আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১২-০৭-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

ফাইনালে ইংল্যান্ড

নতুন ঘরে যাচ্ছে বিশ্বকাপ

আহসান হাবিব সম্রাট
| প্রথম পাতা

ডেভিড ওয়ার্নারের উইকেট নিয়ে উল্লাসে ফেটে পড়েন ক্রিস ওকস। উৎসবে যোগ দিলেন বেন স্টোকসও। বৃহস্পতিবার বার্মিংহামে ষ ক্রিকইনফো

 

অস্ট্রেলিয়া : ২২৩/১০ (৪৯ ওভার)

ইংল্যান্ড : ২২৬/২ (৩২.১ ওভার) 

ইংল্যান্ড ৮ উইকেটে জয়ী 

 

দুর্দান্ত দাপটে লিগ পর্বের লড়াই শেষ করেছিল অস্ট্রেলিয়া। সবার আগে শেষ চারে জায়গা করে নিয়েছিল টুর্নামেন্টে দারুণ ছন্দে থাকা পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। সেমিফাইনালে কখনও না হারার রেকর্ডের সঙ্গে লিগ পর্বে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বড় জয়ে মানসিকভাবে এগিয়ে ছিল অস্ট্রেলিয়া; কিন্তু ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে ডেভিড ওয়ার্নার-অ্যারন ফিঞ্চদের মুদ্রার অপর পিঠ দেখিয়ে দিল অধিনায়ক ইয়ন মর্গানের দল। রেকর্ড পরিসংখ্যানকে পাত্তা না দিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে আট উইকেটে উড়িয়ে দিয়ে ফাইনালে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গী হলো ইংল্যান্ড। এজবাস্টনে অস্ট্রেলিয়াকে ২২৩ রানে গুটিয়ে দিয়ে ইংলিশদের ফাইনালে ওঠার সিঁড়ি তৈরি করেই রেখেছিলেন ক্রিস ওকস ও তার সতীর্থরা। জবাবে ওপেনার জ্যাসন রয়ের অনবদ্য ব্যাটিংয়ে ১০৭ বল হাতে রেখে ২ উইকেট হারিয়ে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে যায় স্বাগতিকরা। ১৯৯২ সালের পর আবারও বিশ্বকাপ ফাইনালে জায়গা করে নিল ইংল্যান্ড। 

সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের এ জয়ে বিশ্বকাপ ট্রফি এবার যাচ্ছে নতুন ঘরে। আগে তিনবার ফাইনালে খেললেও ট্রফি জিততে পারেনি ইংল্যান্ড। অপরদিকে গত আসরে ফাইনালে খেললেও শিরোপা হাতে তুলতে পারেনি নিউজিল্যান্ড। আসরের প্রথম সেমিফাইনালে ভারতকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে ওঠা কিউইদের স্বপ্ন এবার ট্রফি ঘরে তোলা। আর নিশ্চিতভাবেই এবারের ফাইনাল পাবে নতুন কোনো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। আক্ষেপ দূর হবে নিউজিল্যান্ড-ইংল্যান্ড মধ্যকার যে কোনো একটি দলের। 
অজিদের বিপক্ষে ওয়ানডে কিংবা বিশ্বকাপ মুখোমুখিতে জয়ের রেকর্ডে পিছিয়ে থাকলেও ইতিহাসে কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না ইয়ন মর্গানদের। গত বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়ার পর খোল-নলচে পাল্টে নিজেদের নতুন করে গড়ে ইংল্যান্ড। দারুণ উত্থানে র‌্যাকিংয়ের চূড়ায় ওঠা ইংলিশদের আসরের শুরু থেকেই হটফেভারিট হিসেবে গণ্য করা হচ্ছিল; কিন্তু লিগ পর্বের মাঝ পথে সেমির পথ খানিকটা পিচ্ছিল হলেও শেষ পর্যন্ত কঠিন বাধা পেরিয়ে শেষ চারে যেতে সফল হয় স্বাগতিকরা। লিগে শেষ দুই ম্যাচে ভারত ও নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে দারুণ উজ্জীবিত ছিল ইংল্যান্ড। সেই আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলনই ঘটে গতকাল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় সেমিফাইনালে। টস জিতে আগে ব্যাট করতে নেমে ক্রিস ওকস ও জোফরা আর্চারের পেস তোপের সঙ্গে আদিল রশিদের কব্জির ভেলকিতে ডানা মেলতে পারেনি অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস। বোলাররা লক্ষ্যটাকে নাগালে বাঁধার পর ব্যাট হাতে জয়ের আনুষ্ঠানিকতা সারেন ইংল্যান্ডের টপঅর্ডাররা।
২২৪ রানের লক্ষ্যে নামা ইংল্যান্ডকে উড়ন্ত সূচনা এনে দেন দুই ওপেনার জেসন রয় ও জনি বেয়ারস্টো। আগের দুই ম্যাচের মতো টানা তৃতীয় ম্যাচেও উদ্বোধনী জুটিতে সেঞ্চুরি উপহার দেন এ দুই ব্যাটসম্যান। গতকাল তাদের ১৭.২ ওভারের ওপেনিং জুটি ভাঙে দলীয় ১২৪ রানে। মিচেল স্টার্কের বলে ল্যাগবিফোরের ফাঁদে পড়েন বেয়ারস্টো। ৪৩ বলে ৩৪ করেন তিনি। তবে শক্ত হাতেই ইনিংসের হাল ধরেছিলেন জেসন রয়। চার-ছয়ের ফুলঝুরিতে ব্যাটে ঝড় তুলে দলকে এগিয়ে নিতে থাকেন। ৫০ বলে ফিফটি পূরণের পর অজি বোলারদের জন্য আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠেন এ ওপেনার। মাত্র ৬৫ বলে ৮৫ করে আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্তে আউট হন জেসন রয়। অস্ট্রেলিয়ার বোলিং বিভাগকে উড়িয়ে ৯ বাউন্ডারি ও ৫ ছক্কায় ইনিংসটা সাজান জেসন রয়। যেভাবে খেলছিলেন তাতে নিজের অভিষেক বিশ্বকাপে দ্বিতীয় সেঞ্চুরির খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন; কিন্তু আম্পায়ার কুমার ধর্মসেনা সেটা হতে দিলেন না। তার ভুল সিদ্ধান্তে ক্যাচ আউট হন তিনি। অথচ বল তার ব্যাটেই লাগেনি। ইংল্যান্ডের রিভিউ আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাই আউটের সিদ্ধান্ত পাল্টানোর কোনো সুযোগ ছিল না। ২০ ওভারে ১৪৭ রানে ২ উইকেট হারানো ইংল্যান্ডকে জয়ের পথ দেখান অধিনায়ক ইয়ন মর্গান ও জো রুট। তৃতীয় উইকেটে ১২.৩ ওভারে অবিচ্ছিন্ন থেকে ৭৯ রানের জুটিতে স্বাগতিকদের জয় নিশ্চিত করেই মাঠ ছাড়েন এ দুই ব্যাটসম্যান। রুট ৪৬ বলে ৪৯* ও মর্গান ৩৯ বলে ৪৫* করেন। অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে একটি করে উইকেট নেন মিচেল স্টার্ক ও প্যাট কামিন্স। দুর্দান্ত বোলিংয়ের জন্য ম্যাচসেরা হয়েছেন ইংল্যান্ড পেসার ক্রিস ওকস। 
এর আগে ব্যাট করতে নেমে মাত্র ১৪ রানেই তিন টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানকে হারিয়ে মুখ থুবড়ে পড়া অস্ট্রেলিয়াকে মনে হচ্ছিল অল্প পুঁজিতেই গুটিয়ে যাবে। ঠিক তখনই হাল ধরেন স্টিভেন স্মিথ। অনেকটা একাই টেনে নিয়ে যান দলকে। বল টেম্পারিং কলঙ্কে নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে উঠা এ ব্যাটসম্যান করেন ৮৫ রান। তার দৃঢ়তাতেই রক্ষা। ইংল্যান্ডের বোলিং তোপ সামলে শেষ পর্যন্ত দলকে সম্মানজনক স্কোর এনে দেন অজিদের সাবেক এ অধিনায়ক। 
বিশ্বকাপে নিজেদের সাত সেমিফাইনালে কখনোই না হারার রেকর্ড নিয়েই বার্মিংহামে পাড়ি জমিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু এ ভেন্যুতে সেমিফাইনাল খেলার আগে খানিকটা শঙ্কাও কাজ করছিল আসরের বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের। ২০০১ সালের পর কোনো ফরম্যাটেই এজবাস্টনে জেতেনি অস্ট্রেলিয়া। গতকাল টস জিতে ব্যাট করতে নেমে সেই আতঙ্কই ফিরে এল অজি শিবিরে। ক্রিস ওকস ও জফরা আর্চারের দুরন্ত গতি ও বাউন্সে বেসামাল অস্ট্রেলিয়া শুরুতেই পথ হারায়। দলীয় ১৪ রানের মাথায় বিদায় নেন দলপতি ও ওপেনার অ্যারন ফিঞ্চ (০), ডেভিড ওয়ার্নার (৯) আর উসমান খাজার বদলি হিসেবে একাদশে আসা পিটার হ্যান্ডসকম্ব (৪)। এরপর দলের হাল ধরেন স্টিভ স্মিথ এবং অ্যালেক্স ক্যারি। এ জুটিতে আসে ১০৩ রান। জফরা আর্চারের বাউন্স সামলাতে না পেরে আহত হন ক্যারি। হেলমেটে বল আঘাতের পর ক্যারির থুতুনি দিয়ে রক্ত ঝরে। ব্যান্ডেজ বেঁধেই লড়ে যান অজি উইকেটরক্ষক। আদিল রশিদের বলে বদলি ফিল্ডার ভিন্সের তালুবন্দি হওয়ার আগে ক্যারি ৭০ বলে চার বাউন্ডারিতে করেন ৪৬ রান। মাঝে ০ রানেই বিদায় নেন মার্কাস স্টয়নিস। এরপর স্মিথ-গ্লেন ম্যাক্সওয়েল জুটিতে আসে ৩৯ রান। ম্যাক্সওয়েল ২৩ বলে দুটি চার আর একটি ছক্কায় করেন ২২ রান। পরের ব্যাটসম্যান প্যাট কামিন্স ৬ রান করে সাজঘরের পথ ধরেন। সতীর্থদের যাওয়া-আসার মধ্যে উইকেটের একপ্রান্ত ধরে খেলতে থাকেন তিন নম্বরে নামা স্মিথ। মিচেল স্টার্কের সঙ্গে স্মিথের অষ্টম উইকেট জুটিতে আসে আরও ৫১ রান। ইনিংসের ৪৮তম ওভারে রানআউট হওয়ার আগে স্মিথ করেন ৮৫ রান। স্মিথের ১১৯ বলে সাজানো ইনিংসে ছিল না কোনো ছক্কার মার, ছিল ছয়টি বাউন্ডারি। স্মিথের বিদায়ের পরের বলেই ফেরেন ৩৬ বলে একটি করে চার ও ছক্কা হাঁকিয়ে ২৯ রান করা স্টার্ক। পরের দুই ব্যাটসম্যান জেমস বেহরেনডর্ফ ১ ও নাথান লায়ন করেন ৫ রান। ইংল্যান্ডের হয়ে তিনটি করে উইকেট নেন ক্রিস ওকস ও আদিল রশিদ। এছাড়া দুইটি করে উইকেট তুলে নেন জফরা আর্চার।