আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৩-০৬-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

ভেড়া পালনে স্বাবলম্বী

আবদুর রহমান মিন্টু ও দীপক রায়, রংপুর
| সুসংবাদ প্রতিদিন

কোনো শিক্ষা নেই, নেই কোনো প্রশিক্ষণও। তবুও একজন দক্ষ ভেড়া খামারি হয়ে উঠেছেন তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালী ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের রসিদা বেগম। ভেড়া পালন করেই দিনমজুর স্বামীর সংসারে সচ্ছলতা এনেছেন রসিদা। প্রায় ৪০ বছর আগে তার বিয়ে হয় দরিদ্র কৃষক মনসুর আলীর সঙ্গে। বিয়ের পর স্বামীর সংসারে অভাব-অনটনে চলতে থাকে তার জীবন। একপর্যায়ে রসিদা বড় ভাইয়ের কাছ থেকে ৫০০ টাকা ধার নিয়ে ৩৬৫ টাকা দিয়ে একটি স্ত্রী ভেড়া কেনেন। কেনার এক মাস পর ভেড়াটি গর্ভবতী হয়। তারও ৬ মাস পর ভেড়াটি চারটি বাচ্চা প্রসব করে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি রসিদাকে। তার খামারে এখন ভেড়া রয়েছে ২২টি। ২৫টি ভেড়া দিয়েছেন প্রতিবেশীদের পালন করতে। তার ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনিদেরও কয়েকটি ভেড়া দিয়েছেন উপহার হিসেবে। এমনকি কোনো নিকট আত্মীয়ের জন্মদিন বা বিয়েতে তিনি এখন ভেড়াই দেন উপহার হিসেবে। তার দিনরাত কাটে এখন ভেড়ার পাল দেখাশোনা করে। তার কোনো আবাদি জমি ছিল না। অন্যের জমিতে ও মাঠে চরিয়ে ভেড়া পালন করতেন তিনি। প্রতি ৬ মাস পরপর তার একেকটি ভেড়া বাচ্চা দেয় তিন থেকে চারটি করে। সেসব বাচ্চা লালন পালন করে বড় করার পর বিক্রি করে যে টাকা পেয়েছেন তা জমিয়ে তিনি বেশ কিছু জমি বন্ধক নিয়েছেন। তার স্বামী এখন আর অন্যের বাড়িতে দিনমজুরের কাজ করে না। নিজেদের বন্ধক নেওয়া জমি দেখাশোনা আর স্ত্রীর সঙ্গে ভেড়া মাঠে চরিয়ে দিন কাটান তারা। রাতেও তারা ঘুমান ভেড়ার সঙ্গে অর্থাৎ ভেড়া রাখার ঘরে। ভেড়া বিক্রি করে সামান্য টাকা দিয়ে তিনি মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। দুই ছেলেকে কাঁচা তরিতরকারির ব্যবসায় লাগিয়ে দিয়েছেন। তারা এখন আলাদাভাবে ব্যবসা করে সংসার চালান। পুরো উপজেলায় এখন রসিদা একজন ভেড়া খামারির উদাহরণ। রসিদা বলেন, ৪০ বছর আগে আমি যখন স্বামীর বাড়িতে বউ হয়ে আসি তখন আমার স্বামীর কোনো জমি ছিল না। তিনি অন্যের বাড়ি বাড়ি গিয়ে দিনমজুরের কাজ করতেন। অভাবের সংসার ছিল আমার। এক কথায় নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। পরে আমি আমার চাচাকে দেখে ভেড়া পালনে উৎসাহিত হই। সে সময় ভেড়ার দামও তেমন একটা ছিল না। ২০০ থেকে ৪০০ টাকা হলেই একটি ভেড়া পাওয়া যেত। কিন্তু আমার স্বামীর অবস্থা এতটাই নাজুক ছিল যে, তিনি আমাকে সে টাকাটিও দিতে পারছিলেন না। তখন আমি আমার বড় ভাইকে সবকিছু খুলে বলে ৫০০ টাকা ধার হিসেবে নেই। সে টাকা থেকে ৩৬৫ টাকা দিয়ে একটি ভেড়া কিনি। আর বাকি টাকা দিয়ে আমার শোয়ার ঘরের এককোণে ভেড়া রাখার জায়গা তৈরি করি। ভেড়াটি কেনার একমাস পর সেটি গরম হয়। তখন সেটিকে প্রতিবেশীর বাড়ির পাঁঠা ভেড়া দিয়ে বীজ দিই। তাতে ভেড়াটি গাভীন হওয়ার ৬ মাস পর চারটি বাচ্চা হয়। বাচ্চাগুলোকে লালন পালন করে বড় করিয়ে একটি ভেড়া বিক্রি করে ভাইয়ের কাছ থেকে ধার নেয়া ৫০০ টাকা পরিশোধ করি। আর বাকি ভেড়াগুলো দেখভাল শুরু করি। বর্তমানে ভেড়ার পাশাপাশি আমার কয়েকটি গরু-ছাগলও আছে। আছে বেশ কয়েক জোড়া কবুতরও। কিন্তু আমার সংসারে ভেড়াই লক্ষ্মী। আর আজ যা কিছু আছে সব ভেড়া পালন করেই করেছি। আমি অন্যদেরও ভেড়া পালনে উৎসাহ দিই। লক্ষ্মীপুর গ্রামে শুধু রসিদাই নন। তাকে অনুসরণ করে খোদেজা, আম্বিয়া, খালেদা, শরীফাসহ আরও অনেকেই এখন ভেড়া পালন করে সংসারে সচ্ছলতা এনেছেন। এ গ্রামে বর্তমানে শতাধিক পরিবারে রয়েছে ছোট-বড় ভেড়ার খামার। সকাল হলেই সবাই দলবেঁধে ভেড়া নিয়ে চলে যান মাঠে। আর ঘরে ফেরেন গোধূলি লগ্নে। রসিদা, খোদেজা, আম্বিয়া, শরীফারা জানান, ভেড়াগুলোকে তারা কখনও টিকা দেন না। যখন কোনো ভেড়া অসুস্থ হয়ে পড়ে তখনই কেবল শরণাপন্ন হন উপজেলা পশু চিকিৎসক অথবা গ্রামের বিভিন্ন পশু ডাক্তারের। তবে তারা জানান, মাঝেমধ্যে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে দুই-এক বছর পর পর ডাক্তাররা গিয়ে ফ্রি হিসেবে বিভিন্ন রোগের টিকা দেন। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সিরাজুল ইসলাম জানান, আমি সব সময় চেষ্টা করি লক্ষ্মীপুরের এ ভোড়া খামারিদের জন্য কিছু করার। কিন্তু সরকারি বাজেট না এলে তো কিছু করতে পারি না। তবে যখনই সুযোগ পাই, যখনই কোনো রোগের টিকা সরকারিভাবে আসে তা নিয়ে তাদের কাছে ছুটে যাই। আগামী দুই-এক মাসের মধ্যে আবারও কয়েকটি রোগের টিকা আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এলেই আমি আবারও তা নিয়ে চলে যাব তাদের কাছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. শাহজালাল খন্দকার জানান, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তৎপরতায় ভেড়ার বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হার প্রায় ১৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ফলে গেল ৫ বছর আগে যেখানে রংপর জেলায় ভেড়ার সংখ্যা ছিল ৮৬ হাজার এখন সেখানে ভেড়ার সংখ্যা ১ লাখ ৪৬ হাজার ৮০০। বর্তমানে জেলায় পারিবারিক ভেড়ার খামারের সংখ্যা ৪৭০টি। ভেড়া পালন পদ্ধতি সহজ হওয়ায় এবং অতি সাধারণ খাদ্য গ্রহণের অভ্যাসের কারণে অনেকেই ভেড়া পালনে ঝুঁকে পড়েছেন। এরই মধ্যে তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালা ইউনিয়নের একটি গ্রাম ও কাউনিয়া উপজেলর টেপামধুপুর ইউনিয়নের একটি গ্রামকে ভেড়া পল্লি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের মাধ্যমে নিবিড় কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এ কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে সব উপজেলায় সম্প্রসারিত করা হবে। মো. শাহ্জালাল খন্দকার আরও বলেন, ভেড়ার মাংসকে জনপ্রিয় করার জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়া সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করে ভেড়া থেকে বছরে দুইবার পশম সংগ্রহ করা হলে, তা দিয়ে কার্পেট, কম্বল, মাদুর প্রস্তুতের মাধ্যম ভেড়া পালনকারীরা অর্থনৈতিকভাবে আরও স্বাবলম্বি হবেন।