আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৬-০৫-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

ছাত্রলীগের কমিটি নিয়ে বিতর্ক

তালিকা থেকে ডজনখানেক নাম কাটলেন প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক ও ঢাবি প্রতিনিধি
| প্রথম পাতা

- বিতর্কিতদের বাদ দেওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
- পদবঞ্চিতদের কর্মসূচি অব্যাহত

সদ্যঘোষিত কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ঠাঁই পাওয়া বিতর্কিত নেতাদের বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও ছাত্র সংগঠনটির অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বুধবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবনে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে ডেকে এ নির্দেশ দেন। 

এদিকে, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদবঞ্চিতদের কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। বুধবার দুপুরে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের (ঢাবি) অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে মানববন্ধনের আয়োজন করে তারা। বিতর্কিত কমিটির প্রতিবাদে মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলনে বোনদের ওপর নির্মম হামলা ও শারীরিক লাঞ্ছনার প্রতিবাদে এ মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে যেসব বিতর্কিত নেতারা পদ পেয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করছেন পদবঞ্চিতরা। পরে সেটি তালিকা আকারে ঘোষণা করা হবে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে গণভবন সূত্রে জানা গেছে, বুধবার দুপুরে শোভন-রাব্বানীর সঙ্গে কথা বলার আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানকের সঙ্গে একান্তে আলাপ করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ তালিকায় থাকা ১২ থেকে ১৫ জন বিতর্কিত নেতার নাম দিয়ে চিহ্নিত করেন এবং তাদের বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন। তালিকায় যদি আরও কোনো বিতর্কিত নেতা থাকেন, খোঁজখবর নিয়ে তাদেরও বাদ দিতে ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেন । প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক। তবে এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানাতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেছেন। বৈঠকে জাহাঙ্গীর কবির নানক, উপদপ্তর সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিপ্লব বড়ুয়া এবং কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য এসএম কামাল হোসেন উপস্থিত ছিলেন। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর রাতে এ বিষয় নিয়ে ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতাদের বৈঠক হওয়ার কথা জানায় একটি সূত্র। সূত্রটি আরও জানায়, যেই ১২ থেকে ১৫ জন বিতর্কিত নেতার নাম এসেছে, তাদের পাশাপাশি অন্যদের চিহ্নিত করার পরই সবাইকে একসঙ্গে অব্যাহতি দেওয়ার হতে পারে। এসব জায়গায় ত্যাগী ও নিবেদিত ভাবমূর্তি সম্পন্ন ছাত্রদের স্থান দেওয়া হতে পারে। এক্ষেত্রে কাকে কী পদ দেওয়া হবে, সেটি তখনই নির্ধারণ করে আবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবহিত করে তার অনুমতি সাপেক্ষে প্রকাশ করা হতে পারে বলেও জানান তিনি। তবে এ প্রক্রিয়া খুব বেশি সময় নেওয়া হবে না বলেও জানায় সূত্রটি। 
এদিকে ঢাবিতে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে ছাত্রলীগের পদবঞ্চিত দেড় শতাধিক নেতা উপস্থিত ছিলেন; যারা নিজেদের সক্রিয় বলে দাবি করেন। মানববন্ধনে আন্দোলনকারীরা ‘জামায়াত-শিবির ছাত্রদল অনুপ্রবেশকারীদের কমিটি মানি না’, ‘আমাদের বোনদের ওপর হামলা কেন বিচার চাই বিচার চাই’, ‘অবৈধ কমিটি মানি না’, ‘অছাত্রদের আদু ভাইদের কমিটি মানি না’, ‘ক্যাম্পাস থেকে বহিষ্কৃতদের কমিটি মানি না’, ‘বঙ্গবন্ধুর ছাত্রলীগে অছাত্রদের স্থান নেই’, ‘চাকরিজীবী ব্যবসায়ীদের কুটিল কমিটি মানি না’ লিখিত ফেস্টুন প্রদর্শন করেন।
মধুর ক্যান্টিনে পদবঞ্চিতদের ওপর পদপ্রাপ্তদের হামলার ঘটনাকে ছোট ও সাধারণ আখ্যা দেওয়ায় আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফের কড়া সমালোচনা করেন মানববন্ধনে পদবঞ্চিত শামসুন নাহার হল শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি নিপু ইসলাম তন্বী। তিনি বলেন, আর কতটুকু লাঞ্ছিত হলে তাদের মনে হতো যে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নারীদের ওপর নির্যাতন হয়েছে? প্রশ্ন উঠেছেÑ আমরা মারা গেলে কী সত্যতা প্রমাণ হতো যে এখানে একটি বিশাল ঘটনা ঘটেছে? 
নিপু তন্বী বলেন, সত্যিকার অর্থে বলতে আজকে দুঃখ লাগছে ছাত্রলীগের নিবেদিত প্রাণ হিসেবে মধুর ক্যান্টিনের মতো জায়গায় ছাত্রলীগের কিছু ছোট ও বড় ভাই দ্বারা নির্যাতিত হই, এরপর কোনো মা, বাবা, ভাই, বোন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ করার জন্য তাদের সন্তানকে পাঠাবে না। রোকেয়া হল শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বিএম লিপি আক্তার বলেন, যাদের কমিটিতে রাখা হয়েছে, তাদের ২২ জনের আগে কোনো পদ ছিল না। অথচ তাদের পদ দেওয়া হয়েছে। আমাদের ছোট পদ দেওয়া হয়েছে বা আমরা পদ না পাওয়ার জন্য আন্দোলন করছি না, বরং কমিটিতে মাদক মামলার আসামি, বিবাহিত, অছাত্র, ছাত্রদল, রাজাকারের সন্তানদের পদ দেওয়া হয়েছেÑ তার জন্য আমরা আন্দোলন করছি। 
বিতর্কিতদের তালিকা প্রকাশের ঘোষণা : ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটিতে যারা বিতর্কিত, তাদের তালিকা প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছেন পদবঞ্চিতরা। তারা বলেন, ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে যেসব অপরাধী, বিতর্কিত ও বিভিন্ন অপকর্মের দায়ে অভিযুক্ত তাদের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলছে। তাদের তালিকা দ্রুতই প্রকাশ করা হবে। এ বিষয়ে পদবঞ্চিতদের অন্যতম ও সোহাগ-জাকির কমিটির প্রচার সম্পাদক সাইফ বাবু বলেন, আমরা এরই মধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছি। যারা বিভিন্ন অপকর্মের দায়ে অভিযুক্ত এবং বিতর্কিত তাদের তালিকা আমরা তৈরি করছি। দ্রুতই তা সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়ে দেওয়া হবে। এদের সংখ্যা শতাধিক বলে জানান সাইফ বাবু। 
যথাসময়েই তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ : সোমবার পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রকাশের পর সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে ছাত্রলীগের দুইটি পক্ষ। পদবঞ্চিতদের বিক্ষোভ মিছিলে নারী নেত্রীদের লাঞ্ছনার ঘটনায় সংবাদ সম্মেলন করতে গেলে হামলা করে পদপ্রাপ্তদের একটি পক্ষ। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আহত হন প্রায় ১৫ জনের মতো। এ ঘটনায় তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে সময় বেঁধে দেওয়া হয় ৪৮ ঘণ্টার। তদন্ত কমিটির অগ্রগতির বিষয়ে কমিটির প্রধান ও নতুন কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বলেন, আমরা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। আমরা কাজ শুরু করেছি। যাদের সঙ্গে কথা বলার, তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। গুরুত্বসহকারে বিষয়টি দেখা হচ্ছে।