আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৩-০৬-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

ঈদের চাঁদ প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

গাজী মিজানুর রহমান
| সম্পাদকীয়

এবার ঈদের চাঁদ দেখা নিয়ে অনেক হাস্যরসের অবতারণা হয়েছে। এর কারণ, চাঁদ দেখা কমিটি প্রথমে ঘোষণা দেয়, দেশের কোথাও চাঁদ দেখা যায়নি, বৃহস্পতিবারে ঈদ হবে। এ সিদ্ধান্ত আবার রাত ১১টা ২০ মিনিটে পরিবর্তন করা হয়। চাঁদ দেখা কমিটির ভাষ্যমতে, কুড়িগ্রাম এবং লালমনিরহাটে ১০-এর অধিক মানুষ চাঁদ দেখেছিলেন। জেলা প্রশাসকরা এ তথ্য নিশ্চিত করলে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি দ্বিতীয়বার বসে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। সিদ্ধান্তটি সম্পর্কে দ্বিমত করার কিছু নেই। কিন্তু সার্বিক প্রক্রিয়ার মধ্যে কিছু প্রশ্নবোধক চিহ্ন রয়ে গেছে। কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসকরা জাতীয় কমিটিকে সময়মতো তথ্য দিতে অপারগ হলেন কেন? জেলা কমিটি কি তাদের জেলায় চাঁদ দেখা গিয়েছে বা যায়নি, সে সম্পর্কে পর্যাপ্ত খোঁজখবর নিয়েছিল? জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি প্রথমবারের ঘোষণা আরও একটু দেরি করে দিতে পারত কি না? 

চাঁদ দেখার ঘোষণা খুবই স্পর্শকাতর একটা বিষয়। চাঁদ দেখতে পাওয়ার দাবি অনেক সময় ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়। অনেক সময় সাদা মেঘের ফালি দেখে অনেকে চাঁদ ভাবেন। তাই ভালো করে তথ্য যাচাই করার প্রয়োজন পড়ে। এ প্রসঙ্গে এই নিবন্ধের লেখকের একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা রয়েছে, যা উল্লেখযোগ্য। ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ২২ তারিখে লেখক নোয়াখালীতে জেলা প্রশাসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ওই দিন জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি ঘোষণা করে, দেশের কোথাও চাঁদ দেখা যায়নি বিধায় রমজান মাসের রোজা পরদিন অর্থাৎ ২৩ তারিখ থেকে শুরু হবে না। সেদিন রাত ১০টার পর মন্ত্রণালয় থেকে লেখককে ফোনে জানানো হয়, কেউ একজন ঢাকায় ফোন করে জানিয়েছেন, নোয়াখালীর সুবর্ণচরে একটি মাদ্রাসার ছাত্ররা চাঁদ দেখেছে। এ তথ্যের সত্যাসত্য যাচাই করার জন্য লেখক সে মাদ্রাসায় গিয়ে শিক্ষক ও ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলেন। তারা বলেন, একজন ছাত্র চাঁদ দেখেছে, তবে মাদ্রাসার কোনো শিক্ষক বা দ্বিতীয় কোনো ছাত্র চাঁদ দেখেনি। ওই ছাত্রের চাঁদ দেখার ঘটনাটি মাদ্রাসায় বা সংলগ্ন এলাকায় তেমন একটা আলোচিত হয়নি। মাদ্রাসা ছাড়া এলাকার অন্য কেউ রোজা রাখবে, এমন প্রস্তুতিও দেখা যায়নি। অতএব, চাঁদ দেখার দাবি সুপ্রতিষ্ঠিত নয়, এমন জানিয়ে লেখক ঢাকায় মতামত দেন। এর ফলে পূর্বে গৃহীত রোজা শুরু না হওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। রমজান মাস শেষ হলে এ সিদ্ধান্তটি যে সঠিক ছিল, তা প্রমাণিত হয়। কারণ, দেখা গিয়েছিল, বিবেচ্য ২৩ তারিখে রোজা শুরু করলে সেবার বাংলাদেশে ৩১ রোজা হয়ে যেত, যা কখনোই সম্ভব নয়। 
অমাবস্যা শেষ হওয়ার পর নতুন মাসের চাঁদ ওঠে। নতুন চাঁদ জন্ম নেওয়ার কমপক্ষে ১৮ ঘণ্টা বয়স হলেই তাকে খালি চোখে দেখা যায়। আবার দেখতে পাওয়ার শর্তের মধ্যে ১৮ ঘণ্টা বয়সের আরেকটা শর্ত হচ্ছেÑ সূর্য ডোবার পর অন্তত ২০ মিনিট পর্যন্ত চাঁদটাকে আকাশে ভাসতে হবে। এছাড়া দেখার জায়গা এবং সূর্য ও চাঁদের মধ্যে ১০ ডিগ্রির উপরে কোণ সৃষ্টি হতে হয়। এসব শর্ত পূরণ না হলে চাঁদ দেখা যায় না। সাধারণত পশ্চিমে অবস্থিত স্থানে চাঁদ আগে দেখা যায়। তবে গোলার্ধ আলাদা হলে ১০ ডিগ্রির শর্ত পূরণের হেরফেরের কারণে পূর্ব-পশ্চিমের এ শর্ত নাও খাটতে পারে। এসব বিষয় জ্যোতির্বিদরা হিসাব করে বের করতে পারেন। বৈজ্ঞানিক এ তথ্য চাঁদ দেখার বা না দেখার চাক্ষুস সাক্ষ্য যাচাইয়ের কাজে সহায়তা করে।
এবার বাংলাদেশ থেকে চাঁদ দেখতে পারার পক্ষে পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য জোরালো ছিল। অধিকন্তু উপমহাদেশের দুটি দেশ ভারত-পাকিস্তান বুধবার ঈদ হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিল। আমাদের দেশ থেকে পূর্বদিকে অবস্থিত দেশও বুধবারে ঈদ করবেÑ ওয়েবসাইটে এমন তথ্য ছিল। ভারতের দু-একটি পত্রিকায় আমাদের সময় রাত ৮টা ৩০ মিনিটের পর পর অনলাইনে আপলোড করা খবরে চাঁদ দেখার তথ্য দেওয়া হয়েছিল বলে দেখা যায়। এসব তথ্য আর বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য হাতে থাকায় প্রথম বৈঠকের ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত আরও অনুসন্ধানের জন্য একটু বিলম্বিত করলে দ্বিতীয়বার বসার প্রয়োজন দেখা দিত না বলে মনে হয়। কুড়িগ্রাম এবং লালমনিরহাট জেলা চাঁদ দেখা কমিটি কেন স্বপ্রণোদিত হয়ে আগেভাগে খবর দিতে পারল না, তা অনুসন্ধান করা দরকার। দেশের অধিকাংশ এলাকার আকাশ মেঘলা ছিল বলে একটা এলাকায়, যেখানে মেঘের উপস্থিতি ছিল না, সেখানে চাঁদ দেখার সম্ভাবনা প্রবল ছিল। তাই সেখানকার জেলা কমিটির কাছ থেকে বেশি দায়িত্বশীলতা আশা করা অমূলক নয়। ভবিষ্যতে আমাদের সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে বলে মনে করি। হ

ষ গাজী মিজানুর রহমান 
লেখক এবং সাবেক সিভিল সার্ভেন্ট