আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৬-০৬-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

বাংলাদেশ মেধা লালনে কতটা প্রস্তুত?

শাওয়াল খান
| সম্পাদকীয়

কপিরাইট সুরক্ষিত কনটেন্ট ব্যবহার নিশ্চিত করাও মেধা লালনের একটি সর্বজনীন উপায়, যা আমাদের আগ্রহী মেধাবীদের সৃষ্টিশীল কাজে অনুপ্রেরণা জোগাবে, এ বিষয়ে আমরা আশাবাদী। আশা থেকেই নতুন নতুন সৃষ্টি। সৃষ্টিই মানুষকে এগিয়ে রাখে। আমরাও এগিয়ে যাব, সৃষ্ট মেধা লালনের মধ্য দিয়েÑ 

এটাই প্রত্যাশা

মেধা মানবজীবনের অমূল্য সম্পদ। মানুষ চিন্তা করতে পারে, চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগাতে পারে। এটা মানুষের একটা চমৎকার বৈশিষ্ট্য। মানুষের চিন্তাশক্তির মূলে মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে মেধাশক্তি। মেধার বহিঃপ্রকাশ এবং বিকাশের জন্য প্রয়োজন মেধার উপযুক্ত লালন। প্রয়োজনীয় যতœআত্তির অভাব হলে অঙ্কুরিত বীজ যেমন বেড়ে উড়তে পারে না বা অকালে হারিয়ে যায়, ঠিক তেমনই মেধাও অবিকশিত থেকে যায় অথবা বিলুপ্তি ঘটে। মেধাশক্তি কাজে লাগিয়ে মানুষ সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলছে। শুধু তা-ই নয়, উদ্ভাবনী শক্তির উৎকর্ষ সাধন করছে। মেধাশক্তি প্রয়োগ করে মানুষ প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন আবিষ্কার করে মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নিচ্ছে, শারীরিক শক্তির চেয়ে বহুগুণ শক্তিসম্পন্ন যন্ত্রদানবকে সাবলীলভাবে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করছে। প্রতিটি আবিষ্কার, সমাজের প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার প্রতিটি ধারণা মানুষের চিন্তাশক্তির ফসল। আর চিন্তাশক্তির সমন্বিত রূপই মেধাসম্পদ। মেধাসম্পদের সুরক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

আন্তর্জাতিকভাবে মেধাসম্পদ হিসেবে স্বীকৃত দুই ধরনের বিষয় বেশ গুরুত্বপূর্ণ। একটি হলো ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোপার্টি আর অপরটি কপিরাইট। ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোপার্টির মধ্যে রয়েছে আবিষ্কারের প্যাটেন্ট, ট্রেডমার্ক, ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিজাইন। আর কপিরাইটের বিষয়গুলো হলো সৃজনশীল সাহিত্যকর্ম। যেমন গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতা ও অন্যান্য সৃজনশীল গ্রন্থ। এছাড়া শৈল্পিক কর্মকা-সমৃদ্ধ চলচ্চিত্র, জলরঙ-তেলরঙ অথবা অন্য যে কোনো মাধ্যমে আঁকা চিত্রকর্ম, কাঠ-পাথরে খোদাই করা ভাস্কর্য, কিংবা মিশ্র মাধ্যমে তৈরি ভাস্কর্য এবং গানও কপিরাইটের আওতাভুক্ত। 

অন্য অনেক সম্পদের মতো মেধাসম্পদেরও মালিকানা আছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। অন্য সম্পদের মতো মেধাসম্পদও বিক্রি করা যায়, হস্তান্তর করা যায়, এমনকি দানও করা যায়। উল্লিখিত সৃজনশীল কাজগুলো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক মননে সৃষ্ট বিধায় একে বলা হয় মেধাসম্পদ বা ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি। বুদ্ধি মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি; কিন্তু সব মানুষের বুদ্ধি একই ধাঁচের বা একই মাপের নয়। আবার সবার আগ্রহও একই নয়। এখানেই মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক তারতম্য ঘটে। এ তারতম্যের মধ্য দিয়েই মেধাসম্পদের আত্মপ্রকাশ এবং বিকাশ। মানুষের মেধা যখন সম্পদে পরিণত হয়, তখন তা কাজে লাগিয়ে ব্যক্তি নিজে যেমন উপকৃত হয়, তেমনই বৃহত্তর ক্ষেত্রে দেশ এবং বিশ্বও উপকৃত হতে পারে, প্রতিনিয়ত তা হচ্ছেওÑ এমন দৃষ্টান্ত অনেক। দুনিয়াজুড়ে ঘটে যাওয়া অনেক ইতিবাচক পরিবর্তনের মূলে প্রধান উৎস মানুষের মেধা এবং মেধার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়োগ, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা তথা জীবনমান উন্নয়নে মেধার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়োগ এবং চর্চাই অগ্রগণ্য। শুধু তা-ই নয়, মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক এ বৈশিষ্ট্যকে লালন করতে হয় আরও বড় মাপের অর্জনের জন্য। মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক এ বৈশিষ্ট্যকে পরিচর্যা করার প্রাথমিক ক্ষেত্র প্রাথমিক শিক্ষাস্তর। প্রাথমিক শিক্ষাস্তরই খোলামেলা মেধাচর্চার প্রাথমিক ক্ষেত্র। অনুগত হয়ে নয়, মুক্ত মনে প্রশ্ন করতে শেখাই মেধার আত্মপ্রকাশের প্রাথমিক শর্ত। আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা শিশু-কিশোরদের মেধার আত্মপ্রকাশে কাক্সিক্ষত মাত্রায় সহায়ক নয়। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় মেধার মূল্যায়ন করা হয় পরীক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে। প্রত্যেক মানুষের মেধার ক্ষেত্র এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা যেমন স্বতন্ত্র, শিশু শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও তাই। পরীক্ষা ব্যবস্থাই মেধা মূল্যায়নের একমাত্র পথ নয়। কারণ মানুষের মেধার আত্মপ্রকাশ এবং বিকাশ ঘটে জীবনের পরতে পরতে বিভিন্ন মাধ্যমে। আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন ক্ষেত্র অনুপস্থিত। ফলে আমাদের শিশু-কিশোরদের মেধার আত্মপ্রকাশ এবং বিকাশের সুযোগ সংকুচিত বিধায় ক্ষেত্র বিশেষে সৃজনশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, একটা পরীক্ষার মাধ্যমে একজন মানুষের মেধা মূল্যায়ন করা সুবিদিত নয়। কারণ মানুষের মেধা বহুধা বিভক্ত। সুতরাং মেধার মূল্যায়ন করতে হলে আমাদের বুঝতে হবে কোন শিক্ষার্থী কোন বিষয়ে দক্ষ। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এখনও এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি যে, কীভাবে মেধাকে মূল্যায়ন করতে হবে। মেধাকে সম্পদে পরিণত করার যে উদ্যোগ আজ বিশ্বব্যাপী আলোচিত, সে বিষয়টি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারছে না। প্রচলিত অর্থে প্রাথমিক শিক্ষা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রাথমিক পরিচয় পর্ব হলেও প্রাথমিক শিক্ষাই মানুষের জীবনে শিক্ষার ভিত গড়ে দেয়। অতঃপর মাধ্যমিক শিক্ষার সময়ই হলো জীবনে শিক্ষার মূল গতিপথ খুঁজে নেওয়ার সময়। অথচ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাই জীবনের লক্ষ্য খুঁজে নেওয়ার উপযুক্ত সময় হতে পারত। কারণ উচ্চমাধ্যমিক স্তর অতিক্রম কালে শিক্ষার্থীদের চিন্তা-চেতনায় অনেক পরিবর্তন ঘটে, তা তাদের শিক্ষাজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। জীবনের লক্ষ্য খুঁজে নেওয়ার উপযুক্ত সময় মাধ্যমিক স্তর নয়। মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত হওয়া উচিত জীবনের লক্ষ্য গড়ার প্রস্তুতি পর্ব। এই স্তরে বিভিন্ন ধরনের সহ-শিক্ষা কার্যক্রমে (বিতর্ক চর্চা, নিয়মিত খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা, ছবি আঁকা, দেয়াল পত্রিকা, সংগীত চর্চা, আবিষ্কারের খেলা-বিজ্ঞান মেলা ইত্যাদি) শিশু-কিশোরদের সম্পৃক্ত করা, তা হলে প্রস্তুতিটা ভালোই হতো। শিশুদের সামাজিক দক্ষতা, যোগাযোগ দক্ষতা সৃষ্টি হতো। শিক্ষার্থীরা নিজেই নিজের মেধার মূল্যায়ন করতে শিখত, ঝোঁকের বশে শুধু শুধু উচ্চশিক্ষায় নাম না লিখিয়ে জীবনঘনিষ্ঠ নিজের কারিগরি দক্ষতা বা সৃজনশীলতাকে (যিনি যে বিষয়ে আগ্রহী এবং পারদর্শী) গুরুত্ব দিতে শিখত। বাস্তবে এভাবেই মেধাশক্তিকে মেধাসম্পদে পরিণত করা যুক্তিসংগত। মেধাসম্পদ দুনিয়াকে বদলে দিতে পারে, দুনিয়াজুড়ে বিপ্লব ঘটাতে পারে, তার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত মহাপ্রতিভাধর স্টিভ জবস, মার্ক জুকারবার্গদের সৃজনশীলতা। আমরা সেই মাপের প্রতিভাধর সৃষ্টি করতে না পারলেও আইমান সাদিকের টেন মিনিটস স্কুল বা বিভিন্ন অ্যাপভিত্তিক সামাজিক সেবা সংস্থা উদ্ভাবনকারীদের গুরুত্ব আমাদের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ। এসব উদ্ভাবনের জন্য উচ্চশিক্ষা অপরিহার্য নয়। আমাদের যুবসম্প্রদায়ের মাঝে এমন অনেক মেধাবী মানুষ আছেন, যারা উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম পেলে বিশ্ব দরবারে নিজেদের এবং বাংলাদেশকে তুলে ধরার সামর্থ্য রাখে। সেজন্য আমাদের প্রয়োজন মেধা লালন। সেই সঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সচেতনতায়।

মেধা পাচারের ঘটনাও কিন্তু আমাদের দেশে কম ঘটে না। এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। প্রতি বছর অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা লাভের উদ্দশ্যে বিদেশ গমন করে অথচ উচ্চশিক্ষা শেষে একটা বিরাট অংশ ফিরে আসে না। আমাদের দেশে তাদের জন্য কর্মক্ষেত্র নেইÑ বিষয়টা তেমন নয়। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আমাদের বিদেশ থেকে কর্মী আনতে হচ্ছে। বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করা আমাদের শিক্ষার্থীরা দেশে ফিরে এসে দেশের কাজে আত্মনিয়োগ করলে এই ক্ষেত্রে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা দিত।

আমাদের মেধাসম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বটা কিন্তু আমাদের। এ দায়িত্বের কিছু কিছু আমরা এরই মধ্যে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছি। যার একটি উদাহরণ জামদানি শাড়ি। জামদানি শাড়ির প্যাটেন্ট কিন্তু এখন আমাদের। ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর ইউনেস্কো বাংলাদেশের জামদানি বয়ন শিল্পকে ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি হিসেবে ঘোষণা করেছে। ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই সুরক্ষা আইন জামদানিকে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পণ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে। কারণ জামদানি বাংলার বয়ন শিল্পীদের অনন্য সৃষ্টি, বাংলার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, জামদানির নকশা সূচিকার্যে ফুটিয়ে তোলা হয় না; ছাপাও হয় না। জামদানির নকশা সরাসরি তাঁতে বোনা। স্বচ্ছ জমিনে অস্বচ্ছতার মোহনীয়তায় প্রতিটি নকশাই স্বতন্ত্র, অনন্য আর সূক্ষ্ম। নকশাগুলো জ্যামিতিক প্যাটার্নে তৈরি এবং আভিজাত্যে ভরপুর। জামদানি বুনন এক বিস্ময়কর বয়ন কৌশল, যা শ্রুতি ও স্মৃতিনির্ভর। ইলিশ শুধু আমাদের জাতীয় মাছই নয়, ইলিশ এখন বাংলাদেশের ঐতিহ্য, বিশ্ববাজারে আমাদের পরিচিতি, জিআই পণ্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের ইলিশ ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এরপর ২০১৮ সালে এসে ইলিশের জীবনরহস্য উদ্ঘাটন নিয়ে বাংলাদেশের সাফল্যে আরেকটি পালক যুক্ত হলো। বাংলাদেশি গবেষক দল উদ্ভাবিত পদ্মার ইলিশের জিন বিন্যাস বা জিনোম সিকোয়েন্স নিয়ে বিশ্বজুড়ে পরিচিত সাময়িকী বায়োমেড সেন্ট্রাল বা বিএমসি গত বছর একটি গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। লন্ডনভিত্তিক এ সাময়িকী বৈজ্ঞানিক গবেষণা সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করে। ইলিশের জিনতত্ত্বের ওপর কাজ করা বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাংলাদেশের গবেষণাটি বিএমসিতে সবার আগে প্রকাশিত হওয়ার বিষয়টি নিঃসন্দেহে অনন্য গৌরবের। এছাড়াও আছে আম, পাট ইত্যাদি। এ তো গেল দৃশ্যমান বস্তুর লাবণ্য। আরও আছে এমন সব মেধা বিনির্মিত বিষয়, যা ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না এবং জায়গাও দখল করে না, অথচ বিশ্ব এখন এমন মেধাসম্পদ নির্ভর হয়ে পড়ছে। আরও স্পষ্ট করে বললে বলা যায়, চলমান দৃশ্য বা ধ্বনির লাবণ্য। যাকে আমরা বলছি তথ্যপ্রযুক্তি বলয়, যা ডিজিটাল মাধ্যম হিসেবে বহুল পরিচিত। তথ্যপ্রযুক্তি বলয়ে মেধাস্বত্ব বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কলকারখানা, যন্ত্রপাতি কিংবা যেসব আবিষ্কার দৃশ্যমান লাবণ্য বিলায়, জায়গা দখল করে, দ্রব্যের আকারে রূপ লাভ করে আমাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করে, সমাজকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হয়, তার জন্য যেমন প্যাটেন্ট, ট্রেডমার্ক কিংবা কপিরাইটের মাধ্যমে আবিষ্কারকদের মেধাস্বত্বের স্বীকৃতির মাধ্যমে তাদের শ্রম ও উদ্ভাবনী শক্তির মূল্যায়নে আমাদের কিছু উদ্যোগ পরিলক্ষিত হলেও ডিজিটাল মাধ্যমে এখনও তেমনটা দৃশ্যমান নয়। তাই কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডিজিটাল মাধ্যমকে কপিরাইট আইনে আনার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহল থেকে। তারই একটি পদক্ষেপ দেখতে পাই এ বছর আন্তর্জাতিক কপিরাইট দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ‘সমকালীন বিশ্বে কপিরাইট আইন : সম্প্রচার ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিকাশ’ শীর্ষক এক সেমিনারে। বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের উদ্যোগে সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর জাতীয় গ্রন্থাগার ভবন মিলনায়তনে। সেমিনারে ইউটিউব, ফেইসবুকসহ কনটেন্ট আপলোড করার ডিজিটাল মাধ্যমগুলোকে কপিরাইট আইনের কাঠামোয় আনার তাগিদ দেওয়া হয়।

লাইসেন্স কালেক্টিং সোসাইটি ফর সিনেমাটোগ্রাফির (সিএমও) প্রেসিডেন্ট ওলোরা আফরিন সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও সম্প্রচারের ক্ষেত্রে সমকালীন বিশ্বের বিদ্যমান চিত্র তুলে ধরে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পার্লামেন্টের অনুমোদিত সম্প্রচারসংক্রান্ত নির্দেশমালার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, এর মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিল্প, সংগীতসংশ্লিষ্ট সবাই ও প্রকাশকরা সম্মানী পাবেন। ইউটিউবের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো যে কোনো কনটেন্ট আপলোডের ক্ষেত্রে দায়বদ্ধ থাকবে। এছাড়া কপিরাইট স্বত্বাধিকারীদের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো কপিরাইটেড কনটেন্ট যত দ্রুত সম্ভব নিজেদের সাইট থেকে সরিয়ে নেবে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে একটি আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা হলে সংগীতের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী এবং প্রযোজকদের অধিকার নিশ্চিত করা যাবে। বিশ্বব্যাপী মেধাসম্পদের যথাযথ মূল্যায়নের লক্ষ্যে ১৯৭০ সালে ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি অর্গানাইজেশন (ডব্লিউআইপিও) গঠন করা হয়। ডব্লিউআইপিওর কাজ হচ্ছে, প্যাটেন্ট, ট্রেডমার্ক কিংবা কপিরাইট আমাদের জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করে, তা অবহিত করা। সেই লক্ষ্যে ১৯৯৯ সালে ডব্লিউআইপিওর সাধারণ পরিষদে প্রতি বছর ২৩ এপ্রিল বিশ্ব মেধাসম্পদ দিবস পালনের ঘোষণা দেয়। সেই সঙ্গে প্রতি বছর দিবসটির জন্য একটি প্রতিপাদ্যও নির্ধারণ করা হয়। 

আমাদের দেশে মেধাসম্পদ বিষয়টা খুব বেশি পরিচিত নয়। তাই মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় আমাদের আরও সচেতনতা প্রয়োজন। কপিরাইট দ্বারা মেধাসম্পদের ওপর মেধা প্রয়োগকারীর নৈতিক ও আর্থিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের অনেক প্রতিভাবান মানুষ মেধাস্বত্ব সম্পর্কে সঠিকভাবে ওয়াকিবহাল নয় বিধায় মেধাস্বত্বের সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে না। তাদের মেধাস্বত্বের যথাযথ মূল্যায়ন সম্ভব ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি রাইটসের একটি অংশ কপিরাইট আইনের মাধ্যমে। এ আইন সঠিকভাবে প্রয়োগের মাধ্যমেই আইনের আওতাভুক্ত সবারই অধিকার সম্পূর্ণভাবে রক্ষা করা সম্ভব। ফলে মেধাসম্পদ বিভিন্ন পন্থায় পুনরুৎপাদন, বিক্রি, বাজারজাতকরণ, লাইসেন্স প্রদান এবং জনসমক্ষে প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে ওই সৃজনশীল ব্যক্তি বা শিল্পী একচ্ছত্র অধিকার লাভ করবেন। মেধাসম্পদের আইনগত স্বীকৃতি প্রদান, উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা নিশ্চিতকরণ এবং এ আধুনিক যুগে পাইরেসি, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কপিরাইট সংরক্ষণ, রয়্যালটি আদায় এবং ব্রডকাস্টিং অর্গানাইজেশন থেকে ট্রান্সমিশন এবং রিট্রান্সমিশন সঠিকভাবে নিশ্চিতকরণে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। 

সৃজনশীল শিল্পসত্তার আজীবন মূল্যায়ন, রয়্যালটি সংগ্রহ ইত্যাদি কাজ কপিরাইটের আওতাভুক্ত। বাংলাদেশ যথাযথভাবে কপিরাইটের সদ্ব্যবহার করতে পারলে তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন তথা রাজস্ব আহরণের বিষয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে নিঃসন্দেহে। রয়্যালিটি আদায়ের ক্ষেত্রে লাইসেন্সপ্রাপ্ত কালেকটিভ ম্যানেজমেন্ট অর্গানাইজেশনের (সিএমও) আইন বিশেষজ্ঞই প্রধান ভূমিকা পালন করে, যা সারা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একইভাবে পরিচালিত হয়। সিএমওর প্রধান কাজ হচ্ছে কপিরাইট হোল্ডারদের লাইসেন্সিংয়ের মাধ্যমে রয়্যালটি আদায় করা এবং তাদের মধ্যে রয়্যালটি বিতরণ করা। প্রতিটি কপিরাইট কর্মক্ষেত্রে একটি করে সিএমও কাজ করে থাকে, যার মনিটরিং করে থাকে বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। 

কপিরাইট সুরক্ষিত কনটেন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে, অন্যথায় মেধা বিকাশ বা মেধাস্বত্বের সুফল পাওয়া যাবে না। কপিরাইট সুরক্ষিত কনটেন্ট ব্যবহার নিশ্চিত করাও মেধা লালনের একটি সর্বজনীন উপায়, যা আমাদের আগ্রহী মেধাবীদের সৃষ্টিশীল কাজে অনুপ্রেরণা জোগাবে, এ বিষয়ে আমরা আশাবাদী। আশা থেকেই নতুন নতুন সৃষ্টি। সৃষ্টিই মানুষকে এগিয়ে রাখে। আমরাও এগিয়ে যাব, সৃষ্ট মেধা লালনের মধ্য দিয়েÑ এটাই প্রত্যাশা। হ

 

 শাওয়াল খান

লেখক ও শিক্ষাকর্মী