আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৬-০৬-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

ঢাকা বিভাগের বিশেষ সাংগঠনিক সভা

সহযোগী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ জেলা আ.লীগের

নিজস্ব প্রতিবেদক
| প্রথম পাতা

ঢাকা বিভাগ আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভায় জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের নেতারা সহযোগী সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ করেছেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনে তারা অভিযোগ করেন, কমিটি গঠনে সমন্বয় না করা, স্বাধীনতাবিরোধী পরিবারের সদস্যদের দলে স্থান দেওয়া, দলীয় কর্মসূচি পালনে সহযোগিতা করেন না সহযোগী সংগঠনের নেতারা। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাও চেয়েছেন তারা। ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে শনিবার দুপুরে দলের ঢাকা বিভাগের বিশেষ সাংগঠনিক সভায় জেলা-মহানগর নেতারা এসব অভিযোগ তোলেন। 

আওয়ামী লীগের ঢাকা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এ সময় তিনি সভায় উত্থাপিত জেলা-মহানগর নেতাদের বিভিন্ন প্রস্তাব

আওয়ামী লীগের আগামী কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে তোলা হবে বলে আশস্ত করেন।

সভায় গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি চৌধুরী এমদাদুল হক বলেন, সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে ছাত্রলীগ ও যুবলীগসহ আর একটি সংগঠনের কমিটি সম্মেলন করে করা হয়েছে। বাকিদের কমিটি কেন্দ্র থেকে ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। এ সংগঠনগুলো নিয়ে আমাদের বিভ্রান্তির মধ্যে পড়তে হয়। এ কমিটির কাজ নিয়ন্ত্রণ করে কেন্দ্র। আরেকটি সবচেয়ে খারাপ বিষয় হচ্ছে আওয়ামী লীগে ঢোকার যোগ্যতা নেই, নিয়মে নেই, বিভিন্ন সময় তাদের দিয়ে কেন্দ্র থেকে এ কমিটিগুলো করে দেওয়া হয়। তারা কাজ করে তাদের নিজেদের মতো। তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ থেকে নির্দেশনা দিতে হবে। কোনো কমিটি করতে গেলে জেলা কমিটির সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে।

টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলুর রহমান ফারুক বলেন, ঘাটাইল ও ভূঞাপুরে কমিটি আমরা করতে পারিনি। এ সংকট থেকে আমাদের মুক্তি দিতে হবে। আমরা আপনাদের নিয়েই এ সমস্যা সমাধান করতে চাই। তিনি বলেন, আমাদের আরও কিছু সমস্যা আছে, যা এখানে বলতে পারছি না। তবে আমার মনে হয় আপনারা সবাই বিজ্ঞ মানুষ, আপনারা তার সবই জানেন। কারণ আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। দল ঠিক থাকলেই এমপি-মন্ত্রী ঠিক থাকবে। তাই সে বিষয়গুলোও সমাধান করতেই হবে।

রাজবাড়ী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জিল্লুর হাকিম বলেন, যারা সংগঠনবিরোধী কাজ করেন তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় আমরা ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে কেন্দ্রে পাঠাই। কিন্তু এগুলোর ব্যাপারে কেন্দ্র থেকে আমরা কোনো সিদ্ধান্ত পাইনি। 

রাজবাড়ী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী কেরামত আলী বলেন, সহযোগী সংগঠন নিয়ে আমরা খুবই সমস্যার মধ্যে রয়েছি। আমাদের এখানে যুবলীগ ১৪ বছর আহ্বায়ক কমিটি রয়েছে। যুবলীগের সাংগঠনিক অবস্থা আমরা বলতে পারি মুখ থুবড়ে পড়েছে। আবার ডিও লেটারের মাধ্যমে কমিটি দেওয়া হয়। ডিও লেটারের মাধ্যমে ছাত্রলীগের কমিটি হলে খুবই খারাপ হয়। এ সময় এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

শরীয়তপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অনল কুমার দে বলেন, এখানে সহযোগী সংগঠনগুলোর অবস্থা ভালো নয়। দীর্ঘদিন ধরে আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে চলছে কয়েকটি। আমাদের এভাবে মাঝেমধ্যে ডাকলে সুবিধা-অসুবিধার কথা বলতে পারব।

নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাই বলেন, আমাদের ৬ থানার ১২ জনের মধ্যে ৬ জনই ভারপ্রাপ্ত। এগুলো আমরা ভারমুক্ত করতে চাই। তিনি আরও বলেন, তূণমূলের প্রশাসন এমপি-মন্ত্রীদের বেশি গুরুত্ব দেয়। আওয়ামী লীগের নেতাদের সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায় কি না বা নির্দেশনা দেওয়া যায় কি না সে বিষয়ে ভেবে দেখতে কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, আমাদের এখানে যুব মহিলা লীগ ও কৃষক লীগ নিয়ে জটিলতা রয়েছে। যারা কোনো দিনও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয়। রবং আওয়ামী লীগ ও স্বাধীনতাবিরোধী তাদের পরিবারের সদস্যদের (সহযোগী সংগঠনে) স্থান দেওয়া হয়। আমরা এ বিষয়ে কেন্দ্রকে অবহিতও করেছি। কিন্তু এখনও কোনো উত্তর পাইনি। মহানগরের সহযোগী সংগঠনের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পান না দাবি করে তিনি আরও বলেন, আমার ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগঠনে আরও বেশি গতি সঞ্চার করতে চাই। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের সহযোগিতা দরকার।

সভায় আরও বক্তব্য দেন মুন্সীগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. মহিউদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক শেখ লুৎফর রহমান, ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বেনজির আহমেদ, নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নজরুল ইসলাম বীরপ্রতীক, মানিকগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম মহিউদ্দিন, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি একেএম রহমত উল্লাহ, সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান, দক্ষিণের সভাপতি আবুল হাসানাত, সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ, গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আ ক ম মোজাম্মেল হক, গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম সরকার, কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এমএ আফজল। এ সময় নেতারা নিজ নিজ জেলা-মহানগর কমিটির সাংগঠনিক রিপোর্ট সংক্ষেপে উপস্থাপন করেন।

বিশেষ এ সাংগঠনিক সভায় জেলা ও মহানগর নেতাদের বক্তব্যের মাঝখানে বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, দলের মধ্যকার অন্তর্কলহ দূর করতে হবে। আওয়ামী লীগ যেন আওয়ামী লীগের শত্রু না হয়। কলহ-বিদ্রোহ না হয়। জেলা পর্যায়ে সিনিয়র নেতারা আছেন আপনারা বসে দলের মধ্যকার এ কলহগুলোর সমাধান করতে হবে। শেখ হাসিনার নেতৃত্ব নিয়ে কারও কোনো প্রশ্ন নেই। তিনি বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে আওয়ামী লীগ এখন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ‘এ ন্যাচারাল পার্টি অব গভর্মেন্ট’। এ সময় ২৩ জুন দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও বঙ্গবন্ধুর জš§শতবার্ষিকীর কর্মসূচি যথাযথভাবে পালন করতে নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। 

ঢাকা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক ও শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের সঞ্চালনায় সভায় দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন দপ্তর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস, কৃষিবিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী, বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক শামসুন্নাহার চাঁপা, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মারুফা আক্তার পপি, আনোয়ার হোসেন প্রমুখ।

সভায় ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত দলে নেতাকর্মীদের ডাটা দুই সপ্তাহের মধ্যে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কাছে পাঠাতে জেলা নেতাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়। এর আগে দলের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিশেষ সম্মাননা জানাতে প্রতি জেলা থেকে দুইজন করে প্রবীণ ও ত্যাগী নেতার নাম চেয়েছিল আওয়ামী লীগ। বিশেষ সভায় জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক রিপোর্টের সঙ্গে দুইজন করে নেতার নামও জমা দেওয়া হয়।