আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৩-০৬-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

তিন বছরেও চার্জশিট জমা হয়নি

থেমে আছে আলোচিত মিতু হত্যার তদন্ত

শ্বশুরের দাবি, খুনে জড়িত বাবুল আক্তার

সাইফুদ্দিন তুহিন ও শানে আলম সজল, চট্টগ্রাম
| শেষ পাতা

সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যা মামলা তদন্তের কোনো অগ্রগতি নেই। চার্জশিট দেওয়া হয়নি তিন বছরেও। কবে চার্জশিট দেওয়া হবে তা তদন্ত সংশ্লিষ্ট কেউ সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না। চার্জশিট দিতে দেরি হওয়ায় জন্ম দিচ্ছে নানা প্রশ্নের। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, আসল খুনিকে আড়াল করার প্রক্রিয়ায় থেমে আছে তদন্ত। আদালতে জমা দেওয়া হচ্ছে না চার্জশিট। তবে পুলিশ বলছে, তদন্ত কাজ শেষ পর্যায়ে। শিগগিরই দেওয়া হবে চার্জশিট। হত্যা মামলাটির নানা বিষয় খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, তদন্ত তিন বছরেও শেষ করতে পারেনি পুলিশ। কবে নাগাদ তদন্ত শেষ হবে তা সুনির্দিষ্টভাবে কিছুই বলতে পারছেন না তদন্ত কর্মকর্তা। মামলার চার্জশিট দিতে না পারায় বিচার কাজও শুরু হচ্ছে না। এদিকে মিতু হত্যা মামলা তদন্তে সন্তুষ্ট নয় বলে জানান পরিবারের সদস্যরা। পুলিশ বলছে, হত্যাকা-ের মূল পরিকল্পনাকারীর খোঁজ এখনও মেলেনি। মিতু হত্যাকা-ের সঙ্গে সরাসরি অংশ নেওয়া মুছা ও কালু নামের দুজনকে মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের ধরতে পারলে সব স্পষ্ট হয়ে যাবে। আবার মুছার স্ত্রী পান্না আক্তার ঘটনার পরপরই সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন, মুছাকে পুলিশ বাসা থেকে ধরে নিয়ে গেছে। কিন্তু পুলিশ বলছে তার খোঁজ অব্যাহত আছে।
আলোচিত এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. কামরুজ্জামান। তিনি গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর জোনের দায়িত্বে থাকলেও বদলি হয়ে এখন প্রসিকিউশন শাখায় আছেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সিএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. কামরুজ্জামান বলেন, এখনও তদন্ত চলমান। তদন্তের কাজ শেষ হলে চার্জশিট দেওয়া হবে। কবে নাগাদ তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে এ ব্যাপারে এখনও সুনির্দিষ্টভাবে কিছুই বলেননি তদন্ত কর্মকর্তা। তদন্ত শেষ হলে শিগগিরই মামলার চার্জশিট দেওয়া হবে এমন কথাই জানালেন।
প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে নগরীর জিইসি মোড়ে ছেলেকে স্কুল বাসে তুলি দিতে যাওয়ার সময় প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও গুলি করে খুন করা হয় এসপি পতœী মিতুকে। মোটরসাইকেলে করে আসা কয়েকজন সেখানে ছেলের সামনে তাকে প্রথমে ছুরি মারে ও পরে গুলি করে হত্যা করে। সে সময় পদোন্নতি পেয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে যোগ দিয়ে ঢাকায় ছিলেন পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার। তার আগে তিনি চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনারের দায়িত্বে ছিলেন। সেই সময় চট্টগ্রামে বিভিন্ন জঙ্গিবিরোধী অভিযানের নেতৃত্ব দিয়ে আলোচনায় আসেন পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তার। মিতু হত্যার পর নগরীর পাঁচলাইশ থানায় বাবুল আক্তার বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলাটি প্রথমে থানা পুলিশ তদন্ত করলেও পরে নগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে মামলার তদন্তভার ন্যস্ত করা হয়। মিতু হত্যার বিচারের দাবিতে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন ও মা শাহেদা মোশাররফ। দ্রুত তদন্ত শেষ করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দাবি জানান তারা।
পুলিশ জানায়, মিতু হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলো আনোয়ার, ওয়াসিম, এহতেশামুল হক ভোলা, সাইদুল ইসলাম সিকদার ওরফে সাকু, শাহজাহান, আবু নাসের গুন্নু ও শাহজামান ওরফে রবিন। এর মধ্যে আবু নাসের গুন্নু ও শাহজামান ওরফে রবিনের এ হত্যাকা-ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি বলে সাবেক সিএমপি কমিশনার ইকবাল বাহার সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন। অপর পাঁচজনের মধ্যে সাইদুল ইসলাম ওরফে সাকুর বিরুদ্ধে অভিযোগ, হত্যায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি তিনিই সরবরাহ করেছেন তার বড় ভাই মুছা সিকদার ওরফে আবু মুছাকে। মুছা এ মোটরসাইকেল চালিয়েই মিতু হত্যাকা-ের নেতৃত্ব দেয়। অপর তিনজনের মধ্যে এহতেশামুল হক ভোলা মিতু হত্যাকা-ে অস্ত্র সরবরাহকারী। শাহজাহান, ওয়াসিম ও আনোয়ার হত্যাকা-ে সরাসরি জড়িত ছিল। এ ছাড়া মিতু হত্যায় সন্দেহভাজনদের মধ্যে রাশেদ ও নবী নামে দুজন পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। বর্তমানে পলাতক আছে মুছা সিকদার ও কালু নামে দুজন। গ্রেপ্তারদের মধ্যে ওয়াসিম ও আনোয়ার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। মুছার পরিকল্পনায় তারা মিতুকে খুন করেছে বলে জবানবন্দিতে দাবি করে। এদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে মুছাকে গ্রেপ্তারে কাজ চলছে বললেও তার পরিবারের দাবি, হত্যাকা-ের ১৭ দিনের মাথায় মুছাকে বন্দর থানা এলাকায় এক আত্মীয়ের বাসা থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। মুছার স্ত্রী পান্না আক্তার ২০১৬ সালের ৪ জুলাই চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেছিলেন, ২২ জুন বন্দর থানার তৎকালীন ওসি মহিউদ্দিন সেলিমের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল বন্দর এলাকায় তার এক পরিচিত ব্যক্তির বাসা থেকে মুছাকে গ্রেপ্তার করে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে এ দাবি নাকচ করে তিন মাস পর ২০১৬ সালের ৬ অক্টোবর সিএমপির তৎকালীন কমিশনার ইকবাল বাহার মুছা ও কালুর সন্ধান পেতে ৫ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন।
মিতুর বাবা সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন বুধবার আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, মিত্যু হত্যার তিন বছর পার হয়েছে। গেল দুই বছর পর্যন্ত মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে আমাদের কোনো ধরনের কথা হয়নি। মিতু হত্যার ব্যাপারে পুলিশকে আমরা কিছু তথ্য দিয়েছিলাম। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমরা তার কোনোটির উত্তর পাইনি। পুলিশ যেসব আসামিকে পলাতক বলছেন তাদের গ্রেপ্তারের খবরও পাইনি। তিনি বলেন, মিতুর স্বামী বাবুল আক্তারের কিছু তথ্য দিয়েছিলেন পরকীয়া সংক্রান্ত, তার কিছু বান্ধব, তার কিছু আপনজনের কথা বলেছিলাম সেগুলোর কোনো উত্তর পাইনি। আমরা বলছিলাম, মিতু হত্যার সঙ্গে বাবুল আক্তার সম্পৃক্ত। তাকে গ্রেপ্তার করা হোক। বাবুল আক্তারের যারা সহযোগী ছিল তাদেরও গ্রেপ্তার করা হোক। বাবুল আক্তারের বাসার কাজের লোক, সুইপাররা অনেক তথ্য জানে। কিন্তু তাদেরও আড়াল করা হয়েছে। আমরা চাই মূল আসামিকে গ্রেপ্তার করা হোক। বাবুল আক্তারের অপরাধ প্রমাণ হওয়ার কারণে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। খুনের মামলায় চাকরিচ্যুত করলে হবে না। প্রচলিত আইন আছে বাবুল আক্তারকে আইনের আওতায় আনা হোক। খুনের মামলায় তাকে আদালতে প্রেরণ করলে আদালত সেটার বিচার করবে। মিতুর বাবা মোশাররফ বলেন, মিতু ও বাবুল আক্তারের দুই বাচ্চার সঙ্গে আমাদের প্রায় দেড় বছর ধরে কোনো যোগাযোগ নেই। দ্রুত তদন্ত শেষ করে হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান মিতুর বাবা মোশাররফ।