আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১২-০৭-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

হিজড়া, বেদে ও যৌনকর্মীদের প্রবীণ জীবন

হাসান আলী
| প্রবীণ কথা

ঢাকা শহরে প্রথমে দুজন হিজড়া যথাক্রমে পুষ্প হিজড়া ও দুদু হিজড়া দলবদ্ধভাবে চ্যালাচামু-া নিয়ে আস্তানা গড়ে তোলে। এ দুজনই ঢাকা শহরের দুটি অংশে 
টাকা-পয়সা তোলার কাজ করত। পুষ্প হিজড়া ও দুদু হিজড়ার আলাদা দুটি দল পরে অনেকগুলো দলে রূপান্তর হয়েছে। হিজড়ারা টাকা-পয়সা তোলা ছাড়াও নবজাতককে নাচিয়ে, বিয়ের অনুষ্ঠানে নেচেগেয়ে টাকা রোজগার করে। সারাদিনের অর্জিত টাকা-পয়সা ‘গুরুমা’কে বুঝিয়ে দিতে হয়

ভারতীয় উপমহাদেশে হিজড়া শব্দটি ব্যবহার করলেই একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। হিজড়া শব্দটি কীভাবে আমরা গ্রহণ করলাম সে বিষয়ে আমার পরিষ্কার কোনো ধারণা নেই। হিজড়ারা দলবেঁধে দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, যানবাহন, হাটবাজারে টাকা তোলে। যারা চাহিদা অনুযায়ী টাকা দিতে অস্বীকার করে তাদর হেনস্তার শিকার হতে হয়। মোটামুটি সবাই টাকা-পয়সা দিয় ঝামেলা এড়াতে চায়। হিজড়ারা মূলত শহরকেন্দ্রিক জীবনযাপন করে। এরা গ্রামেও যায়। তবে গ্রামে আয়-রোজগার কম বলে সচরাচর যায় না। গ্রামের মানুষের সঙ্গে শক্তি প্রদর্শন কিংবা অসদাচরণ করে সাধারণ মানুষকে বিগড়ে দেওয়ার ঝুঁকি নিতে চায় না। শহরে তারা কম সময়ে আয়-রোজগার ভালো করতে পারে, সে জন্যই শহর বেশি পছন্দ। ঢাকা শহরে প্রথমে দুজন হিজড়া যথাক্রমে পুষ্প হিজড়া ও দুদু হিজড়া দলবদ্ধভাবে চ্যালাচামু-া নিয়ে আস্তানা গড়ে তোলে। এ দুজনই ঢাকা শহরের দুটি অংশে টাকা-পয়সা তোলার কাজ করত। পুষ্প হিজড়া ও দুদু হিজড়ার আলাদা দুটি দল পরে অনেকগুলো দলে রূপান্তর হয়েছে। হিজড়ারা টাকা-পয়সা তোলা ছাড়াও নবজাতককে নাচিয়ে, বিয়ের অনুষ্ঠানে নেচেগেয়ে টাকা রোজগার করে। সারাদিনের অর্জিত টাকা-পয়সা ‘গুরুমা’কে বুঝিয়ে দিতে হয়। হিজড়াদের দলনেতাকে ‘গুরুমা’ হিসেবে সম্বোধন করতে হয়। গুরুমায়ের সঙ্গীকে মামা বলে ডাকতে হয়। দলের সদস্যদের চ্যালা বলা হয়। চ্যালারা মূলত গুরুমায়ের সন্তানের মতো। চ্যালারা গুরুমায়ের আদেশ-নির্দেশ মেনে চলতে বাধ্য। চ্যালাদের সংগৃহীত অর্থ গুরুমায়ের কাছে জমা থাকে। তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী খরচ করেন কিংবা জমা রাখেন। তার আদেশ সবাই মেনে চলে। কালেভদ্রে কেউ দলত্যাগ করলে বিচার-সালিশ বসে এবং শাস্তি দেওয়া হয়। ফলে দলত্যাগ করা অনেক কঠিন বিষয়। হিজড়াদের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত জ্ঞান তুলনামূলকভাবে কম থাকায় তারা প্রতিনিয়তই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকে। দীর্ঘায়ু হওয়ার সম্ভাবনা কম। রোগশোকে ভুগে অপেক্ষাকৃত কম বয়সেই মৃত্যুবরণ করে। প্রবীণ হিজড়াদের জীবন কমবেশি পীড়াদায়ক। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক ক্ষমতা কমতে থাকে, ফলে নিয়মিত দলের সদস্যদের সঙ্গে কালেকশনে যেতে পারে না। চ্যালারা অসুস্থ শরীরে গুরুমাকে বাইরে যেতে বারণ করে। আস্তে আস্তে ঘরমুখী হয়ে পড়ে। চ্যালারা বেশিরভাগ সময়ই গুরুমাকে সেবাযতœ করে থাকে। গুরুমা যত অচল হতে থাকেন ততই দলের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে থাকে। দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব চরমে উঠতে তাকে চ্যালাদের মধ্যে। গুরুমা চ্যালাদের আক্রমণের সম্মুখীন হয়েছেন বলে শুনেছি। চ্যালারা সারাদিন বাইরে থাকায় গুরুমাকে একাকি নিঃসঙ্গ জীবন কাটাতে হয়। চ্যালারা থাকলেও আগের মতো গুরুত্ব দিয়ে কথা বলে না। বরং গুরুমার কাছে সঞ্চিত অর্থ নিয়ে মনোমালিন্য চরমে ওঠে। কখনও কখনও গুরুমা তার বিশেষ চ্যালাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন এবং বিশেষ ছাড় দেনÑ এসব নিয়ে দ্বন্দ্ব চরমে উঠে। একরকম ঝগড়া-বিবাদ, অবহেলা, অপমান এবং বিনা চিকিৎসায় প্রবীণ হিজড়া মৃত্যুবরণ করেন। গুরুমার মৃত্যুর পর সাদা কাপড় পরে শোক প্রকাশ করে। গুরুমার পরিত্যক্ত সহায়-সম্পদ চ্যালাদের মধ্যে ভাগ হয়। গুরুমা তার গচ্ছিত সহায়-সম্পদ আপন ভাই-বোন বা নিকটতম কাউকে নমিনি কিংবা দান করে যান। চ্যালারা আবার নতুন দল গড়ে তোলে।
বেদেরা কবে থেকে নৌকায় সংসার পেতেছে তা ধারণা করা হয়, সঠিক করে দিনক্ষণ নির্ধারণ করা যায় না। আনুমান প্রায় চারশত বছর ধরে বেদে জীবন সাধারণের সামনে এসেছে। দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বর্ষার পানি বেদে জীবনকে পানিতে বসবাস করার সুযোগ করে দেয়। নদীমাতৃক বাংলাদেশে বেদেরা নৌকায় দল বেঁধে ভেসে চলে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে। বেদে নারীরা সকালে হরেক রকম জিনিসপত্র মাথায় নিয়ে বাড়ি বাড়ি বিক্রির জন্য ঘুরে বেড়াত। আরেক দল বেদে সাপ খেলা, তাবিজ বিক্রি, শিংগা লাগানো, শিকড়-বাকড় বিক্রি করে আয়-উপার্জন করত। বেদে পুরুষরা রান্নাবান্না, মাছ ধরা, পাখি শিকার, সন্তান লালন-পালনের কাজ করত, বেদেদের বিয়ের অনুষ্ঠানে কনে বরকে কথা দেয় বরকে রোজগার করে খাওয়াবে। গাছে উঠে বসে থাকা বর কনের কথার ওপর ভর করে গাছ থেকে নেমে আসে। যোগাযোগ ব্যবস্থার দ্রুত উন্নতি এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারের ফলে বেদেদের আয়-রোজগারে ভাটার টান পড়েছে। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বেদে পেশায় আসতে অনাগ্রহী। বেদেরাও ছেলেমেয়েদের মানুষ করার আকাঙ্খা নিয়ে নৌকা থেকে নেমে ডাঙায় উঠেছে। সরকার বেদেদের পুনর্বাসন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ফলে দিন দিন বেদেরা সমাজের মূল স্রোতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে শুরু করেছে। বেদেরা স্বাস্থ্যসচেতন নয় বলে তাদের রোগবালাই বেশি, তুলনামূলক গড় আয়ু কম। আয়-রোজগার কম থাকায় প্রবীণদের জীবনযাপন অনেক সময়ই কষ্টের। আমাদের সাধারণ প্রবীণ জীবনের মতোই বেদে প্রবীণ জীবন। বলা হয়ে থাকে, পৃথিবীর আদিমতম পেশা হলো পতিতাবৃত্তি। নিষ্ঠুর-নির্মম অসম্মানজনক এই পেশা আজও পৃথিবীতে টিকে রয়েছে। নারীকে নানারকম ছলচাতুরী করে কিংবা ফাঁদে ফেলে পতিতাবৃত্তিতে নিয়ে আসা হয়। 
একবার পতিতালয়ে এলে এখান থেকে ফিরে যাওয়া খুবই দুরূহ। কেউ লাশ হয়ে কেউ আদালতের আদেশে বাইরে আসার সুযোগ পায়। বেশিরভাগই এই অন্ধকার গলিতে জীবন কাটিয়েছেন। তরুণী নারীদের শারীরিক আবেদন কমতে থাকলে নিয়মিত খদ্দের পেতে অসুবিধা হয়। আয়-রোজগার কম হলে ঘর ভাড়া, চাঁদা, মাসির টাকা, দোকান খরচ বহন করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। যৌবন হারিয়ে মাত্র কয়েকজন মাসি হতে পারেন। এই মাসিরাই পতিতালয়ের নিয়ন্ত্রণকারী। মাসিদের প্রয়োজন মেটাতে দালালরা গ্রামের তরুণী মেয়েদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে, চাকরি দেওয়ার লোভ দেখিয়ে পতিতালয়ে বিক্রি করে দেয়। মাসিরা সাধারণত দাপুটে হয়। প্রবীণ পতিতাদের কেউ কেউ তরুণী পতিতাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম, রান্নাবান্না, ধোয়ামোছার কাজ করেন। যাদের কাজ করার সামর্থ্য থাকে না তারা ভিক্ষা করে জীবন ধারণ করেন। পরিবারবিহীন এই প্রবীণ পতিতাদের জীবন বেদনায় ভারাক্রান্ত। তাদের দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা-বেদনার কথা সুস্থ মানুষ শুনলে অসুস্থ হয়ে পড়বে। একদিন পতিত পুরুষকে শারীরিক সুখ দিতে অসম্মানজনক পেশায় যে নারী ছিল, আজ তার প্রবীণ জীবনের ক্ষিধার জ্বালা মেটাতে হয় ভিক্ষাবৃত্তি করে। সংসারহীন যৌনকর্মীরা প্রবীণ হলে পেশায় থাকতে যেমন পারেন না, তেমনি মা-বাবা ভাই-বোনের সংসারেও থাকতে পারেন না। শারীর বিক্রির টাকা যাদের দিয়েছিলেন তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। পরিচিতজনকরা ক্রমেই অপরিচিত হয়ে ওঠেন। চোখের পানির ওপর ভরসা করে সহায়-সম্বলহীন অমর্যাদায় অসম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করেন। পৃথিবীতে দুটি আদিম ঘৃণ্য পেশা রয়েছে। এর মধ্যে একটি পতিতাবৃত্তি আরেকটি হলো ভিক্ষাবৃত্তি। যৌনকর্মীরা যৌবনে পতিতাবৃত্তি ও বার্ধক্যে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত হন। নারীর এত বড় অসম্মান থেকে রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে। যৌনতা পণ্যসামগ্রী নয়Ñ এই বোধ আমাদের মধ্যে তৈরি হতে কত সময় লাগবে তা বলতে পারছি না। একটি সমাজে যতক্ষণ পতিতাবৃত্তি এবং ভিক্ষাবৃত্তি থাকবে ততক্ষণ সমাজটিকে সভ্য সমাজ হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। 
আমাদের বোনরা এমন একটি পেশায় আছে, যা একদিকে অসম্মাজনক অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ। প্রবীণ পতিতাদের সমাজে পুনর্বাসিত করার জন্য আমাদের সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এ ব্যাপারে সেইসব প্রবীণ এগিয়ে আসতে পারেন, যারা সমাজে অধিক সুবিধাপ্রাপ্ত। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে আমাদের কিছু সংখ্যক প্রবীণ সামর্থ্যবান আছেন, তারা সরকারের পাশাপাশি প্রবীণ বেদে, যৌনকর্মী, হিজড়াদের জীবনকে শান্তিপূর্ণ ও স্তস্তিদায়ক করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারেন।

লেখক : সভাপতি, এজিং সাপোর্ট ফোরাম
ট্রেজারার, বাংলাদেশ জেরোন্টলজিক্যাল 
অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএ)