আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৬-০৫-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

ভূমধ্যসাগরে ট্রলারডুবি

জাকির ও সজীবের পরিবারে আহাজারি

মাদারীপুর প্রতিনিধি
| প্রথম পাতা

দালালদের খপ্পরে জিম্মি হয়ে সাগরপথে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে ট্রলারডুবির ঘটনায় মাদারীপুরের নিহত জাকির হোসেন ও সজীব হোসেনের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। নিহত জাকির হোসেন শিবচর উপজেলার দত্তপাড়া ইউনিয়নের ৮নং চর গ্রামের সেকান্দার হাওলাদারের ছেলে এবং সজীব হোসেন সদর উপজেলার শিরখাড়া ইউনিয়নের উত্তর শিরখাড়া গ্রামের আজিজ শিকদারের ছেলে। নিখোঁজ রয়েছে সদর উপজেলার মনির হোসেন মাতুব্বর, নাদিম মাতুব্বর, সাইফুল ইসলাম ও রাজৈর উপজেলার নাঈম সিকদার নামের চার যুবক।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে পরিবারের মুখে হাসি ফুটাতে অর্থ উপার্জনের জন্য নূর-নবী খলিফা ও নূর ইসলাম খলিফা নামের দুই দালালের হাত ধরে বিদেশে পাড়ি 

জমায় জাকির। জাকিরকে স্থলপথে তুরস্ক নেওয়ার কথা থাকলেও দালাল চক্র লিবিয়া নিয়ে জিম্মি করে। লিবিয়ায় জাকির হোসেনকে আটকে রেখে পরিবারকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বিভিন্ন সময় টাকা দাবি করে তারা। টাকা দিতে অস্বীকার করলেই ছেলেকে বিক্রি করে দেবে অথবা অনাহারে রাখবে বলে হুমকি দিতে থাকে। এ পর্যন্ত পরিবার প্রায় ৮ লাখ ২০ হাজার টাকা দালালচক্রের কাছে দেন। বৃহস্পতিবার ভূমধ্যসাগরে লিবিয়ার উপকূল থেকে ৭৫ অভিবাসী নিয়ে ইতালির উদ্দেশে রওনা হওয়া ট্রলারডুবিতে নিহত হন জাকির হোসেনসহ ২৭ বাংলাদেশি। জাকির হোসেনকে হারিয়ে এখন দিশেহারা স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের লোকজন। স্বামীকে হারিয়ে কান্না যেন থামছেই না স্ত্রী শান্তা আক্তারের। অবুঝ দুটি কন্যাসন্তানকে সান্ত¦না দেওয়ার ভাষা নেই পরিবারের লোকজনের। এদিকে সন্তান ট্রলারডুবিতে নিহত হওয়াকে যেন বিশ^াসই করতে পারছে না নিহত জাকিরের বাবা-মামা। 
এদিকে সজীবের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির চারপাশে মানুষের ভিড়। সজীবের মা ও বোন যেন একটু পরপরই সজীবের ছবি বুকে জড়িয়ে ধরে কান্না করেই যাচ্ছে। সজীবের মা মোবাইল হাতে নিয়ে বারবার বলছিল যে তার সঙ্গে ছেলে সজীবের শেষ কী কথা হয়েছিল। তার ছেলে আর বেঁচে নেই এটি কিছুতেই যেন মানতে পারছে না মা। শোকময় পরিবারটি এমন দৃশ্য দেখে স্থানীয়দের মধ্যেও বইছে শোকের মাতম।
সজীবের স্বজনরা জানান, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা না দিয়েই গত ঈদের পরের দিন এক দালালের হাত ধরে লিবিয়া যায় সজীব। এরপর লিবিয়াতে ছয় মাস কাজ করার পরে নোয়াখালীর রুমান নামে এক দালালের খপ্পরে পরে সজীব। সেই দালাল আড়াই লাখ টাকার বিনিময়ে সজীবকে ইতালি নিয়ে যাওয়ার কথা বলে। সজীব রাজি হয় তার সঙ্গে যেতে। এরপর দালাল টাকার জন্য সজীবকে লিবিয়ার জিম্মি দশায় বন্দি করে রাখে। এরপর দীর্ঘ চার মাস পর বৃহস্পতিবার সজীবকে অবৈধপথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে লিবিয়া পৌঁছানোর কথা বলে নৌকা তোলা হয়। সজীবের বোন মিম আক্তার বলেন, ‘আমারে আফা কইয়া আর কে বোলাবো। আমার ভাইরে এক বছর রাইখা কেন বৃহস্পতিবার পাঠাইলি। আমি এহন কেমনে ভাইরে ভুইলা থাকমুরে। কোথায় গেলি সজীবরে। আমি আমার ভাইয়ের না দেখা পর্যন্ত রোজা ভাঙ্গমু না।’
মাদারীপুর জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম জানান, যারা বিদেশে যাচ্ছে তাদের উচিত দালালচক্রের মাধ্যমে অবৈধভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে না যাওয়া; কারণ দালালচক্র ঝুঁকির মধ্যেই তাদের বিভিন্ন প্রলোভনে পাঠায়। এ বিষয়ে সবচেয়ে সচেতন হওয়া সবার জরুরি; যা হোক দালালচক্রের বিরুদ্ধে যদি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার আইনগত সহায়তা চাইলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা করা হবে। অপরদিকে এ বিষয়ে মাদারীপুরের এসপি সুব্রত কুমার হালদারকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।