আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৩-০৬-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

আট বিশ্ববিদ্যালয় সম্মত অন্যদেরও গুচ্ছবদ্ধ করার প্রস্তাব চূড়ান্ত

বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার উদ্যোগ

ইরফান এইচ সায়েম
| শেষ পাতা

সম্প্রতি এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শেষ হয়েছে। এ পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর শুরু হবে উচ্চশিক্ষায় ভর্তিযুদ্ধ। শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমাতে ভর্তির সময় এলেই দেশের সব স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিতভাবে বা গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা চালু নিয়ে তোড়জোড় হয়। এক দশকের বেশি সময় ধরে এ আলোচনার এবার অগ্রগতি হয়েছে। আসন্ন ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষ থেকে কৃষি ও কৃষির প্রাধান্য থাকা আট সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় একই দিনে ও একই প্রশ্নপত্রে সমন্বিতভাবে ভর্তি পরীক্ষা নিতে সম্মত হয়েছে। সমবৈশিষ্ট্যের বিচারে বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও গুচ্ছবদ্ধ করার প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ’। শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ কমাতে সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনিও মেডিকেল কলেজের আদলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন।

বর্তমানে দেশে স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ৪৯টি। এর মধ্যে ৪৫টিতে শিক্ষা কার্যক্রম চালু আছে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদাভাবে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এখন শিক্ষার্থী ও প্রতিযোগিতা দুটোই বেড়েছে। একজন শিক্ষার্থী ১০ থেকে ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেন। ভর্তির সময় এলেই দেখা যায় একেকজন অভিভাবক তাদের সন্তানদের নিয়ে ছুটছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়। এতে ছাত্রীরাই বেশি সমস্যায় পড়েন। এ ভোগান্তি কমাতে ২০০৮ সাল থেকেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় চেষ্টা করে এলেও সফল হয়নি। অভিযোগ আছেÑ আবেদন ফরম, খাতা ও পরিদর্শন ফি বাবদ যত টাকা খরচ হয়, তার কয়েক গুণ বেশি টাকা ভর্তিচ্ছুকদের কাছ থেকে আদায় করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নির্দেশনা অনুযায়ী, ভর্তি পরীক্ষার আয়ের ৪০ শতাংশ টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলে জমা রেখে তা উন্নয়নমূলক কর্মকা-ে ব্যয় করার কথা। কিন্তু অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় এ নিয়ম মেনে তা করে না বলে অভিযোগ আছে। স্বায়ত্তশাসিত চারটি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখার কথা বলে সমন্বিত ভর্তিতে রাজি হয় না। যেহেতু আলাদা আইনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলে, তাই সরকার জোর করে সিদ্ধান্ত চাপিয়েও দিতে পারে না।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কথা বিবেচনা করে গেল বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চ্যান্সেলর ও রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ভিসিদের সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা চালুর পরামর্শ দেন। এরপর এ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার তৎপরতা ইতিবাচক পথে এগুতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে মিলিত হয় ইউজিসি। সেখানেই আটটি বিশ্ববিদ্যালয় সমন্বিতভাবে ভর্তি পরীক্ষা নিতে রাজি হয়। এগুলো হচ্ছেÑ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এ প্রসঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আবদুল্লাহ আল হাসান চৌধুরী বলেন, আমরা সব কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের নিয়ে গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে বৈঠক করেছি। যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। আমরা আশাবাদী। ভর্তি বিষয়ে নতুন পদ্ধতিতে যাচ্ছি আমরা।
২৭ এপ্রিল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের সংগঠন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদের বৈঠকেও সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা সংক্রান্ত সাব-কমিটির সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন। বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় গুচ্ছবদ্ধ করে পরীক্ষার সিদ্ধান্ত হয়। এ ব্যাপারে নীতিমালা করার ব্যাপারে সদস্যরা মত দেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ। সমন্বিত ভর্তির বিষয়ে কমিটি করা হয়েছিল ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে। এ ব্যাপারে ড. হারুন-অর-রশিদ বলেন, আমাদের দেশে সাধারণ, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও প্রযুক্তিসহ কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের বিশ্ববিদ্যালয় আছে। সবাইকে গুচ্ছবদ্ধ করে কীভাবে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া যায়, সে লক্ষ্যে সাব-কমিটির সদস্যরা আলোচনা করেছেন। আমরা নীতিমালা ও প্রয়োজনীয় কর্মপন্থা তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পরিষদে তোলার পর তা সরকারের কাছে পাঠানো হবে।
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আলাদা আলাদাভাবে ভর্তি পরীক্ষা হওয়ায় প্রতি বছরই ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের দেশের নানা প্রান্তে দৌড়াতে গিয়ে আর্থিক, শারীরিক ও মানসিক ভোগান্তিতে পড়েন। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষাটি খুবই জরুরি। আমি জানি কিছু বড় বিশ্ববিদ্যালয় নানা কারণে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার বিরোধিতা করছে। এতে হয়রানি এবং অর্থের অপচয় কমবে। আমি শুনি ছেলেরা রাতে মসজিদে ঘুমিয়ে পরীক্ষা দেয়। মেয়েরা কোথায় গিয়ে থাকবে? মন্ত্রী বলেন, আমরা যদি মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা সমন্বিত করতে পারি, তাহলে কেন অন্য ভর্তি পরীক্ষা সমন্বিত করতে পারব না! আমি আশা করি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সহযোগিতা দেবে। আলাদা ভর্তি পরীক্ষার ওপর কয়েক বছর আগে গবেষণা চালায় বিশ্বব্যাংক পরিচালিত উচ্চশিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্প (হেকেপ)। সেখানে বলা হয়েছে, প্রতি মৌসুমে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়া, কোচিংসহ আনুষঙ্গিক খাতে একজন শিক্ষার্থীর গড়ে ৯৬ হাজার টাকা খরচ হয়। অনেক দরিদ্র শিক্ষার্থীর এ অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয় না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমন্বিত পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষার উদ্যোগ ২০০৮ সালে নেওয়া হলেও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতায় তা সম্ভব হচ্ছিল না। সর্বশেষ গেল বছর ১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চ্যান্সেলর এ বিষয়ে ভিসিদের ডেকে নির্দেশনা দেন। সময়ের স্বল্পতার অজুহাতে গেল বছরও তা চালু করা হয়নি।
২১ জুলাইয়ের মধ্যে চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের সম্ভাব্য তারিখ। এর সপ্তাহ খানেক পর দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়। সে হিসাবে মাত্র দেড় মাস আছে ভর্তি মৌসুমের। প্রসঙ্গত, তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান ২০০৮ সালে ভর্তি পরীক্ষায় সংস্কারে ভিসিদের নিয়ে বৈঠক করেন। সেখানেও সমন্বিত ভর্তির প্রস্তাব দেওয়া হলে বেশ কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন খর্ব হওয়ার শঙ্কা ব্যক্ত করেন। এ ইস্যুতে সদ্য সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদও ভিসিদের নিয়ে বৈঠক করেন। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটসহ বেশ কয়েকটি বড় বিশ্ববিদ্যালয় অসম্মতি জানায়। তবে ২০১৩ সালের ৭ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ভিসিদের সভায় সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত পোষণ করলেও তা আর আলোর মুখ দেখেনি।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভোগান্তি কমাতে একাদশ শ্রেণির মতো বিশ্ববিদ্যালয়েও সমন্বিত পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। এ নিয়ে ইউজিসির সঙ্গে বৈঠক করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ইউজিসি একটি প্রতিবেদন তৈরি করছে, সেখানে সব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরা হবে। ওই প্রতিবেদন পাওয়ার পর আমরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসিদের সঙ্গে বৈঠক করব। কীভাবে এটি বাস্তবায়ন করা যায়, তা আলাপ-আলোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি পদ্ধতি চালু করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি প্রক্রিয়া চালু করতে মন্ত্রণালয় ‘অনেক দূর এগিয়েছে’ জানিয়ে নওফেল বলেন, কয়েক বছরের মধ্যে আমরা সব বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করব।