আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১২-০৭-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ভাঙন ধসে দুর্ভোগ

আলোকিত ডেস্ক
| প্রথম পাতা

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ৩০টি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকে পড়ায় শিক্ষার্থীশূন্য হয়ে পড়ে ওইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ছবিটি বৃহস্পতিবার সাদেরখলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তোলা ষ পিবিএ

- নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত

- পানির নিচে বিস্তীর্ণ এলাকা

- ৬ দিনের টানা বৃষ্টিতে জলমগ্ন চট্টগ্রাম

- রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে ধস

পাহাড়ি ঢল ও প্রবল বর্ষণে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বিভিন্ন স্থানে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। বন্যা দুর্গত এলাকার ফসলি জমি, রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। গবাদি পশু নিয়ে মালিকরা চরম বিপাকে পড়েছেন। যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার ছয়টি উপজেলার বিস্তীর্ণ গোচারণ ভূমি ও বাথান এলাকা ডুবে গেছে। এদিকে টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার সব নদ-নদীতে পানি বাড়ছে। কলমাকান্দা উপজেলার বড়খাপন ইউনিয়নের সবটাই প্লাবিত হয়েছে। আর লালমনিরহাটে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। বিস্তারিত প্রতিনিধিদের খবরেÑ

সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জে চার দিনের টানা ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে জেলার সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার লালপুর, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা, দোয়ারাবাজার উপজেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে টানা বৃষ্টিপাতে পানি কিছু মানুষের ঘরবাড়িতে উঠে গেছে। তবে এখনও আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি বলে জানিয়েছেন পানিবন্দি লোকজন। ছোট ডিঙি নৌকা দিয়ে তারা তাদের প্রয়োজনীয় কাজ করছেন। বিশেষ করে খাবার পানি আনতে হচ্ছে দূরের টিউবওয়েল থেকে। 
মৌলভীবাজার : বৃহস্পতিবার ভোর ৬টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল সড়ক যোগাযোগ বন্ধ ছিল। এছাড়াও লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যোনের ভেতর দিয়ে সিলেট, ঢাকা-সিলেট-চট্টগ্রামের রেলও আতঙ্ক নিয়ে চলাচল করছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মসহকারী দেবাশীষ দে মাগুরছড়ায় গাছ পড়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, গাছটি কেটে সরানোর জন্য লোকজন পাঠানো হচ্ছে।
জামালপুর : জেলার বকশীগঞ্জে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ধানুয়া কামালপুর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকায় একটি বাঁধ ভেঙে পাঁচটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বুধবার সকালের দিকে বৃষ্টির সময় বাঁধটি ভেঙে গেলে দুপুরেই বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হতে থাকে। কয়েকদিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কামালপুর ইউনিয়নের সাতানীপাড়া, বালুঝুড়ি, কনেকান্দা, সোমনাথ পাড়াসহ পাঁচটি গ্রাম প্লাবিত হয়। বাঁধ ভেঙে হঠাৎ প্লাবিত হওয়ায় এসব এলাকার প্রায় ২০টি পুকুর, দুইটি মাছের প্রকল্প ও অসংখ্য বীজতলা পানিতে ডুবে গেছে। 
কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামে অবিরাম বর্ষণ ও উজানের ঢলে নদনদীতে পানি দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকায় দু-একদিনের মধ্যে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমা অতিক্রম করবে বলে জানিয়েছে স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। এদিকে পানি বাড়ায় চরাঞ্চলের শতাধিক গ্রামের নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২৪ ঘণ্টায় বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ধরলা নদীর পানি ৩৭ সেমি., ব্রহ্মপুত্রের চিলমারী পয়েন্টে ২৯ সেমি. ও নুনখাওয়া পয়েন্টে ৪৫ সেমি. এবং তিস্তায় ১৩ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। তবে সবগুলো নদনদীর পানি বিপদসীমার নিচে রয়েছে। ডুবে গেছে নিচু এলাকার বীজতলা, ভুট্টা ও সবজির খেত। কুড়িগ্রাম সদর, ফুলবাড়ী, নাগেশ^রী, রাজারহাট, উলিপুর, চিলমারী ও রৌমারী উপজেলার শতাধিক চরগ্রামের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ : এনায়েতপুরে যমুনা নদীর তীর প্রতিরক্ষা কাজের উজানে প্রায় ২৯ মিটার বাঁধ ধসে গেছে এবং শাহজাদপুরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ রিং বাঁধ কেটে দেওয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় ৩৫ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। যমুনা অভ্যন্তরে চরাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে তিল-কাউন-পাটসহ অনান্য ফসল ডুবে গেছে। উজানের ঢলে আরও চার থেকে পাঁচ দিন যমুনায় পানি বাড়তে পারে। স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের এসও হেডকোয়াটার রনজিৎ কুমার সরকার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, কয়েক সপ্তাহ ধরে পাহাড়ি ঢল ও দফায় দফায় প্রবল বর্ষণে সিরাজগঞ্জের কাছে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে যমুনা নদীর তীরবর্তী সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, চৌহালী, বেলকুচি, কাজিপুর ও সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার অধিকাংশ নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। 
নেত্রকোনা : টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার সব নদ-নদীতে পানি বাড়ছে। স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সোমেশ্বরী নদীর পানি বিপদসীমার ১৩০ সেন্টিমিটার ও কংস নদের পানি জারিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৭৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। নদীতে প্রচ- স্রোতের কারণে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর দুর্গাপুর-শিবগঞ্জ, বিরিশিরি-শিবগঞ্জ, ফারাংপাড়া-কামারখালী, চৈতাটি-গাঁওকান্দিয়া ঘাটে নৌকা নিয়ে পারাপার দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন এলাকাবাসী। কলমাকান্দা উপজেলার লেঙ্গুরা, খারনই, রংছাতি, নাজিরপুর, কৈলাটি, পোগলা ও বড়খাপন ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে মানুষের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। 
লালমনিরহাট : অবিরাম বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তা-ধরলাসহ সব নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় লালমনিরহাটে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতির সার্বিক অপরিবর্তিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৬টায় তিস্তা ব্যারাজ দোয়ানী পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে এখনও পানিবন্দি রয়েছে পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা, চরদহগ্রাম, হাতীবান্ধা উপজেলার সানিয়াজান, গড্ডিমারী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া, ডাউয়াবাড়ী, কালীগঞ্জ উপজেলার-পশ্চিম কাশিরাম, চর বৈরাতী, নোহালী, শৈলমারী, ভোটমারী, হাজিরহাট, আমিনগঞ্জ, কাঞ্চনেশ্বর ও রুদ্ধেশ্বর, আদিতমারী উপজেলার চন্ডিমারী, দক্ষিণ বালাপাড়া, আরাজি শালপাড়া, চরগোর্দ্ধন ও সদর উপজেলার কালমাটি, খুনিয়াগাছা, রাজপুর, তিস্তা, তাজপুর, গোকুন্ডা, মোগলহাট, বনগ্রামসহ নদীর তীরবর্তী প্রায় ২০ গ্রাম। প্লাবিত হয়ে রয়েছে প্রায় ৫ হাজার মানুষ। স্থানীয় প্রশাসন ত্রাণ তৎপরতা শুরু করলেও বন্যার্তরা জানিয়েছেন তা প্রয়াজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল।
বীরগঞ্জ : দিনাজপুরের বীরগঞ্জে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে বীরগঞ্জ উপজেলার ৩নং শতগ্রাম ইউনিয়নের ঝাড়বাড়ীর বাজারে উত্তর থেকে ভূমি অফিসের সামনে দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ যাওয়ার সড়কটিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। সড়কের পাশের দোকানেও পানি প্রবেশ করছে। জলাবদ্ধতার কারণে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে এলাকাবাসীকে। 
চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামে ছয় দিন ধরে ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে হাজারো মানুষ। মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকাতে আরও কয়েকদিন ভারি বর্ষণের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। টানা বৃষ্টিতে বুধবার বিকাল ৩টা থেকে বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৯৬ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। 
চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মেঘনাদ তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, চট্টগ্রামে ভারি বর্ষণের কারণে পাহাড় ধসের আশঙ্কা রয়েছে। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আরও কয়েকদিন ভারি বর্ষণ হতে পারে। এদিকে বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম নগরীতে প্রতিদিনই নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। জলমগ্ন হয়ে পড়েছে নগরীর দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা। নগরীর বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, চকবাজার, হালিশহর, বাকলিয়া, কোতোয়ালিসহ বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরপানি জমে গেছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয়রা। ভূমিধসের সতর্কতা জারির পর নগরীতে শনিবার থেকে আটটি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করেছে জেলা প্রশাসন। পাশাপাশি নগরীর সরকারি ও বেসরকারি মালিকানাধীন ১৭ ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বসবাসকারীদের সরিয়ে নিতে নিয়মিত মাইকিং করছে প্রশাসন। নগরীর প্রায় সব রুটে লোকাল বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। নগরবাসীর ভরসা এখন রিকশা, অটোরিকশা, ভ্যান ও টেম্পো। বিভিন্ন সড়কে পানি জমে অফিসগামী যাত্রীদের নাকাল হতে হয়েছে দিনের শুরুতেই। মুরাদপুর থেকে লালখানবাজার পর্যন্ত আক্তারুজ্জামান ফ্লাইওভারেও হাঁটুপানি জমে থাকে বৃষ্টিতে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়াও বাসাবাড়ি, বাজার সব জায়গায় এখন হাঁটু থেকে কোমরপানি। 
রাঙ্গামাটি : টানা বৃষ্টিতে রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রামের সড়কের ঘাগড়ার কলাবাগান এলাকায় ধস নেমেছে। যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যে?তে পারে যান চলাচল। বর্তমানে ঝুঁকি নিয়ে ওই সড়কে যানবাহন চলাচল করছে। জরুরিভাবে ধস মেরামত করা না গেলে রাঙ্গামাটির সঙ্গে চট্টগ্রামের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে বলে এলাকাবাসী মনে করছেন। তবে ধস রক্ষার জন্য বস্তা ও বল্লী দিয়ে কাজ করছে সড়ক বিভাগের কর্মীরা।