আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৬-০৫-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

ব্যাংক খাত সংস্কারে আসছে প্রথম দৃশ্যমান পদক্ষেপ

মৌসুমী ইসলাম
| প্রথম পাতা

- খেলাপি দুর্নাম ঘোচানোর সুযোগ
- পুনঃতফসিলীকরণ নীতিমালা দেবে বিবি
- প্রকৃত খেলাপি নির্ণয় করাই বড় চ্যালেঞ্জ

শিগগিরই দৃশ্যমান হবে ব্যাংক খাত সংস্কারের প্রথম পদক্ষেপ। আর এ উদ্যোগের শুরুতেই খেলাপি ঋণ উত্তোলনে জোর দিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিন অনাদায়ি হয়ে যাওয়া অর্থ ব্যাংকের কোষাগারে আনতেই ঋণ গ্রহীতাদের সুযোগ চূড়ান্ত করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২ শতাংশ ডাউন্ট পেমেন্ট দিয়ে ৯ শতাংশ সুদে ১০ বছরে শোধ করা যাবে ঋণের অর্থ। কিন্তু ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের জন্য এমন সুযোগ দেওয়া হবে না, এক্ষেত্রে আবেদন প্রাপ্তির পর হবে যাচাই-বাছাই।

দায়িত্ব নেওয়ার পরই ডুবতে বসা ব্যাংক খাত সংস্কারের নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি ধারণা চালু, আইনগত নানান দিক সংস্কার ছাড়াও খেলাপি ঋণ উত্তোলনের বিষয়টির প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। সূত্র জানায়, সব উদ্যোগের মূলে খেলাপি হয়ে যাওয়া প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা ব্যাংকের কোষাগারে আনাকেই গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সহজ শর্তে খেলাপি হয়ে যাওয়া অর্থ তুলতে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। সরকার মনে করে, এমন সুযোগ পেলে খেলাপি গ্রহীতারা ‘খেলাপি’ বৃত্ত থেকে বের হতে পারবেন। ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের মাধ্যমে পুনরায় ঋণ গ্রহণের সুযোগ পাবেন। এতে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হবে।প্রথম পদক্ষেপ চূড়ান্ত : প্রথম পদক্ষেপ সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাবনা চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে অর্থ বিভাগ। অনুমোদনের খুটিনাটি বিষয়াদি যাচাই-বাছাই করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রস্তাবনায় ২ শতাংশ ডাউন্ট পেমেন্ট দিয়ে ৯ শতাংশ সুদে ১০ বছরে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে অর্থ বিভাগ থেকে চূড়ান্ত করা গাইডলাইনে আরও সুযোগ সংযোজন করা হয়। সূত্র জানায়, ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য আবেদন করতে হলে দিতে হবে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট। ঋণ পরিশোধে ১ বছর গ্রস পিরিয়ডসহ মোট ১০ বছর সময় পাবে তারা। এ এক বছরে কোনো ঋণ পরিশোধ করতে হবে না। সব পর্যায়ের খেলাপিই এসব সুবিধা নিতে পারবে।
ঋণের হিসাব হবে ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরের এককালীন হিসাবায়ন ভিত্তিতে। কোনো ঋণখেলাপি যদি মনে করেন, এককালীন ঋণ পরিশোধ করে খেলাপির তালিকা থেকে বেরিয়ে যাবেন, তাহলে সে ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে প্রজ্ঞাপনে। বলা হয়েছে, এ ক্ষেত্রে ঋণখেলাপিরা ঋণ পরিশোধের জন্য ১ বছর পর্যন্ত সময় পাবেন। এককালীন পরিশোধের জন্য ৯ শতাংশ হারে সুদ আরোপ করা হবে। সময় দেওয়া হবে ৬ মাস। এর মধ্যে পরিশোধ করতে না পারলে আরও ৬ মাস অতিরিক্ত সময় পাবেন। যদি কোনো ঋণখেলাপি অতিরিক্ত সময়ের মধ্যেও পরিশোধ করতে না পারে তাহলে ৯ শতাংশ সুদের সঙ্গে আরও ২ শতাংশ সুদ আরোপ করা হবে। অর্থাৎ তখন সুদের হার হবে ১১ শতাংশ।
সুফল পাবে কোন ব্যাংক : বর্তমানে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৪ হাজার কোটি টাকা। আর অবলোপনকৃত ধরলে মোট ঋণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানার ছয় ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪৮ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা, যা দেশের মোট খেলাপি ঋণের অর্ধেকেরও বেশি। পুনঃতফসিলীকরণ সুবিধা দিলে এর বেশি সুফল পাবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। অর্থাৎ সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশ এ সুবিধার কারণে ওঠে আসবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম মনে করেন, অন্যান্য ব্যাংকগুলোকেও এ সুবিধার আওতায় আসতে হবে, কারণ তাদেরও খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা দরকার।
সুবিধার আওতায় এলে আবার ঋণ নেওয়া যাবে? : ব্যবসা করতে চাইলে বা কোনো বাণিজ্যিক কর্মকা- করতে চাইলে অবশ্যই এ সুবিধার আওতায় আসতে হবে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। স্বাভাবিক নিয়মে খেলাপি হলে পরবর্তীতে তাকে আর ঋণ দেয় না অন্য ব্যাংক। কিন্তু এ সুবিধার আওতায় এলে গ্রাহক কি ঋণ নেওয়ার যোগ্য হবেনÑ এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, প্রথমেই তাকে ঋণ দেওয়া হবে না। প্রথমে তার সার্বিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হবে। যদি কমিটি মনে করে তার ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে আরও ঋণ প্রয়োজন এবং ঋণ পরিশোধে তার পারফরম্যান্স ভালো তাহলেই আরও ঋণ দেয়ওার ক্ষেত্রে উদ্যোগ নেওয়া হবে। রাতারাতি তাকে আবার ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনোভাবেই সুযোগ দেবে না বাংলাদেশ ব্যাংক। 
ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপি ঠেকানো চ্যালেঞ্জ : বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পুনঃতফসিলীকরণ নীতিমালা চূড়ান্ত করা হলেও সার্বিক দিক তদারকি করবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক বিভাগ। প্রশ্ন উঠেছে, এমন উদ্যোগের সঠিক উদ্দেশ্য নিয়ে। অভ্যাসগত ঋণ খেলাপিদের ঠেকানোটাই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সদস্য ড. জামাল উদ্দিন মনে করেন, ব্যাংক এবং গ্রাহক উভয়কেই বাঁচাতে হবে। তবে, ইচ্ছাকৃত না এমন ঋণ খেলাপি যারা তাদের শক্তহাতে শনাক্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো আপস করলে আরও ক্ষতির মুখে পড়বে দেশের ব্যাংক খাত। সঠিকভাবে প্রকৃতজনকে শনাক্ত করতে হবে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ব্যাংক খাত টেনে তুলতে দেশে দেশেই উদ্যোগ নেয় সরকার। ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মন্দায় কয়েকটি ব্যাংক দেওলিয়া হতে আবেদন করে। তবে, ওই সময় সরকার ওই সব ব্যাংককে অর্থায়ন সুবিধা দেয়। বাংলাদেশে সমস্যা হচ্ছে সঠিক ব্যবস্থাপনা।