রাজশাহী রুটে আন্তঃনগর বিরতিহীন ট্রেন ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ উদ্বোধন করেন ষ পিআইডি

শ্রীলঙ্কার মতো বাংলাদেশেও জঙ্গি ও সন্ত্রাসী হামলা চালানোর চেষ্টা চলছে মন্তব্য করে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৃহস্পতিবার সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ঢাকা-রাজশাহী রুটে বিরতিহীন আন্তঃনগর ট্রেন ‘বনলতা এক্সপ্রেসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। ভিডিও কনফারেন্সের অপর প্রান্তে রাজশাহীতে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন, রাজশাহীর মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন বক্তব্য রাখেন। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে গেল রোববার ইস্টার সানডের দিনে শ্রীলঙ্কার রাজধানীর কয়েকচি চার্ট ও হোটেলে একযোগে বোমা হামলার প্রসঙ্গ তোলেন।

ওই হামলায় এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৩৫০ ছাড়িয়ে গেছে। নিহতদের মধ্যে শেখ হাসিনার ফুপাত ভাই শেখ ফজলুল করিম সেলিমের ৮ বছর বয়সি নাতি জায়ান চৌধুরীও রয়েছে। আহত হয়েছেন জায়ানের বাবা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে জঙ্গিবাদ শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বব্যাপী একটি সমস্যা। মাত্র কয়েক দিন আগেই শ্রীলঙ্কায় যে ঘটনা ঘটল, সেখানেও আমরা বাংলাদেশের কয়েকজনকে হারিয়েছি। সবচেয়ে দুর্ভাগ্য অনেকগুলো শিশু সেখানে মারা যায়। সেখানে আমাদেরও বাংলাদেশের শিশু জায়ানকে আমাদের হারাতে হয়েছে এ জঙ্গি সন্ত্রাসের কারণে, এ সন্ত্রাসী কর্মকা-ের কারণে।

বাংলাদেশেও এ ঘটনা ঘটানোর অনেক চেষ্টা চলছে। তবে আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করে যাচ্ছে। শেখ হাসিনা বলেন, আমি দেশবাসীকে আহ্বান জানাব, এ ধরনের সন্ত্রাস জঙ্গিবাদের সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত থাকবে, কে কোথায় এ ধরনের সন্ত্রাসী-জঙ্গিবাদী কর্মকা-ের সঙ্গে লিপ্ত সেটা শুধু আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা নয়, দেশবাসীকেও সতর্ক থাকতে হবে, খুঁজে বের করতে হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে জানাতে হবে। খবর বিডিনিউজের
আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামায়াতের ধ্বংসাত্মক কর্মকা-ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রেলের নতুন নতুন বগি কিনেছি সেগুলো আগুন দিয়ে পুড়িয়েছে। বাস কিনেছি, সেগুলো পুড়িয়েছে। তাছাড়া প্রাইভেট গাড়ি, বাস, ট্রাক, লঞ্চ এমন কিছু নেই যা অগ্নিসন্ত্রাসের কবলে ধ্বংস হয়নি। সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবন। ছোট শিশু, নারী, পুরুষ। বাবা দেখেছেন চোখের সামনে ছেলে পুড়ে যাচ্ছেন, স্ত্রী দেখেছে চোখের সামনে স্বামী পুড়ে যাচ্ছে, মা দেখেছে সন্তান বা কন্যা পুড়ে যাচ্ছেনÑ এ রকম ভয়াবহ চিত্র আমরা বাংলাদেশে দেখেছি। আমরা চাই না এ জাতীয় ঘটনা বাংলাদেশে ঘটুক।
ইসলামকে শান্তির ধর্ম উল্লেখ করে শেখ হাসিনা মসজিদে মসজিদে জুমার খুতবায় জঙ্গিবাদ, সন্ত্রসবাদের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করার আহ্বান জানান। এছাড়া অভিভাবক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, সব ধর্মের শিক্ষা গুরুদেরকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। রেলের উন্নয়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সারা দেশে রেল নেটওয়ার্ক চালু করতে চাই। রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগটা আরও উন্নত করে দিতে চাই।
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা-রাজশাহী-ঢাকা রুটের বিরতিহীন ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ট্রেনের উদ্বোধন করেছেন। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে ঢাকা থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে যুক্ত হয়ে বাঁশি বাজিয়ে এবং সবুজ পতাকা উড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী ট্রেনটির উদ্বোধন ঘোষণা করেন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীই এ ট্রেনের নাম রাখেন ‘বনলতা এক্সপ্রেস’। প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধন ঘোষণার পর বেলা ১১টা ৪৪ মিনিটে ট্রেনটি ঢাকার উদ্দেশে রাজশাহী ত্যাগ করে। প্রথম দিন যাত্রীরা বিনা টিকিটেই এ ট্রেনে যাত্রা করার সুযোগ পান। বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রা শুরুর মধ্য দিয়ে রাজশাহীবাসীর আরেকটি প্রাণের দাবি পূরণ হলো। ঢাকা-রাজশাহী যোগাযোগে যোগ হলো এক নতুন মাত্রা।
রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের সামনেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সে বলেন, ২০০৮ সালে আমরা ক্ষমতায় এসে রেলকে মুমূর্ষু অবস্থায় দেখলাম। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার দেশের বিভিন্ন স্থানের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বন্ধ করে রেখেছিল। আমরা ওইসব রেল যোগাযোগ পর্যায়ক্রমে চালু করছি। রেলের জন্য আমরা নতুন নতুন বগি কিনেছি। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত আগুন দিয়ে পুড়িয়েছে। আন্দোলনের নামে সরকারি সম্পদ ধ্বংস করেছে। সরকার প্রধান বলেন, ট্রেনে অল্প খরচে আরামদায়ক ভ্রমণ করা যায়। এটি নিশ্চিত করতে আমরা রেলপথকে আলাদা মন্ত্রণালয় করেছি। কেননা, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যখন রেল যুক্ত ছিল তখন বাজেটের টাকা ভাগ করার সময় রেল খুবই অল্প পেত। আমরা উন্নয়ন করে যাচ্ছি। উন্নয়নের এ ধারাবাহিকতা রক্ষা করা প্রয়োজন।
তবে উন্নয়নে রাজশাহী কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেন জানি এলাকাটার উন্নতি হয়নি। এজন্যই আমরা রাজশাহীর দিকে আলাদাভাবে দৃষ্টি দিচ্ছি। যোগাযোগের ব্যবস্থা উন্নয়ন করছি। রাজশাহীর জন্য আমরা পদ্মা নদী ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। রেল, নৌ এবং আকাশ পথের যোগাযোগেরও উন্নয়ন দরকার। আমরা রাজশাহী, সৈয়দপুর ও বরিশালের বন্ধ বিমানবন্দর চালু করেছি। রাজশাহীর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন। তিনি বলেন, যে দেশ যত উন্নত সে দেশের রেল তত উন্নত। বিরতিহীন ট্রেন চালুর ব্যাপারে এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের যে দাবি ছিল, সেটি আজ পূর্ণ হলো। আশা করছি, রাস্তার ওপর নির্ভরতা, যানজট ও দুর্ঘটনায় প্রাণহানি থেকে মানুষ মুক্ত হবে।
উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনও। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, বিরতিহীন ট্রেন চালু, এটি যে কত বড় ভাগ্য, কত বড় পাওয়াÑ তা আমি বলে বোঝাতে পারব না। ট্রেনটি চালু করার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু এমপি, রাজশাহী-৫ আসনের এমপি ডা. মনসুর রহমান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের এমপি ডা. সালিম উদ্দিন আহমেদ শিমুল, সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি আদিবা আনজুম মিতা, সাবেক এমপি আখতার জাহান, বিভাগীয় কমিশনার নূর-উর-রহমান, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক খোন্দকার শহিদুল ইসলাম প্রমুখ। ভিডিও কনফারেন্স পরিচলনা করেন জেলা প্রশাসক এসএম আবদুল কাদের।
রাজশাহী-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা ও সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের নির্বাচনি ইশতেহারে ঢাকা-রাজশাহী বিরতিহীন ট্রেন চালুর প্রতিশ্রুতি ছিল। ট্রেনটি চালুর ব্যাপারে নবম ও দশম জাতীয় সংসদে একাধিকবার দাবি জানান সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা। রেল মন্ত্রণালয়ের ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য মিটার গেজ ও ব্রডগেজ প্যাসেঞ্জার ক্যারেজ সংগ্রহ’ প্রকল্পের আওতায় বনলতা এক্সপ্রেস চালু হলো। ২০১৫ সালের ১০ নভেম্বর প্রকল্পের ডিপিপি অনুমোদন হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনের জন্য ইন্দোনেশিয়া থেকে অত্যাধুনিক বগি আমদানি করা হয়। এতে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা। প্রতিটি বগির দাম পড়েছে সাড়ে ৪ কোটি টাকা। বনলতার ১২টি বগিতে প্রতিদিন ২ হাজার যাত্রী ভ্রমণ করতে পারবেন। রেলপথ বিভাগ থেকেই এ ট্রেনে ভ্রমণকারীদের জন্য নিশ্চিত করা হবে খাবার। ট্রেনটি থেকে বছরে সরকারের আয় হবে ৩৭ কোটি টাকা। বনলতা দেশের একমাত্র ট্রেন, যা পরিবেশের কোনো ক্ষতি করবে না।