আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৬-০৬-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

রাষ্ট্রায়ত্ত ৩০ সংস্থার ফাঁদে ব্যাংক

বকেয়া ঋণ ৪০ হাজার কোটি টাকা, ঋণ গ্রহণের শীর্ষে বিপিডিবি

মৌসুমী ইসলাম
| শেষ পাতা

ঋণ নিয়ে পরিশোধ করছে না দেশের অধিকাংশ রাষ্ট্রীয় সংস্থা। দিন দিন বাড়ছে এসব প্রতিষ্ঠানের দেনার পরিমাণ। চলতি বছরের জানুয়ারি শেষে এমন ৩০টি রাষ্ট্রীয় সংস্থার কাছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণ ১১১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। যা মোট বিতরণকৃত ঋণের দশমিক ২৮ শতাংশ।

কর্মসংস্থান এবং উৎপাদন টিকিয়ে রাখতেই এসব লোকসানি প্রতিষ্ঠানকে প্রতিবছর শত শত কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে টিকিয়ে রাখছে সরকার। চলতি অর্থবছরে এসব প্রতিষ্ঠানে সরকারি অনুদান বা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা। আর ৩০ সংস্থার কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের পাওনা বকেয়া ঋণের পরিমাণ হলো ৩৯ হাজার ৮৩৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষায় উঠে এসেছে এমন হিসাব। বিশ্লেষকরা বলছেন, লোকসানের দায় থেকে বের না হলে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতাও কমে যাবে।

বকেয়া ঋণের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। সংস্থাটির ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ৪২০ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এরপরে দ্বিতীয় অবস্থানে এসেছে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের (বিএসএফআইসি) নাম। এ সংস্থার বকেয়া ঋণ ৬ হাজার ৫২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। তৃতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ রসায়ন শিল্প করপোরেশনের (বিসিআইসি) কাছে বকেয়া ঋণ ৫ হাজার ১২৯ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এরপর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বকেয়া ঋণ ৪ হাজার ৪৫৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) বকেয়া ঋণ ৩ হাজার ৫৭৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের (বিএসইসি) বকেয়া ২ হাজার ৮২৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা। বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (বিওজিএমসি) ঋণ ২ হাজার ৯৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) ঋণ ১ হাজার ১৫০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।

এছাড়াও বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) বকেয়া ঋণ ৮৮৪ কোটি ২৮ লাখ টাকা। বিডব্লিউডিবির বকেয়া ৫৭২ কোটি ৯৪ লাখ টাকা, বিবিসির ৪৮৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) ঋণ ৪৬৮ কোটি ৮ লাখ টাকা, সিপিএর ঋণ ৩৪১ কোটি ৪১ লাখ টাকা, ঢাকা ওয়াসার বকেয়া ঋণ ২৪৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, বিটিবির ঋণ ৫৯ কোটি ৬ লাখ টাকা, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বকেয়া ৪২ কোটি ১৫ লাখ টাকা, বিটিএমসির বকেয়া ঋণ ২১ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) ঋণ ৩১ লাখ টাকা। অর্থনৈতিক সমীক্ষায় সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের তালিকায়

উঠে এসেছে বিজেএমসির নাম। এই সংস্থাটির খেলাপির পরিমাণ ৩৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। এছাড়া বিটিএমসির ২১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, বিএডিসি ২১ কোটি ২৭ লাখ, টিসিবির ১০ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ও বিটিবির খেলাপি ঋণ ১০ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এছাড়া বিএসএফআইসির খেলাপি ৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, বিসিআইসির ৯২ লাখ ও বিআরটিসির খেলাপি ঋণ ৯৭ লাখ টাকা। অন্যদিকে  ঋণগ্রস্ত কিছু প্রতিষ্ঠানের পেছনে বছরের পর বছর মোটা অঙ্কের ভর্তুকি গুনছে সরকার।

রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বাড়তি বরাদ্দ দেওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করতে পারছে না। উপরন্তু প্রতি বছরই তাদের লোকসানের পাল্লাও ভারি হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে ভর্তুকিও বাড়ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৬টি রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে সরকার ১ হাজার ২৬২ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছিল। আর চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা। সংস্থাগুলোর মধ্যে বিআইডব্লিউটিসি ৪৮৫ কোটি টাকা, বিএডিসি ৪১৮ কোটি, বিএসসিআইসিকে ২০৮ কোটি, বিজেএমসি ৬৩ কোটি, বিটাক ৫৭ কোটি, রাজশাহী ওয়াসা ২৪ কোটি, এনএইচএ ২০ কোটি, বেজা ১৫ কোটি, খুলনা ওয়াসা ১৪ কোটি, সিবিডিএ ১২ কোটি টাকা ভর্তুকি পেয়েছে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান মনে করেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। ভর্তুকি এবং ঋণ দিয়ে বেশি দিন টিকিয়ে রাখা যাবে না। আর এভাবে টেকাতে গেলে সরকারের দায় বাড়বে। কারণ, এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণ দিতে গিয়ে চাপে পড়ছে ব্যাংক। আর ব্যাংকগুলোকে বাঁচাতে জনগণের করের অর্থে দেওয়া হচ্ছে বরাদ্দ। জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়েও তাগিদ দেন তিনি।