আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১২-০৭-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

শিশু যৌন নির্যাতন বন্ধে প্রয়োজন সম্মিলিত সচেতনতাবোধ

সাখাওয়াত মজুমদার
| সম্পাদকীয়

শিশু নির্যাতন বন্ধে আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক জীবনসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। সর্বোপরি শিশু যৌন নির্যাতনকারী নরপিশাচ ও হত্যাকারীদের আইনের কাছে সোপর্দ করার বিষয়ে সবার সচেতনতা একান্ত জরুরি। সবার সম্মিলিত সচেতনতাবোধই পারে আমাদের আগামীর শিশুদের জন্য একটি সুন্দর বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে

শিশুরা নিষ্পাপ। আনন্দ প্রেরণার উৎস হলো শিশু। আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। ছোটবেলার ঘটে যাওয়া নানা ঘাত-প্রতিঘাত ভবিষ্যৎ জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক সময়ে এ শিশুরাই হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের অন্যতম অলোচ্য বিষয়। তবে কোনো সুসংবাদ হিসেবে নয়, বরং দুঃসংবাদ এবং উদ্বেগের বিষয় হয়ে সামনে এসেছে শিশুদের বিষয়টি। তা হলো শিশু যৌন নির্যাতন। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিনিয়ত সংবাদপত্রের পাতাজুড়ে থাকে এ রকম খবর। খবরটি আমাদের সবার জন্য গভীর উদ্বেগের। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে ৩৯৯ শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর এক ছেলে শিশুসহ মোট ১৬ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। যদিও অনেকে মনে করেন বাস্তবে এর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। শিশুদের প্রতি এসব ঘটনা শিশুর নিজ বাড়ির একেবারে আশপাশে ঘটছে। শিশু নির্যাতনকারী এসব নরপিশাচ শিশুদের শুধু যৌন নির্যাতনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে তারা নির্যাতনের শিকার শিশুটিকে হত্যাও করছে। সংগত কারণেই শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে বাবা-মায়ের মনে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ।
শিশু যৌন নির্যাতন একটি আন্তর্জাতিক বিষয় হলেও এটি একটি জটিল এবং কঠিন বিষয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দেশভেদে শিশু নির্যাতনের হারে পার্থক্য বিদ্যমান। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যায়, তিন ভাগ বয়স্ক ব্যক্তিই শিশু থাকা অবস্থায় শারীরিক নির্যাতনের অভিজ্ঞতা লাভ করেছে এবং প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন নারী এবং ১৩ জনের মধ্যে একজন পুরুষ শিশুকালে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। 
শিশু নির্যাতনের পুরো ইতিহাসের দিকে নজর দিলে দেখা যাবে, অনেক আগে থেকেই বিষয়টির উপস্থিতি ছিল; তবে বিশেষজ্ঞরা এ ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে শুরু করেন ১৯৬০ দশকে। ১৯৬২ সালে শিশু বিশেষজ্ঞ মনোবিজ্ঞানী সি. হেনরি কেম্প এ বিষয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন। বিষয়টিকে শিশু দুর্ব্যবহার বিষয়ে সতর্কতা ও সচেতনতার প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার প্রাথমিক পর্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ নিবন্ধ প্রকাশের আগে বিশেষজ্ঞরা একে হাড়ের রোগ বা এ রকম কিছুর অজুহাত হিসেবে দেখত। ঊনবিংশ শতাব্দীজুড়ে ১৯৭০ দশক পর্যন্ত কিছু পাশ্চাত্য দেশে নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর শিশুদের তাদের পরিবার থেকে আলাদা করে রাখা হতো। এ কাজটি করত রাষ্ট্র এবং চার্চ কর্তৃপক্ষ। তাদের বাধ্য করা হতো অন্য সমাজ বা গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হতে। এমন নীতিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল স্টোলেন জেনারেশন এবং কানাডার ইন্ডিয়ান রেসিডেন্সিয়াল স্কুল ব্যবস্থা। সে সময়ে এমন শিশুরা বেশিরভাগ সময়ই মারত্মক নির্যাতনের শিকার হতো। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭০ দশকের শুরুর দিকে শিশু নির্যাতনের বিষয়টি পাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অনেকে মনে করে থাকেন, কোনো সমাজের শিশুদের মধ্যে এমন বিশ্বাস জন্মায় যে, বড়দের কাছে তাদের নিকৃষ্টরূপে থাকতে হয়, তখন সব শিশুই নির্যাতনের ভুক্তভোগী হয়।
এখন দেখা যাক, শিশু যৌন নির্যাতন বিষয়টি কী? শিশু যৌন নির্যাতন বলতে এমন একধরনের শিশু নির্যাতনকে বোঝানো হয়, যেখানে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক বা বড় শিশুর দ্বারা কোনো শিশুকে যৌনতামূলক কাজে অংশগ্রহণ করা হয়, যার উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তির শারীরিক সন্তুষ্টি লাভ বা বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়া। এ ধরনের যৌন নির্যাতনের মধ্যে রয়েছে কোনো শিশুকে পর্নো দেখানো, কোনো শিশুর সঙ্গে সত্যিকার অর্থে যৌনসঙ্গীর মতো আচরণ করা, যৌনতামূলক কাজ করতে বলা বা চাপ দেওয়া, যৌনাঙ্গ প্রদর্শন করতে বলা বা বাধ্য করা, শিশুর যৌনাঙ্গ স্পর্শ করা বা দেখা বা শিশু পর্নো তৈরি করা। গবেষণায় দেখা যায়, শিশু যৌন নির্যাতক নরপিশাচদের বেশিরভাগ যৌন নির্যাতনের শিকার ছেলে বা মেয়ের পূর্বপরিচিত; শিশুর আত্মীয়। প্রায় ৬০ শতাংশ হলো অন্যভাবে পরিচিত লোকজনÑ যেমন পারিবারিক বন্ধু, শিশু দেখাশোনাকারী, প্রতিবেশী। অবশ্য অপরিচিত লোক দ্বারা নির্যাতনের শিকার হওয়া শিশুর সংখ্যাও কম নয়। ১৯৯৯ সালে আরএএইচআই ফাউন্ডেশন কর্তৃক ভারতে একটি জরিপ পরিচালিত হয়। সেখানে দেখা যায়, ভারতে যৌন নির্যাতনের প্রায় ৭৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানায় তারা শিশু অবস্থায় যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। যার ৪০ শতাংশ হলো পারিবারিক সদস্য। আবার তিনভাগের একভাগেরও বেশি ঘটনায় দেখা গেছে নির্যাতনকারীর বয়সও আঠারো বছরের নিচে।
শিশু যৌন নির্যাতন মূলত একটি জটিল ইন্দ্রিয়গাহ্য বিষয়, যাতে বেশকিছু কারণ জড়িত। প্রাপ্তবয়স্ক কোনো ব্যক্তি কেন শিশুদের প্রতি হিংসাত্মক আচরণ করে তার একক কোনো কারণ পাওয়া যায় না। তবে ব্যক্তি পর্যায়ে কিছু বিষয় যেমনÑ বয়স, লিঙ্গ এবং ব্যক্তিগত ইতিহাস, সমাজের ক্ষেত্রে সংস্কৃতিক ধারা, আচার শিশুর প্রতি দুর্ব্যবহার করতে উৎসাহিত করে। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক অসামঞ্জস্যতা এবং সামাজিক নিরাপত্তার অভাবও জড়িত। শিশুদের যৌন নিপীড়নের অনেক ঘটনা সামাজিক ও পারিবারিকসহ নানা কারণে প্রকাশই হয় না। যেসব শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়, তারা পরবর্তী জীবনে নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যার মুখোমখি হয়। এমনকি কেউ কেউ যৌন নিপীড়কও হয়ে ওঠে। চিকিৎসকদের মতে, মূলত যৌন নিপীড়নের শিকার শিশুরা ট্রমায় আক্রান্ত হওয়ায় বিশেষ সেবার প্রয়োজন। বিশেষ কোনো স্থান বা পোশাকের প্রতিও তাদের ভীতির সৃষ্টি হয়। কেউ কেউ আবার মানসিক ভারসাম্যই হারিয়ে ফেলতে পারে। বেশিরভাগ সময় দেখা যায়, শিশুরা যৌন নিপীড়নের শিকার হলে তা প্রকাশ করতে পারে না। তবে তাদের আচরণ একটু পর্যবেক্ষণ করলেই মা-বাবা অথবা পরিবারের সদস্যরা তা সহজেই বুঝতে পারবে। 
শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ। আজকের শিশু বড় হয়ে একটি দেশের কর্ণধার হবে। তার হাতে থাকবে দেশ পরিচালনার মতো গুরুদায়িত্ব। অথচ সেই শিশুসন্তানকে নির্যাতন করে হত্যা করা হচ্ছে, যা বর্তমান সময়ে গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখনই শিশুদের যৌন নির্যাতন ও হত্যা বন্ধে ব্যাপক গণসচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। আমরা যদি সঠিকভাবে এ কাজটি না করতে পারি, তাহলে শিশুদের কাছে আমাদের দায় থেকে যাবে। শিশু নির্যাতন বন্ধে আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক জীবনসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। সর্বোপরি শিশু যৌন নির্যাতনকারী নরপিশাচ ও হত্যাকারীদের আইনের কাছে সোপর্দ করার বিষয়ে সবার সচেতনতা একান্ত জরুরি। সবার সম্মিলিত সচেতনতাবোধই পারে আমাদের আগামীর শিশুদের জন্য একটি সুন্দর বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে। 

সাখাওয়াত মজুমদার
লেখক ও অনুবাদক