আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৩-০৬-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

জেলাবাসী প্রতীক্ষায় ৪৬ বছর

লক্ষ্মীপুরে রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প

মো. সহিদুল ইসলাম, লক্ষ্মীপুর
| দেশ

কৃষিপণ্য উৎপাদনে উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরের খ্যাতি দেশজোড়া। তবে এ জেলার পণ্য পরিবহন করতে হয় সড়ক অথবা নৌপথে। রেলে কৃষিপণ্য পরিবহন সাশ্রয়ী হলেও এখানে তার সুযোগ নেই। একই কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতেও নানা ভোগান্তি পোহাতে হয় এ জেলার বাসিন্দাদের। বাণিজ্যিক সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে ১৯৭৩ সালে লক্ষ্মীপুরে রেললাইন স্থাপনে জরিপ চালানো হয়। নানা জটিলতায় রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পটি আলোর মুখ না দেখায় ৪৬ বছর প্রতীক্ষায় রয়েছেন জেলাবাসী। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, লক্ষ্মীপুর নারিকেল, সুপারি, সয়াবিন ও ধান উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। জেলাটির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মেঘনা নদীতে প্রচুর ইলিশও পাওয়া যায়। কৃষিনির্ভর এ জেলায় প্রায় ১৮ লাখ মানুষের বসবাস। অথচ এ জেলার সঙ্গে নেই বিমান ও রেল যোগাযোগ। লক্ষ্মীপুরের পাশের জেলা চাঁদপুর ও নোয়াখালীতে রেল যোগাযোগ থাকলেও লক্ষ্মীপুর বঞ্চিত রয়েছে।
জানা যায়, রাজধানী ও চট্টগ্রাম থেকে প্রতিদিন কয়েকশ’ ট্রাক লক্ষ্মীপুরে পণ্য আনা-নেওয়া করে। এছাড়া কয়েকশ’ বাস ঢাকা-লক্ষ্মীপুর সড়কপথে যাত্রী পরিবহন করে। ভোলার বাসিন্দারাও লক্ষ্মীপুর-ভোলা নৌরুটে এসে একই সড়কে ঢাকায় যাতায়াত করেন। এছাড়া খুলনা, বরিশালসহ ২১ জেলার পণ্য পরিবহন ও চলাচলের অন্যতম পথ হলো লক্ষ্মীপুর-মজুচৌধুরীর হাট-ভোলা নৌরুট। তাই লক্ষ্মীপুরে রেললাইন স্থাপন হলে পরোক্ষভাবে এসব জেলার বাসিন্দারাও উপকৃত হবেন। লক্ষ্মীপুরে মেঘনার তীরে একটি নৌবন্দর ও সাড়ে ৩ হাজার একর জায়গায় একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেছে সরকার। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি রেললাইন স্থাপন করলে জেলার অর্থনীতিতেও গতি আসবে বলে ধারণা এলাকাবাসীর।
লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৩ সালে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ নোয়াখালীর চৌমুহনী থেকে লক্ষ্মীপুর পর্যন্ত রেললাইন স্থাপনের জন্য একটি জরিপ পরিচালনা করে। পরে নানা জটিলতা ও উদ্যোগের অভাবে থমকে যায় এ কার্যক্রম। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কয়েক বছর ধরেই লক্ষ্মীপুরে রেলপথ স্থাপনের জন্য রেল মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হচ্ছে। নোয়াখালীর চৌমুহনী থেকে লক্ষ্মীপুর, রায়পুর হয়ে চাঁদপুর পর্যন্ত ৭৫ কিলোমিটার অথবা চৌমুহনী থেকে লক্ষ্মীপুর পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার লাইন স্থাপনের প্রস্তাবও করা হয়। কিন্তু এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক অঞ্জন চন্দ্র পাল বলেন, রেললাইন স্থাপনের বিষয়ে দুইবার ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানানো হয়েছে। তাছাড়া সংশ্লিষ্ট দপ্তরেও চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনও কোনো সুখবর আসেনি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, লক্ষ্মীপুরে রেললাইন স্থাপনের জন্য ২০১৪ সালের ২৭ আগস্ট জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও মুক্তিযোদ্ধা এম আলাউদ্দিন তৎকালীন রেলমন্ত্রী মো. মুজিবুল হকের কাছে লিখিতভাবে আবেদন জানান। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রী নীতিমালার আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপককে নির্দেশ দেন। আবেদনে বলা হয়, লক্ষ্মীপুর জেলায় রেলপথ ও বিমানপথ বলতে কিছু নেই। বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও রাজধানী ঢাকা থেকে পণ্য আনা-নেওয়া করতে হয় সড়কপথে। এতে পর্যাপ্ত দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ফেনী-চৌমুহনী-লক্ষ্মীপুর রেলপথ সংযোজন করা হলে ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুর জেলার প্রায় ৮০ লাখ মানুষ রেল সুবিধার আওতায় আসবে। 
আবেদনের বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি এম আলাউদ্দিন বলেন, তদবির ও উদ্যোগের অভাবে আজও লক্ষ্মীপুরে রেললাইন স্থাপন হয়নি। বর্তমান সরকার রেলওয়ের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে লক্ষ্মীপুরে রেললাইন স্থাপনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানান তিনি।
এ আবেদন ছাড়াও একই বছরের ৩১ আগস্ট তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী (বর্তমান সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী) ওবায়দুল কাদের রেললাইন চেয়ে রেলমন্ত্রীর কাছে একটি চাহিদাপত্র (ডিও) দেন। এতে উল্লেখ করা হয়, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলার অধিবাসীদের বেশিরভাগ তাদের গ্রামের বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত করেন। ফেনী-চৌমুহনী-লক্ষ্মীপুর রুটে ট্রেন চালু করা হলে এ অঞ্চলসহ পাশের অঞ্চলের অধিবাসীরাও যাতায়াতের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা ভোগ করবেন এবং আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটবে। পাশাপাশি সরকারের বিপুল রাজস্ব আয় হবে।
এ বিষয়ে সাবেক বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এবং লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য একেএম শাহজাহান কামাল বলেন, আমি মন্ত্রী থাকাকালে লক্ষ্মীপুরে রেললাইন স্থাপনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কয়েকবার আলোচনা হয়েছে। বিষয়টি রেল মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সংসদ নির্বাচনের পর রেলমন্ত্রী বদল হওয়ায় এ কার্যক্রম কিছুটা ধীর হয়ে পড়েছে। ১৯৭৩ সালে লক্ষ্মীপুরে রেললাইন স্থাপনের জন্য জরিপ করা হয়। কয়েকটি স্টেশন শনাক্তসহ স্টেশন নম্বরও নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু নানা জটিলতার কারণে বিষয়টি আর সামনে এগোয়নি। বর্তমান সংসদেও বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। আশা করি, শিগগিরই সুফল পাওয়া যাবে।