আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৬-০৫-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

পাটের আঁশে বাঁধা শ্রমিকের ভাগ্য

বিশ্বজিত রায়
| সম্পাদকীয়

অতীতের অর্থকরী ফসল পাট খাতকে পুরোনো গৌরব ও ঐতিহ্যের জায়গায় ফিরিয়ে নিতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। তবে পাটকল শ্রমিকদের ঘন ঘন কর্মবিরতি ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পাট খাতে সরকারের সার্বিক কার্যক্রম ও আন্তরিকতাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। পাট খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ, বকেয়া মজুরি-বেতন পরিশোধ, জাতীয় মজুরি ও উৎপাদনশীলতা কমিশনের রোয়েদাদ ২০১৫ কার্যকর, অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের পিএফ ও গ্রাচুইটির অর্থ পরিশোধ, চাকরিচ্যুত শ্রমিক-কর্মচারীদের পুনর্বহালÑ সব মিলে সেটআপের অনুকূলে শ্রমিক-কর্মচারীদের শূন্যপদের বিপরীতে নিয়োগ ও স্থায়ীসহ ৯ দফা দাবিতে ৫ মে দুপুর থেকে একে একে খুলনাঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি পাটকলের উৎপাদন বন্ধ করে দেন শ্রমিকরা। সর্বশেষ ২, ৩ ও ৪ এপ্রিল দেশের সব রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে একযোগে ৭২ ঘণ্টা ধর্মঘট এবং চার ঘণ্টা করে রাজপথ ও রেলপথ অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন তারা। এরপর ১৫ এপ্রিল ৯৬ ঘণ্টার ধর্মঘটের কর্মসূচি শুরু করলেও বিজেএমসি চেয়ারম্যান ও শ্রম প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে পাটকল শ্রমিক নেতাদের সমঝোতার ভিত্তিতে শ্রমিকরা কর্মসূচি প্রত্যাহার করে কাজে যোগ দেন। চুক্তি অনুযায়ী ২৫ এপ্রিলের মধ্যে ১০ সপ্তাহের মজুরি ও ৩ মাসের বেতন পরিশোধে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি)। এ কারণে খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি পাটকলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ না হওয়ায় তাদের মধ্যে চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। 
রমজান মাসে ফের পাটকল শ্রমিকদের কর্মবিরতি ও কর্মসূচির ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া বলে দিচ্ছে সরকার-শ্রমিক সমঝোতা তুষ্টিদায়ক ফল বয়ে আনেনি। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পাটকল শ্রমিক লীগ খুলনা-যশোর অঞ্চলের আহ্বায়ক ও ক্রিসেন্ট জুট মিলের সিবিএ সভাপতি মুরাদ হোসেন বলেন, ‘রমজানেও আমরা রাজপথে থালা-বাসন হাতে ভুখা মিছিল করছি। পথেই নামাজ পড়ছি, ইফতার করছি। কয়েক মাস হয় বাজার কাকে বলে জানে না শ্রমিকরা। ছেলেমেয়েদের মুখে কোনো ভালো খাবার দিতে পারছি না।’ (সূত্র : কালের কণ্ঠ, ১০.০৫.১৯)। 
বস্ত্র ও পাট সচিব মো. মিজানুর রহমান সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, ‘বস্ত্র ও পাট খাতকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন প্রধানমন্ত্রী।’ বঙ্গবন্ধুকন্যা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ও দেশের মানুষের জন্য কতটা কর্তব্যপরায়ণ ও কর্মনিষ্ঠ সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। শ্রমিক জনতার স্বার্থেই কাজ করে যাচ্ছে তার সরকার। একদিকে পাট খাতে শেখ হাসিনা সরকারের গুরুত্ব বিবেচনা, অন্যদিকে পাটকল শ্রমিকদের কর্মবিরতি ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি একটি আরেকটির সাংঘর্ষিক রূপ ধারণ করেছে কি না, সেটা ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে। সবার আগে শ্রমিকদের গুরুত্ব দিতে হবে।
পাটকে বলা হয় সোনালি আঁশ। আর সেই আঁশের কারিগর হচ্ছে শ্রমিক। সোনালি আঁশের স্বর্ণাভ কারিগররা আজ রাস্তায়। তাদের পেটে নেই ভাত, মুখে নেই হাসি। এ রমজানে কোথায় তারা রোজা রেখে পরিবার-পরিজনকে নিয়ে ঘরে বসে ইফতার করবেন, তা না করে তারা পথে নামতে বাধ্য হচ্ছেন। এ ক্ষুধার্ত ক্লান্ত শ্রমিকদের দিয়ে কি পাটের সুদিন ফিরিয়ে আনা সম্ভব? সারাবিশ্বে প্রবল সম্ভাবনাময় পণ্য পাটের প্রয়োজনীয়তা বলে শেষ করা যাবে না। এটি এমন একটি বস্তু, যার কোনো কিছুই অপ্রয়োজনীয় নয়। পাটখড়ি, পাতা, আঁশ সবকিছুই প্রয়োজনীয়। চাল, গম, আটা, চিনিসহ ১৮টি পণ্যের মোড়ক ব্যবহারে পাটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার আদেশ জারি হয়েছিল। পরিবেশ সচেতনতার কারণে পাটের সম্ভাবনা বিশ্বব্যাপী সৃষ্টি হয়েছে। ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি হচ্ছে পাটের নতুন বাজার। পাট শুধু চট, বস্তা, দড়ি তৈরির কাঁচামালই নয়, গাড়ি ও বিমানের ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন এবং সৌন্দর্যবর্ধনে পাট দ্বারা তৈরি পণ্যের ব্যবহারের ক্ষেত্র যেমন তৈরি হচ্ছে, তেমনি বিএমডব্লিউ, ভক্স ওয়াগন, টয়োটা, নিশান গাড়ির বহু যন্ত্রাংশ তৈরিতেও পাটের ব্যবহার বাড়ছে। ইউরোপের ২৮টি দেশে একযোগে পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, এতে করে এখানে পাট সবচেয়ে প্রাকৃতিক বিকল্প হিসেবে কাজে লাগবে। এক হিসাবে দেখা যায়, সারা বিশ্বে প্রতি বছর ৫০০ বিলিয়ন পিস শপিং ব্যাগের চাহিদা আছে। এর ২-৩ শতাংশও যদি পাট দ্বারা পূরণ করা যায়, তাহলেও পাট খাতের চেহারা পাল্টে যাবে। অতি প্রয়োজনীয় এ পাট এবং পাট শ্রমিকদের দুরবস্থা শঙ্কার জন্ম দিচ্ছে। পাট উৎপাদনে উর্বর বাংলাদেশে পাটকলের অস্থিরতা এ অর্থকরী পণ্যকে ঠেলে দিচ্ছে অনিশ্চয়তার পথে। পাটকে ঘিরে সরকারের নানা উদ্যোগ ভেস্তে যাবে, যদি না পাটকল শ্রমিকদের দাবির প্রতি সম্মান জানানো না হয়।
বিশ্বে আমাদের পাট ও পাটজাতদ্রব্যের ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রায়ত্ত সরকারি পাটকলগুলোর অব্যাহত লোকসান পাটকে ফের দুর্দিনের পথে নিয়ে যাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। বাংলাদেশে বেসরকারি পাটকলগুলো ভালো করলেও রাষ্ট্রায়ত্ত সরকারি পাটকলগুলো কেন লোকসানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে, সেটাই বড় প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণেই মূলত রাষ্ট্রায়ত্ত মিলগুলোতে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। রয়েছে দূরদর্শিতার অভাব ও গাফিলতি। এর দায় বর্তাচ্ছে শ্রমিকদের ওপর। 
বিশ্ববাজারে ৫০০ বিলিয়ন পিস পাটজাত ব্যাগের চাহিদার বিপরীতে ১০ শতাংশ বাজার দখল করতে পারলে ৫০ হাজার কোটি টাকা বছরে আয় করা সম্ভব। পাট উর্বর বাংলাদেশ যদি পাট শিল্পটির দিকে নজর দেয়, তাহলে সত্যিই পাটে সুদিন ফিরে আসবে। পাট থেকে রেকর্ড পরিমাণ আয় করতে পারবে বাংলাদেশ। সেই সম্ভাবনা অতি উজ্জ্বল। কিন্তু সম্ভাবনাময় পাটের বর্তমান শ্রমিক অসন্তোষ অতীতে পাটকলের ওপর নেমে আসা অশুভ ছায়ার কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। বিশ্বব্যাংক ও সাম্রাজ্যবাদী দাতাগোষ্ঠীর পরামর্শ ও চাপে ১৯৮২ সালের পর বিরাষ্ট্রীয়করণ ও পাটশিল্প থেকে পুঁজি প্রত্যাহার শুরু হলে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ হওয়া শুরু হয়। ২০০২ সালে বন্ধ করা হয় এশিয়ার বৃহত্তম জুটমিল বলে খ্যাত আদমজী। দেশে একদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ হচ্ছে, অন্যদিকে বেসরকারি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন পাটকল স্থাপিত হচ্ছে। দেশে বর্তমানে পাটকলের সংখ্যা ২৮৫, এর মধ্যে ৫৫টি বন্ধ রয়েছে। মিলগুলোতে কর্মরতদের সংখ্যা দুই লাখের বেশি শ্রমিক। দেশে পাট চাষের জমির পরিমাণ ১৪ লাখ ৭৫ হাজার একর। পাট উৎপাদন ১৫ লাখ ৬০ হাজার টন, যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ ব্যবহার ১১ লাখ টনেরও বেশি। কাঁচা পাট গড়ে প্রতি বছর রপ্তানি হয় ২ দশমিক ৫ লাখ টন, যার মূল্য প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। পাটপণ্যের গড় উৎপাদন ১০ লাখ ৫০ হাজার টন, যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ ব্যবহার ১ লাখ ৫০ হাজার টনের মতো, আর বাকি প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার টন পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি হয়, যার মূল্য প্রায় ৬ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। একটা সাধারণ হিসেবে দেখা যায়, পাটজাত দ্রব্যের রপ্তানি প্রতি বছরই বাড়ছে। ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল পাঁচ লাখ টন আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়ায় ৮ লাখ ৫০ হাজার টন। পাট উৎপাদনে ভারত বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও পাটজাত দ্রব্যের রপ্তানিতে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে এগিয়ে। ২০১৬-১৭ সালে বাংলাদেশের উৎপাদন ১৫ লাখ ৩০ হাজার টন আর ভারতের ছিল ১৬ লাখ ৫৬ হাজার টন; কিন্তু পাটপণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ আয় করেছিল ৭৯৪ মিলিয়ন ডলার, আর ভারত রপ্তানি করেছিল ৩২৪ মিলিয়ন ডলার। বিশ্বে বাংলাদেশ এখনও তাই পাটের প্রধান রপ্তানিকারক দেশ। (সূত্র : দেশ রূপান্তর, ১১.০৫.১৯)।
সোনালি আঁশখ্যাত পাটের উর্বর ভূমি বাংলাদেশ। দেশের রপ্তানিকারক যে ক’টি শিল্প আছে তার মধ্যে পাট অন্যতম। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পাটের গ্রহণযোগ্যতা সর্বাধিক। তারপরও রাষ্ট্রায়ত্ত সরকারি পাটকলগুলো কেন বারবার লোকসানে পড়ছে? আর সেই লোকসানের ভারে বিপন্ন শ্রমিকরা কেনইবা পথে নামতে বাধ্য হচ্ছেন? যখানে পাটের সুদিন ফিরে এসেছে বলে বাহবা কুড়ানোর সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে; সেখানে পাটকল শ্রমিকদের ধর্মঘটে নামা সোনালি পাটের উৎপাদন বৃদ্ধিতে কতটুকু বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছেÑ সেটাই প্রশ্ন। পত্রিকান্তরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বেসরকারি পাটকলগুলো ভালো করছে। পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে রপ্তানি আয়ও বাড়ছে। অথচ সরকারি পাটকলগুলো ক্রমাগত লোকসান দিচ্ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পাটকলগুলোর লোকসান হয়েছে ৪৬৬ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে জুলাই-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত লোকসানের পরিমাণ ৩৯৫ কোটি টাকা। ফলে স্বভাবতই পাটকল শ্রমিকদের বেতন বকেয়া পড়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পাটকল শ্রমিকরা ধর্মঘট ও অবরোধে নেমেছেন। পাটের সোনালি অতীতকে আরও ঝকঝকে আয়নির্ভর করে গড়ে তুলতে সরকারের ইতিবাচক প্রচেষ্টা পাটকল শ্রমিক অসন্তোষের আগুনে পুড়ে ছাই হচ্ছে কি না, সেটা ভেবে দেখতে হবে। হ

বিশ্বজিত রায়
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
[email protected]