আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৩-০৬-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

আজ বাজেট উপস্থাপন

যত চিন্তা ঘাটতি ও রাজস্ব আয় নিয়ে

আবু সাইম
| প্রথম পাতা

চলতি অর্থবছরের বাজেট ব্যয় মেটাতে সবচেয়ে বেশি নির্ভরতা ছিল রাজস্ব আয়ের ওপর। কিন্তু এতে কাক্সিক্ষত রাজস্ব না আসায় এরই মধ্যে কামনো হয়েছে লক্ষ্যমাত্রা। মার্চ পর্যন্ত রাজস্ব আয়ে ঘাটতিই রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা, যা বছর শেষে অনেক বাড়তে পারে। রাজস্ব আয়ের এ ঘাটতি চাপ বাড়িয়েছে বাজেটের মূল ঘাটতি পূরণে। তাই এ বছরের সংশোধিত বাজেটের আকারে বড় অঙ্কের কাঁটছাট হলেও বেড়েছে ঘাটতির পরিমাণ। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরের (২০১৯-২০) জন্য নেওয়া হচ্ছে প্রায় সোয়া ৫ লাখ কোটি টাকার বাজেট।

সব কিছু ঠিক থাকলে প্রস্তাবিত বাজেট আজ জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের তৃতীয় মেয়াদের এটি প্রথম বাজেট। একই সঙ্গে আ হ ম মুস্তফা কামালের প্রথম বাজেট এটি, যিনি এর আগের মেয়াদে পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। বাজেটের সম্ভাব্য শিরোনাম ‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ : সময় এখন আমাদের, সময় এখন বাংলাদেশের’।

অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, চলতি বছরের রাজস্ব আয়ের পিছুটান ও বিশাল ঘাটতি পূরণ, নতুন বাজেটে চিন্তার ছাপ ফেলবে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, আয়ের ক্ষেত্রে সুখবর না থাকলেও টাকার অঙ্কে বেশ বড়ই হচ্ছে আগামী বাজেট, যা চলতি বছরের মূল বাজেট থেকে ৫৮ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা বা ১২ দশমিক ৬২ শতাংশ এবং সংশোধিত বাজেট থেকে ৮০ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা বা ১৮ দশমিক ২২ শতাংশ বেশি। চলতি বছরের মূল বাজেট ছিল ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার, যা সংশোধিত বাজেটে ৪ লাখ ৪২ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা করা হয়।

আগামী অর্থবছরের বাজেটের সম্ভাব্য আকার হবে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এ বাজেট আকারে যেমন বিশাল, তেমনি এতে ঘাটতির পরিমাণও বিশালÑ প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি। এছাড়া বাজেটের প্রায় ৬৫ শতাংশ আয় আসার কথা রয়েছে রাজস্ব খাত থেকে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশই আদায় করবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। যদিও চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা পিছিয়ে রয়েছে এনবিআর, এখন পর্যন্ত এনবিআরের আয় প্রবৃদ্ধি যেখানে ৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। এ বছরে মূল লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৯ দশমিক ৯২ শতাংশ ও সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৬ দশমিক ২৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে আগামী বাজেটে। এ বছর বাজেটে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা। কিন্তু সংশোধিত বাজেটে তা ১৬ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকায় আনা হয়। তবে গেল মার্চ পর্যন্ত আদায় হয়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা, যা বছর শেষে লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৭০ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা কমে ২ লাখ কোটি টাকার কিছু বেশি হবে বলেই মনে করেন এনবিআর সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থায় আগামী বছর এনবিআরকে আদায় করতে হবে ৩ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকা বেশি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ ধরনের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এ বছরের লক্ষ্যমাত্রাই যেখানে অর্জন সম্ভব হচ্ছে না; সেখানে আগামী বছরের বড় লক্ষ্যমাত্রা আরও অসম্ভব হতে পারে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগও (সিপিডি) মনে করে, চলতি অর্থবছরের রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা দাঁড়াতে পারে এবং আগামী অর্থবছরেও রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের সম্ভাবনা কম। মঙ্গলবার বাজেট সামনে রেখে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটি জানিয়েছে, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ায় প্রতি বছর বাজেট ঘাটতি বাড়ছে এবং বাজেট বাস্তবায়নের হার কমছে। বাজেট ঘাটতি পূরণে আগামী ও এর পরের অর্থবছর ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ বেড়ে যেতে পারে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আসন্ন বাজেটে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে একটি কর্মপরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছে সিপিডি।
জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যন ও অর্থনীতি বিশ্লেষক ড. জায়েদ বখত আলোকিত বাংলদেশকে বলেন, আগামী বাজেটে প্রধান দুইটি চিন্তার কারণ হতে পারে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও ঘাটতি অর্থায়ন পূরণ করা। রাজস্ব যেখানে এ বছরই বেশ পিছিয়ে রয়েছে, সেখানে আগামী বছর কীভাবে তা আরও বাড়ানো যাবে, তা অর্থমন্ত্রীকে ভেবে দেখতে হবে। এজন্য রাজস্ব আয়ের নতুন নতুন খাত খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে ভ্যাট আইন সুষ্ঠুভাবে বাস্তাবায়ন করাও জরুরি। অন্যদিকে ঘাটতি পূরণে সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরতা কমানো ভালো। তবে সমস্যা হলো ব্যাংক ঋণনির্ভরতা বাড়ালে তা তারল্যের ওপর চাপ তৈরি করবে। এমনিতেই তারল্য সংকট রয়েছে। তবে এর বিকল্প হিসেবে সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও ঋণ নিতে পারে, এতে তারল্যে তেমন প্রভাব না-ও পড়তে পারে।
এদিকে চলতি অর্থবছরের মূল বাজেট ঘাটতির পরিমাণ ধরা ছিল ১ লাখ ২১ হাজার ২৪২ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ১৪২ কোটি টাকায়। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরে সামগ্রিক ঘাটতির পরিমাণ বেড়ে হচ্ছে ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা। বরাবরের মতো এ ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশের মধ্যে থাকলেও টাকার অঙ্কে অনেক বড়। এ বছরের মূল বাজেটের চেয়ে ২৩ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা এবং সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ২২ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা বাড়ছে ঘাটতি। এ ঘাটতি অর্থায়ন বাজেটের অন্যতম চিন্তার বিষয়। পুরোটাই দেশি-বিদেশি ঋণের মাধ্যমেই জোগান দিতে হবে। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ থেকে ৬৩ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা নেওয়ার কথা রয়েছে। ঋণের বাকিটা অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। 
চলতি অর্থবছর ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ ধরা ছিল ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকায়। অন্যদিকে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ লক্ষ্যমাত্রা ধরা ছিল ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা, লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হওয়ায় সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এ অবস্থায় নতুন বাজেটে সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হতে পরে। এর মধ্যে সঞ্চয়পত্র থেকে ২৭ হাজার কোটি টাকা এবং ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৈদেশিক ঋণ দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো। এ ঋণের সুদের হার কম, তাই খরচও কম। তবে অভ্যন্তরীণ উৎসের ঋণে সুদের হারও বেশি, ঝামেলাও বেশি। ব্যাংক থেকে সরকার বেশি অর্থ নিলে তারল্য সংকটের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণ কমে যাবে, মূল্যস্ফীতিও বাড়বে। আর সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে অর্থ নিলে বিপদ আরও বেশি। সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার বেশি, সরকারের ব্যয়ও বেশি। বিকল্প ও নিরাপদ জায়গা না থাকায় সাধারণ মানুষের আগ্রহ সঞ্চয়পত্রে বেশি। এজন্যই তো এ বছর সঞ্চয়পত্র থেকে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা নেওয়ার কথা থাকলেও ৯ মাসেই বিক্রি হয় প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা, যা বছর শেষে লক্ষ্যমাত্রার দ্বিগুণে পৌঁছতে পারে। এর ফলে ব্যাংকের সুদের হার যেমন কমছে না, তেমনি বাড়ছে বাজেটের সুদ পরিশোধ ব্যয়। সব মিলিয়ে বাজেট ব্যয়ের বড় অংশই ব্যয় হচ্ছে সুদ পরিশোধ খাতে। নতুন বাজেটে তা আরও বাড়বে। আগামী বাজেটে বিদেশ থেকে নেওয়া ঋণের সুদ পরিশোধে ৪ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধে ৫২ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ব্যাংক খাতে বর্তমানে তারল্য সংকট রয়েছে। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও আশানুরূপ নয়। বর্তমানে এটি কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এ অবস্থায় সরকার ব্যাংক খাত থেকে ঋণনির্ভরতা বাড়ালে তা তারল্য সংকট বাড়িয়ে দেবে, যা ঋণ বিতরণের গতি কমিয়ে দিতে পারে। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিলেও বাজারে অর্থপ্রবাহ বেড়ে মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে ভ্যাট আইন প্রয়োগের কথা থাকলেও, এটি বহুস্তরে প্রয়োগ হতে পারে। তাই রাজস্ব আয়ের নতুন পথ খুঁজতে হবে। রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার পথগুলো বন্ধ করতে হবে।