আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১২-০৯-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

মদিনা শরিফের জুমার খুতবা

ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে জরুরি দিকনির্দেশনা

শায়খ ড. সালাহ বিন মুহাম্মাদ বুদাইর

| নবী জীবন
  • হে শিক্ষার্থীরা, উপযুক্ত ও যথার্থ জ্ঞানার্জনের দিকে ভালো করে ছুটে চল। বিরক্তি, ক্লান্তি, বিষাদ, ব্যর্থতা ও হাল ছাড়ার মনোভাব ত্যাগ কর। জ্ঞান অন্বেষণ কর। যে জ্ঞান অর্জন করে জ্ঞান তাকে ছোটবেলায় সঠিকভাবে গড়ে তোলে আর বড় হলে তাকে অগ্রগামী করে। উরওয়া ইবনে জুবায়ের (রহ.) বলেন, ‘হে বৎসরা, তোমরা জ্ঞান অর্জন কর। ছোট থাকতে তোমাদের প্রয়োজন না হলেও আশা করা যায় বড় হলে তোমাদের ছাড়া চলবে না।’

মহৎ উদ্দেশ্য ও উন্নত লক্ষ্যপানে ছুটে চলা অধ্যবসায়ী লোকদের সাধনা ও পরিশ্রমী ব্যক্তিদের অভ্যাস। ইলম বা জ্ঞান এমনই উচ্চমর্যাদার বিষয়, যার অন্বেষণকারীকে শ্রদ্ধা করা হয় এবং মানুষের চোখে জ্ঞানীকে বড় করে দেখা হয়। যে ব্যক্তি জ্ঞানকে ভালোবেসেছে জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ম্য তাকে ঘিরে রেখেছে। তার অঙ্গনে জ্ঞানের সৌন্দর্য বিরাজ করেছে। মুজাইনি (রহ.) বলেন, আমি ইমাম শাফেঈ (রহ.) কে বলতে শুনেছি, ‘যে কোরআন শিখেছে তার মূল্য বিশালত্ব লাভ করেছে। যে ফিকহ বিষয়ে গবেষণা করেছে তার মর্যাদা উন্নীত হয়েছে। যে হাদিস সংকলন করেছে তার প্রমাণযোগ্যতা শক্তিশালী হয়েছে। যে ভাষা নিয়ে চিন্তা করেছে তার স্বভাব কোমল হয়েছে। যে গণিত নিয়ে ভেবেছে তার মত বিশুদ্ধ হয়েছে। যে নিজেকে সুরক্ষিত করতে পারেনি তার জ্ঞান তার উপকারে আসেনি।’
জ্ঞানের মাধ্যমে জাতির শৌর্য শক্তিশালী হয়। যুগে যুগে কলমের সঙ্গে বিধান ও প্রজ্ঞার সম্পৃক্তি ঘটেছে। তাই জ্ঞানের প্রতি মনোনিবেশ কর, তাহলে মর্যাদার শীর্ষে পৌঁছতে পারবে। যেখানে ঘিরে থাকবে সম্মান, গৌরব ও শ্রেষ্ঠত্ব। সংকটকালে শিক্ষা তোমাকে রক্ষা করবে। নিঃসঙ্গতায় তোমাকে আপন করে নেবে। তোমাকে মর্যাদার আসনে বসাবে।
নতুন শিক্ষাবর্ষ উঁকি দিয়েছে। শিগগিরই বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রবেশদ্বার উন্মুক্ত হবে। শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা ও অভিনন্দন জানিয়ে স্বাগত জানাবে। এ মহান উপলক্ষে ছাত্রছাত্রীদের জন্য কিছু দিকনির্দেশনা ও উপদেশ উপস্থাপন করা হলো।
হে শিক্ষার্থীরা, তোমরা আগ্রহ-উদ্দীপনা, প্রফুল্লতা, মুক্তমন, মনোবল ও দৃঢ়চিত্ততার সঙ্গে শিক্ষার আসনে ফিরে যাও। উদাসীনতা, স্থবিরতা, অবহেলা ও অলসতার লাঞ্ছনা ও গ্লানি থেকে মুক্ত হও।
পরিশ্রমে আছে মর্যাদা ও অলসতায় আছে বঞ্চনা। তাই জেগে ওঠো, অচিরেই পেয়ে যাবে কাক্সিক্ষত গন্তব্য। প্রকৃত তরুণ তো সে, যে দৃঢ় সংকল্পে ভূষিত, যে কথা ও কর্মের দীনতায় অভ্যস্ত নয়।
হে শিক্ষার্থীরা, তোমরা শিক্ষার আসনে সকাল সকাল দ্রুত উপস্থিত হও, বেগে ধাবিত হও। পেছনে পড়ে থাকা, পশ্চাৎগামী ও বিলম্বে আগমন পরিত্যাগ কর। কেননা সকাল সকাল কাজ করার মাঝেই সমৃদ্ধি, জীবিকা, সফলতা ও সুযোগ নিহিত থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে আল্লাহ আমার উম্মতের জন্য তার প্রভাতকালে বরকত ও সমৃদ্ধি দান কর।’ (তিরমিজি)।
ফজরের নামাজ না পড়লে সেই দিনের বরকত অর্জন হবে না। ফজরের নামাজ দিবসের শীতল কোমল বাতাস ও বসন্তের মতো। তাই সকালে জাগ। জিকির কর। তাতে দেহ ও মন সতেজ এবং সবল থাকবে। যে সকালে অলসতা করে ঘুমিয়ে নষ্ট করে, পাঠে অনুপস্থিত থাকে তার জীবনের লক্ষ্য নষ্ট হয়ে যায়। দুপুরে খাবারের পরে একটু বিশ্রাম করা বা কাইলুলাহ করা মুস্তাহাব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা কাইলুলাহ কর, কেননা শয়তান কাইলুলাহ করে না।’ (আবু নুআঈম)।
রাতের প্রথমভাগে ঘুমিয়ে পড় আর তোমার জন্য নিয়োজিত দুই ফেরেশতাকে শান্তি দাও। প্রতিদিন সকালে মা-বাবাকে কষ্ট দিও না। কত মানুষকে দেখেছি দুষ্ট ভ্রষ্ট মন্দ সঙ্গীদের সঙ্গে রাত জেগে জেগে হারাম গর্হিত কাজে লিপ্ত থেকে নিজের চাকরি খুইয়েছে বা পড়াশোনা বাদ দিয়েছে কিংবা সন্তান ও পরিবারের প্রতি অবহেলা করেছে।
হে শিক্ষার্থী, তুমি শিষ্টাচার, ভদ্রতা, পরিচ্ছন্নতা, স্বচ্ছতা, পবিত্রতা, শিক্ষকের সম্মান, নিয়মনীতির নিষ্ঠা, শিক্ষা কার্যালয় ও পাঠ্যপুস্তকের প্রতি যত্মশীল হও। আল্লাহকে ভয় কর। কেননা আল্লাহর কাছে হৃদয়ের কোনো কিছুই গোপন থাকে না। সামান্য ক্ষুদ্র বস্তুও তাঁর কাছ থেকে দূরে থাকে না। জ্ঞানকে তোমার পাথেয় বানাও। ভদ্রতাকে তোমার আত্মমর্যাদাবোধে পরিণত কর। মানুষের মাঝে সবচেয়ে বেশি ভদ্র হও। সবচেয়ে বেশি নম্র হও। ধার্মিকতা ও পবিত্রতায় অধিক এগিয়ে থাক। ক্রোধ ও হঠকারিতার মাত্রা একেবারে কমিয়ে দাও। ভালো লোকদের সাহচর্যে থাক। মন্দ লোকদের থেকে দূরে থাক। তাদের ধারেকাছেও যেও না। তাদের নিরাপদ মনে করো না। তাদের সান্নিধ্য ও সংস্পর্শ বর্জন কর। দুনিয়ালোভীদের সঙ্গে বসো না। হীন ও নীচ প্রকৃতির মানুষের সঙ্গে মিশবে না। কারণ নির্বোধদের স্বভাব ও দোষ সংক্রমিত হয়।
সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি সে, যাকে লোকেরা মন্দ মনে করলে সে তাতে পরোয়া করে না। যে মহৎ চরিত্র ও বিষয়কে ভালোবাসে সে হারাম কাজ থেকে বিরত থাকে। তোমার দৃষ্টিকে লাগামহীন ছেড়ে দিও না। মানুষের দিকে তোমার দৃষ্টিকে প্রখর করো না। চোখ হলো শয়তানের ফাঁদ। যে চোখকে লাগামহীন ছেড়ে দিয়েছে সে মৃত্যুমুখে পড়ে গিয়েছে। সন্দেহের ক্ষেত্র ও অভিযোগের সম্ভাব্য জায়গাগুলো থেকে সতর্ক থাক। নিজের জন্য অজুহাত পেশ করো না, অন্যের অজুহাত গ্রহণ কর। যার অজুহাত বেড়ে যায় তার লজ্জা হ্রাস পায়। ভাগ্যবান সে যে অন্যের জীবন ও অভিজ্ঞতা থেকে উপদেশ, শিক্ষা ও বিচার গ্রহণ করে।
এমন বিদ্রƒপ ও উপহাস বর্জন কর, যা ঘৃণা সৃষ্টি করে ও শ্রদ্ধা নষ্ট করে দেয়। সম্মান পোশাকে নয়, বরং জ্ঞান, ভদ্রতা ও ধার্মিকতায়। জিহ্বা মানুষের মন্ত্রীর মতো, যদি বলার মতো সঠিক কথা না পাও; তবে ভুল না বলে তোমার চুপ থাকাটাই ঠিক হবে। এমন হয়ো না যে, অন্যকে দোষ দেয় বা যার দোষ ধরা হয়, যে বেশি বেশি গালি দেয়, সঙ্গীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দেয়। যে দোষ অদৃশ্যের জ্ঞানের অধিকারী আল্লাহ গোপন রাখে, সেটা প্রকাশ করো না। কোনো অবস্থাতেই অলসদের সঙ্গে মিশবে না। অনেক ভালো মানুষ অন্যের নষ্টামিতে নষ্ট হয়ে যায়।
নতুন প্রজন্মকে সুন্দর সুন্দর আচরণ ও ভদ্রতার শিক্ষায় গঠন করা অভিভাবক ও পিতাদের দায়িত্ব। এক মনীষী বলেছেন, ‘শিশুদের শিষ্টাচার শিক্ষা দিতে দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণ কর তাদের কাজকর্মের ব্যস্ততা বৃদ্ধি ও মনের বিক্ষিপ্ততা সৃষ্টির আগেই।’
হে শিক্ষার্থীরা, উপযুক্ত ও যথার্থ জ্ঞানার্জনের দিকে ভালো করে ছুটে চল। বিরক্তি, ক্লান্তি, বিষাদ, ব্যর্থতা ও হাল ছাড়ার মনোভাব ত্যাগ কর। জ্ঞান অন্বেষণ কর। যে জ্ঞান অর্জন করে জ্ঞান তাকে ছোটবেলায় সঠিকভাবে গড়ে তোলে আর বড় হলে তাকে অগ্রগামী করে। উরওয়া ইবনে জুবায়ের (রহ.) বলেন, ‘হে বৎসরা, তোমরা জ্ঞান অর্জন কর। ছোট থাকতে তোমাদের প্রয়োজন না হলেও আশা করা যায় বড় হলে তোমাদের ছাড়া চলবে না।’
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি আগ্রহী ও যতœশীল হও। বিদ্যালয়গুলো হলো রোপণস্থল। যে পাঠ থেকে বঞ্চিত সে বৃক্ষ থেকে বঞ্চিত। বইয়ের দিকে দীর্ঘ দৃষ্টি দাও। অধ্যয়নে ও গবেষণায়, পাঠে ও লেখায়, পাঠপর্যালোচনা ও পড়া শেখায় বিরক্তি প্রকাশ করো না। ইবনুল জাওযি (রহ.) বলেন, ‘যদি আমি বলতাম আমি বিশ হাজার বই অধ্যয়ন করেছি, তাহলে তা বেশি হতো, তারপরও আমি অধ্যয়নের মধ্যেই থাকতাম।’
বইখাতা, কালিকলম, রোলারের মধ্যে মনোযোগ ও গুরুত্বসহকারে নিবিষ্ট থাক তোমাদের উদ্দীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা পর্যন্ত। এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমি চল্লিশ বছর আমার বুকের ওপর বই রেখে দুপুরের বিশ্রাম করেছি, রাতযাপন করেছি ও হেলান দিয়েছি।’ ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) কে প্রশ্ন করা হয়, আপনি আর কত ইলম অর্জন করবেন? তিনি বললেন, ‘দোয়াত-কলমের সময় থেকে কবর পর্যন্ত।’
তোমরা ধীরতা, স্থিরতা ও দৃঢ়তা অবলম্বন কর। চলার পথে তাড়াহুড়ো করো না। অস্থিরতা, চপলতা ও অমনোযোগিতা ত্যাগ করবে, নইলে তা অনিষ্ট বয়ে আনবে, আফসোস ও অনুতাপে ফেলে দেবে।
যে পথে চলার সময় মোবাইল ব্যবহার করে সে নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে। অন্যকেও বিপদের সম্মুখীন করে। মোবাইল তখন বিবেকবুদ্ধি লোপ করে দেয়। মনোযোগ ও উপস্থিতি কেড়ে নেয়। চলার পথে যে মোবাইলে গানবাজনা, ভিডিও ও চ্যাটিংয়ে চোখকান ব্যস্ত রাখে সে অপরাধ করে বসল।
শিক্ষকের মর্যাদা দেওয়া, শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও তার সামনে নম্র আচরণ করা আবশ্যক। তার জ্ঞানের অবদান স্বীকার করা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা উন্নত চরিত্রের বিষয়। শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে সহপাঠীদের সঙ্গে ভদ্র আচরণ করবে। এতে জ্ঞানের ও জ্ঞানীর মর্যাদা প্রকাশ পায়। ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বলেন, ‘তোমরা জ্ঞান অর্জন কর এবং তা মানুষকে শিক্ষা দাও। জ্ঞানের জন্য তোমরা ভাবগাম্ভীর্য ও শান্ত মনোভাব শিখবে। যাদের কাছে জ্ঞান শিখবে ও যাদের তা শেখাবে তাদের জন্য তোমরা নম্রতা বজায় রাখ। তোমরা পীড়ক ও কঠোর জ্ঞানী হয়ো না।’
শিক্ষক হলেন আমাদের বড়দের অন্তর্ভুক্ত। আর বড়দের সম্মান করা সুন্নাহর বর্ণিত নীতি। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘যে আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না ও আমাদের বড়দের শ্রদ্ধা করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (ইমাম বোখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ)। 
কবি বলেন, ‘শিক্ষকের জন্য দাঁড়িয়ে যাও এবং তাকে পূর্ণ সম্মান দাও। শিক্ষক তো রাসুল হওয়ার উপক্রম।’ হে পূতপবিত্র আল্লাহ, আপনিই শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, প্রথম প্রজন্মকে কলমের মাধ্যমে আপনি শিক্ষাদান করেছেন।


২৯ জিলহজ ১৪৪০ হিজরি মসজিদে নববির জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর করেছেন মাহমুদুল হাসান জুনাইদ