আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৬-০৬-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

অর্থনীতির সমৃদ্ধিতে মহানবী (সা.) এর কর্মসূচি

রায়হান রাশেদ
| ইসলাম ও অর্থনীতি

বিশ্ববাসীর কল্যাণ ও বেঁচে থাকার কথা চিন্তা করে মানবতার নবী মুহাম্মদ (সা.) অর্থনীতিতে দিয়েছেন এক যুগান্তকারী নতুন কর্মসূচি। রাসুল (সা.) এর কর্মসূচি ছিল কোরআনের দেখানো পথ। রাসুল (সা.) এর দেওয়া কর্মসূচি অনুপাতে দেশ-সমাজ এবং ব্যক্তিজীবন গঠন করতে পারলে মানুষের অর্থনীতির চাকা সচল-সবল ও কল্যাণকর হবে। 

১. হালাল উপায়ে উপার্জন ও হারাম পথ বর্জন : ইসলামিক বিধানে ব্যবহারিক জীবনে কিছু কাজকে হালাল এবং কিছু কাজকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। উৎপাদন, ভোগ, বণ্টনের ক্ষেত্রেও এ বিধান প্রযোজ্য। ইসলাম মানুষকে উপার্জনের প্রতি উৎসাহিত করেছে। পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে উপার্জন অর্জনে। ব্যক্তি পছন্দমতো উৎপাদন, উপার্জন, ভোগ, বণ্টন করবে। রিজিক অন্বেষণ করবে। বেঁচে থাকার জগতে জীবন চালানোর দায়ে প্রয়োজনে উপার্জনে ব্রত হবে। কিন্তু হারাম পন্থায় তিল পরিমাণ উপার্জন করা যাবে না। ইসলাম কখনও হারাম পন্থাকে সমর্থন করে না। পৃথিবীর অন্য সব ইজমভিত্তিক অর্থনীতি মতবাদে হালাল-হারামের পার্থক্য নেই। মানুষের জীবন বিপন্ন ও ক্ষতির দিকে ভ্রƒক্ষেপ নেই। তাদের অর্থনীতি স্বাবলম্বী হওয়ায় প্রধান লক্ষ্য ও স্বপ্ন। তবে সভ্য মানুষের ধর্ম ইসলামে; আছে নীতি, আদর্শ ও বিধিবিধান। হালাল পন্থায় উপার্জনকে ইবাদত ও হারাম পন্থাকে নিষিদ্ধ এবং গোনাহের কাজ বলেছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং উত্তম পন্থায় জীবিকা অন্বেষণ করো, যা হালাল; তাই গ্রহণ করো এবং যা হারাম, তা বর্জন করো।’ (ইবনে মাজাহ : ২১৪৪)। 

২. সুদ উচ্ছেদ : শুদ্ধ পবিত্র ও সৃজনশীল সমাজ গঠনের বড় অন্তরায় হলো সুদ। রাসুল (সা.) যখন দেখলেন, সমাজে সুদের মহামারি এবং গণমানুষ সুদের কবলে পড়ে পাঁজর ভেঙে নেতিয়ে পড়েছে। তিনি তখন সমাজ থেকে সুদমুক্তির সেøাগান তুললেন। সমাজ থেকে দুর্নীতির অবসান ও জুলুম তন্ত্রকে নিঃশেষ করার প্রয়োজনে তিনি সুদ প্রথাকে উচ্ছেদ করেন। সুদভিক্তিক সব কারবার লেনদেনকে হারাম ঘোষণা করেন। পবিত্র কোরআনে ঘোষণা হয়েছেÑ ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সূরা বাকারা : ২৭৫)। 

এ প্রসঙ্গে হাদিসে বিধৃত হয়েছেÑ রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা সুদ খায়, সুদ দেয়, সুদের হিসাব লেখে এবং সুদের সাক্ষ্য দেয় তারা সবাই সমান পাপী।’ (তিরমিজি : ১২০৬)। 

ইসলামি অর্থনীতিতে সবচেয়ে অসৎ ও জঘন্য কাজ হলো সুদ এবং সমাজ শোষণের শক্তিশালী মাধ্যম। সুদের অভিশপ্ত কালে পড়ে একমাত্র সম্বল বাস্তুভিটা হারায় মানুষ। দরিদ্র আরও দরিদ্র হয়। ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। দ্রব্যমূল্য ক্রমেই বৃদ্ধি পায়। আর ইসলাম মানুষকে সুদ প্রথার বিলুপ্ত ঘটিয়ে নতুন অর্থনীতির ছামিয়ানার ছায়া দেয়। 

৩. ব্যবসায়িক অসাধুতা উচ্ছেদ : মদিনার প্রায় সব মানুষের কাজকর্মে ব্যবসাবাণিজ্যে তিনি প্রত্যক্ষ করলেন ব্যবসায়িক অসাধুতা বিরাজমান। ইসলামি অর্থনীতিতে সর্বপ্রকার ব্যবসায়িক অসাধুতা নিন্দানীয় ও কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ব্যবসায়িক অসাধুতার ফলে সমাজে মানুষে গোত্রে মহল্লায় লেগে থাকে অশান্তির দাবদাহ। কষ্ট-দুর্দশা সাবইকে আকড়ে ধরে অক্টোপাসের মতো। গরিব কৃষক মজদুরদের কষ্টের সীমা থাকে না। বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় ব্যবসায়িক অসাধুতা কোনো অশোভন ও মন্দ কাজ নয়। এতেই যেন তাদের অর্থব্যবস্থার উন্নতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ব্যবসায়িক অসাধুতা শুধু কালোবাজারি-চোরাকারবারি নয়, মজুতদারি, ওজনে কম দেওয়া, ভেজাল, নকল প্রভৃতি জঘন্য অপরাধ। ইসলামের নবী নিষেধ করেছেন ব্যবসায়িক অসাধুতা। তাঁর সোনালি যুগের অর্থব্যবস্থায় কঠোর হাতে দমন করেছেন মানবতা বিবর্জিত অসাধুতা। আল্লাহ বলেনÑ ‘তোমরা মাপে ঠিক দাও এবং কারও ক্ষতি করো না, সঠিক দাঁড়িপাল্লায় ঠিকমতো ওজন করো। লোকদের পরিমাপে কম বা নিকৃষ্ট কিংবা দোষযুক্ত জিনিস দিও না এবং দুনিয়ায় অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়িয়ো না।’ (সূরা শুয়ারা : ৮১-৮৩)। মজুতদারি প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছেÑ রাসুল (সা.) বলেন, ‘কেবল পাপী ব্যক্তিই মজুতদারি করে।’ (মুসলিম : ১৬০৫)। 

৪. জাকাত ব্যবস্থার প্রবর্তন : জাকাত ইসলামের রুকন। পাঁচ স্তম্ভের একটি। কোরআনে নামাজ কায়েমের পর জাকাত আদায়ের আদেশ করা হয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) রাসুল (সা.) এর আদেশে সম্পদশালীরা জাকাত আদায়ে প্রতিযোগিতা করতেন। জাকাতের মাধ্যমে সমাজে সাম্য-সৌহার্দ্য সৃষ্টি হয়। মানুষের মাঝে ভেদাভেদ কমে আসে। গরিবের মুখে হাসি ফুটে। এতিমের উদরে আহার প্রবেশ করে। জাকাত আদায়ে সমাজের কাঠামো, মানুষের জীবনযাপন সুখকর হয়। মানুষের অর্থনীতিতে গতিবেগ সঞ্চারিত হয়। আল্লাহ বলেনÑ ‘তোমরা নামাজ কায়েম কর এবং জাকাত দাও।’ (সূরা হজ : ৭৮)। 

৫. বায়তুল মাল প্রতিষ্ঠা : বিভিন্ন উৎস থেকে অর্জিত এবং রাষ্ট্রের কোষাগারে জমাকৃত ধনসম্পদকেই বায়তুল মাল বলে। ইসলামি রাষ্ট্রের সব ব্যক্তির এতে সম্মিলিত মালিকানা রয়েছে। রাসুল (সা.) মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর বায়তুল মাল প্রতিষ্ঠা করেন। বায়তুল মালে সঞ্চিত ধনসম্পদের ওপর সবার সাধারণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেন। রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক যেন মৌলিক মানবিক প্রয়োজনীয় চাহিদা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্য তিনি বায়তুল মাল গড়েন। গরিব এতিম দুস্থ অসহায় মানুষের জন্য তাদের জীবন বাঁচানোর জন্য এ প্রয়াস ও উদ্যোগ। পৃথিবীর অবহেলিত বঞ্চিত মানুষের জন্য মহানবীর এ অভূতপূর্ব কর্মসূচি। ইসলামের আগে মানবতার কল্যাণে এমন ব্যবস্থা কেউ প্রণয়ন করেনি। 

৬. মানবিক শ্রমনীতির প্রবর্তন : বিশ্বের ইতিহাসে মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ (সা.) সর্ব প্রথম শ্রমনীতির প্রবর্তন করেন। তাদের বেতন-ভাতা, কষ্ট ও ঘামের মূল্য দিতে উৎসাহিত করেন। পৃথিবীপাড়ার ইতিহাসে তাদের সম্মান, তাদের বেঁচে থাকা, তাদের মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটান। ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি পরিশোধ কর।’ (ইবনে মাজাহ)। 

৭. উত্তরাধিকার ব্যবস্থার যৌক্তিক রূপদান : রাসুল (সা.) আবির্ভাবের আগে পৃথিবীতে ভূমির উত্তরাধিকারের আইন ছিল অস্বাভাবিক। পুরুষানুক্রমে পরিবারের জ্যৈষ্ঠ সন্তানই সব সম্পদ পেত। অন্যরা হতো বঞ্চিত। অথবা পরিবারের ছেলেরা সম্পদের অধিকারী হতো; কিন্তু নারীরা পেত না সম্পদের কিছুই। বরাবর ছিল তারা অবহেলিত-বঞ্চিত এবং লাঞ্ছিত। এ নীতিতেই চলছিল বিশ্বের উত্তরাধিকার ব্যবস্থা। অতঃপর রাসুল (সা.) ধরায় আগমন করে সমাজের দুরবস্থা, মানবতা বিবর্জিত আইন ধূলিসাৎ করে মানব অধিকারের সেøাগান তুলেন। সাম্য ও সংহতির ডাক দেন। মানুষ ও নারীর অধিকার নিশ্চিত প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি একমাত্র পৃথিবীর সফল শুদ্ধ অভিনেতা, যিনি পুরুষের পাশাপাশি নারীর অধিকার দিয়েছেন। উত্তরাধিকার আইন প্রসঙ্গে নির্ভুল গ্রন্থ কোরআনে ঘোষিত হয়েছেÑ ‘বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষদেরও অংশ আছে এবং বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ আছে; অল্প হোক কিংবা বেশি। এ অংশ নির্ধারিত।’ (সূরা নিসা : ৭)।

৮. রাষ্ট্রের ন্যায়সংগত হস্তক্ষেপের বিধান : সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা ইসলামের বড় লক্ষ্য। সমাজের জুলুম, অত্যাচার, দুর্নীতি, অর্থনীতিতে শোষণ-শাসন, সুদ, ঘুষ, মুনাফাখোরি, মজুতদারি বন্ধ করতে রাসুল (সা.) ন্যায়সংগত হস্তক্ষেপের বিধান আরোপ করেন। এতে রাষ্ট্র ও তার অর্থনীতির বাকপরিবর্তন হয়। সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরে আসে। তিনি সমাজের মানুষের জন্য কায়েম করেন সামাজিক নীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা। জনকল্যাণে রাখেন সর্বাধিক জোরালো ভূমিকা। 

পৃথিবীর অর্থনীতির চাকাকে সচল-সবল ও সুষ্ঠু-সমৃদ্ধি রাখার জন্য রাসুল (সা.) এর দেওয়া কর্মসূচিই হলো সবচেয়ে উপযোগী এবং কল্যাণকামী অর্থনীতিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মূলমন্ত্র।