আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৬-০৬-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

আইসিএবি-ডেইলি স্টারের গোলটেবিল

‘দু-একটি ব্যাংককে দেউলিয়া হতে দিন’

নিজস্ব প্রতিবেদক
| অর্থ-বাণিজ্য

ঋণ খেলাপিদের ছবি ছাপিয়ে দেওয়া, নেপাল ও চীনের মতো বিদেশ গমন ও দ্রুতগতির ট্রেনে চড়তে না দেওয়া, এমন কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ

সরকারি ব্যাংকে সরকার নিয়মিত মূলধন জোগান দিচ্ছে। এমনকি বেসরকারি ব্যাংককেও উদ্ধার করা হচ্ছে। এটা ভালো উদাহরণ তৈরি করছে না। এতে অনেকে মনে করতে পারেন, খারাপ করলে অসুবিধা কী, সরকার তো আছেই। ব্যাংক খাতে সরকার উদ্যোগে মূলধন জোগান দেওয়ার বদলে দুয়েকটি ব্যাংককে মরে যেতে দেওয়ার পক্ষে ব্যাংকের নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সভাপতি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। একই সঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানের উদ্দেশে তিনি বলেন, দুয়েকটি ব্যাংককে দেউলিয়া হতে দিন না।
প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে শনিবার ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) ও দ্য ডেইলি স্টার আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে মাহবুবুর রহমান এসব কথা বলেন। রাজধানীর ফার্মগেটে ডেইলি স্টার ভবনে আয়োজিত বৈঠকে ঋণ খেলাপিদের ছবি ছাপিয়ে দেওয়ার পরামর্শও আসে। অনুষ্ঠানে ব্যাংক খাত নিয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক রকিবুর রহমানও কথা বলেন।
এতে আইসিএবির সভাপতি এএফ নেসারউদ্দিন, সাবেক সভাপতি হুমায়ুন কবির, বিআইডিএসের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো নাজনীন আহমেদ প্রমুখ বক্তব্য দেন। এতে বাজেট নিয়ে দুটি উপস্থাপনা তুলে ধরেন আইসিএবির কাউন্সিল সদস্য শাহাদাত হোসেন ও স্নেহাশীষ বড়ুয়া।
মাহবুবুর রহমান বলেন, খেলাপি ঋণ নিয়ে যেসব নিয়মকানুন করা হচ্ছে, সেটা তাৎক্ষণিক কাগজে-কলমে কিছু সুফল মিলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি সুফল পেতে হলে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থঋণ-সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তিতে হাইকোর্টে আলাদা বেঞ্চ করতে হবে। বাজেটে ব্যাংক কমিশন গঠন নিয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল যে উদ্যোগের কথা বলেছেন, সেটা ভালো। তবে বাংলাদেশে কমিশন হলেও কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। কমিশনে কাদের নিয়োগ দেওয়া হবে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। 
ব্যাংক সুদের হার হুকুম দিয়ে কমানো যায় না উল্লেখ করে মাহবুবুর রহমান বলেন, কেনিয়া এটা করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। এর আগে অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানও করতে গিয়ে পারেননি। তিনি বলেন, যখন কেউ দোষ করে, তখন তাকে সাজা না দিয়ে সবাইকে শাস্তি দেওয়া ঠিক নয়।
ব্যাংক খাতের সংস্কারে ব্যাংকিং কমিশন গঠন প্রসঙ্গে এমএ মান্নান বলেন, ব্যাংকিং কমিশনের দরকার নেই। এ কমিশনের মাধ্যমে বলা হবে, গাড়ি দাও, বাড়ি দাও, টাকা দাও। এতে তাদের চাকরি ছাড়া কিছুই হবে না। এ কমিশন সম্বন্ধে আমার ডাউট (সংশয়) আছে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্পর্কে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, আইএমইডি (পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ) আমার আওতায় আছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। তবে, এখানে একটা ভুল তথ্য আছে। সেটা হলো, অর্থনৈতিক গ্যাপ থাকে। কাজের বাস্তবায়ন হলেও অনেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দেরিতে বিল পান। ফলে, আর্থিক দিক থেকে আমরা পিছিয়ে থাকি। আবার, এডিপি (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) সংশোধন করা হয়। তাই বলবÑ এডিপি নয়, সংশোধিত এডিপি হিসাব করেন। মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাইভেট খাত আসছে। বড় সাহেবরা বড় কিছু করতে চাইলে আমরা স্বাগত জানাব। বৈষম্য নিয়ে অনেক কথা হয়, আমরা এটা দূর করতে কাজ করছি।
তিনি আরও বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছি। সুতরাং, এনবিআরের (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) সঙ্গে কাজ করেছি। এখানে প্রচুর রিফর্ম (সংশোধন) করা দরকার। তবে, বলা সহজ, করা কঠিন। বাজেটের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আমরা দেখছি জেন্ডার বাজেট, শিশু বাজেট ও জেলা বাজেট। এটা কেন করতে হবে? একটাই বাজেট হবে দেশের সব মানুষের জন্য। আমরা উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিই। এসব প্রকল্পে নারী ও শিশুর উন্নয়নে নানা খাত থাকে। তাহলে আলাদা বাজেট কেন থাকতে হবে? জেলা বাজেট কী? আমাদের বাজেট কি জেলার বাইরে বাস্তবায়িত হয়? মুহিত সাহেবকে (সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত) বলেছিলাম, স্যার, এগুলো বাদ দেন। এগুলো সংশোধন করা দরকার।
আবুল কাসেম খান বলেন, এভাবে আর কতকাল রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক ও কারখানায় টাকা দিয়ে যাবেন। তাদের বন্ধ করে দিন। তিনি বলেন, ব্যাংকে এখন তারল্য সংকট চলছে। সরকার ৪৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিলে বেসরকারি খাত ঋণ কোথায় পাবে?
আবুল কাসেম খানের বক্তব্যের সূত্র ধরে মাহবুবুর রহমান ঋণ খেলাপিদের ছবি ছাপিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন। নেপাল ও চীনের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে ঋণ খেলাপিদের বিদেশে যেতে দেওয়া হয় না। দ্রুত গতির ট্রেনে চড়তে দেওয়া হয় না। বাংলাদেশেও এমন কিছু ব্যবস্থা নেওয়া যায়।