আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১২-০৯-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

ব্লু-ইকোনমি হতে পারে ভবিষ্যৎ অর্থনীতির চালিকাশক্তি

| সম্পাদকীয়
  • কিছুটা হলেও আনন্দের সংবাদ যে, সমুদ্রের জৈব সম্পদ সংরক্ষণে বাংলাদেশ সরকার মৎস্য আহরণের সবধরনের ক্ষতিকারক পদ্ধতি ও উপায়কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। সমুদ্রে সংঘটিত অন্যান্য অপরাধ দমনেও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে সমুদ্র ও মহাসমুদ্রকে চোরাচালান ও মানব পাচারের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বিশ্ব নেতাদের বিষয়টিতে আরও গুরুত্ব প্রদান করতে হবে

ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের ব্লু-ইকোনমি বিষয়ক মন্ত্রীপর্যায়ের দুই দিনব্যাপী সম্মেলন শেষ হলো ঢাকায়। সম্মেলনে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সমুদ্র সম্পদ উন্নয়নে ১৭ দফা ঢাকা ঘোষণা গ্রহণ করা হয়, যা সম্মেলন শেষে ৫ সেপ্টেম্বর ‘ঢাকা ঘোষণা’ নামে উপস্থাপন করা হয়। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় সমুদ্র ও মহাসমুদ্রের সম্পদ যথাযথভাবে আহরণ এবং ব্যবহার সমুদ্র-সংশ্লিষ্ট দেশসহ গোটা পৃথিবীর অর্থনৈতিক উন্নয়নে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশ ও তেল পরিবহনের ৬০ শতাংশই এ সাগর-মহাসাগর দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে। গেল ১৫ বছরে সমুদ্র বাণিজ্যের পরিমাণ ৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ২০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। সমুদ্র ও মহাসমুদ্রের সম্পদ আহরণ করে আমরা আমাদের দারিদ্র্য দূরীকরণ ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারি। সংক্ষেপে বিষয়টিকে আমরা ‘ব্লু-ইকোনমি’ বলে থাকি। এ ব্লু-ইকোনমি হতে যাচ্ছে আগামী পৃৃথিবীর অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি। 
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও রিম অ্যাসোসিয়েশন (আইওরা) দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলেনের আয়োজন করে। আইওআরএর সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে সমুদ্রের তলদেশের অনাবিষ্কৃত সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে এ অঞ্চলে একটি অভিন্ন টেকসই সুনীল অর্থনৈতিক বেষ্টনী গড়ে তোলার আহ্বান জানান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। সমুদ্রের তলদেশের সম্পদ চিহ্নিত করে এ অঞ্চলে যার যার টেকসই উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করার সুযোগ রয়েছে। সমুদ্র সম্পদ ব্যবহার করে দারিদ্র্যবিমোচন, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাসহ বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার সুযোগ রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বৈশ্বিক উষ্ণায়ন উদ্ভিদ ও প্রাণিজগৎকে বিপদগ্রস্ত করে তুলছে, আর মানবজাতিক ভয়বাহ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা জানি, সাগর ও মহাসাগরগুলো মানবসৃষ্ট গ্রিনহাইসের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং বৈষ্ণিক উষ্ণায়নের ফলে সৃষ্ট অতিরিক্ত তাপের প্রায় ৯০ শতাংশ শোষণ করে থাকে। আর এভাবেই সমুদ্র ও মহাসমুদ্রগুলো পরিবেশ রক্ষায় আমাদের প্রত্যক্ষভাবে অবদান রেখে চলেছে। সমুদ্র বাস্তু ধ্বংস হলে মানবজাতিও নিঃসন্দেহে অস্তিত্বের হুমকির মুখে পড়বে। তাই শুধু সমুদ্র সম্পদ আহরণ ও ব্যবহার নয়, সমুদ্র ও মহাসমুদ্র দূষণ করা থেকেও মানবজাতিকে গ্রহণ করতে হবে বাস্তবমুখী ও প্রকৃত পরিবেশবান্ধব পদক্ষেপ। 
মানবজাতি প্রতিনিয়তই কারণে-অকারণে, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে পৃথিবীর পরিবেশকে দূষণ করে চলেছে, দূষণ করছে নদী ও সমুদ্রের পানিও। এসব কারণে আমাদের সাগর আজ ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন। সাগর ও মহাসাগর থেকে মাত্রাতিরিক্ত সম্পদ আহরণ করা হচ্ছে, দূষণ করা হচ্ছে পরিবেশ, প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে শুধু স্থলভাগ নয় জলভাগ, সমুদ্র ও সহাসমুদ্র পর্যন্ত মারাত্মকভাবে দূষণ করে চলেছি আমরা। সমুদ্রের বিশাল বিশাল প্রাণী, মাছ পর্যন্ত এ প্লাস্টিকের দূষণের কারণে মারা যাচ্ছে। মৃত মাছের পেটে পাওয়া যাচ্ছে টনে টনে পলিথিন। শব্দদূষণ শুধু শহর গ্রাম নয়, গভীর সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে সাগর ও মহাসাগরের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে, সুনামি ও সাইক্লোনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত হচ্ছে বিভিন্ন দেশ। আর সমুদ্র উপকূলবর্তী দেশগুলোতে সর্বদাই নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ছে। 
কিছুটা হলেও আনন্দের সংবাদ যে, সমুদ্রের জৈব সম্পদ সংরক্ষণে বাংলাদেশ সরকার মৎস্য আহরণের সবধরনের ক্ষতিকারক পদ্ধতি ও উপায়কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। সমুদ্রে সংঘটিত অন্যান্য অপরাধ দমনেও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে সমুদ্র ও মহাসমুদ্রকে চোরাচালান ও মানব পাচারের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বিশ্ব নেতাদের বিষয়টিতে আরও গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। ১৯৭৪ সালে সর্বপ্রথম সমুদ্র অঞ্চলের সীমা নির্ধারণ, সমুদ্রসীমানায় বিভিন্ন কর্মকা- পরিচালনা ও সমুদ্র সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণের জন্য ‘দি টেরিটরিয়াল ওয়াটার্স অ্যান্ড মেরিটাইম জোন অ্যাক্ট-১৯৭৪’ প্রণয়নের করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বর্তমান সরকারও এ বিষয়ে গুরুত্ব প্রদান করছে। সরকার বছরের ছয় মাস মা ইলিশ ও মাছের পোনা আহরণ বন্ধ রাখে এবং সমুদ্রের নির্দিষ্ট অঞ্চলে বছরে ৬৫ দিন সবধরনের মৎস্য আহরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে রাখে। এর ফলও আমরা ভোগ করছি। ২০১৭ সালে জাকার্তায় আইওআরএ লিডার্স সামিটের প্রসঙ্গ টেনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সেখানে আমরা আইওআরএর নেতৃত্বে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সমুদ্র অর্থনীতির উন্নয়নে কাজ করার এবং সমুদ্রযান চলাচলের স্বাধীনতায় সম্মান দেখানোর অঙ্গীকার করেছিলাম। সরকারের রূপকল্প-২০২১ বাস্তবায়ন শেষ পর্যায়ে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য রূপকল্প-২০৪১ প্রণয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ডেল্টা প্লান-২১০০ নামে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি।’
আইওআরএ ১৯৯৭ সালে ভারত মহাসাগর তীরবর্তী ২১ দেশ নিয়ে গঠিত হয়। সদস্য দেশগুলো হচ্ছেÑ বাংলাদেশ, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, কোমোরাস, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, কেনিয়া, মাদাগাস্কার, মালয়েশিয়া, মরিশাস, ওমান, মোজাম্বিক, সিঙ্গাপুর, সিশলস, সোমালিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলংকা, তানজানিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইয়েমেন। জাপান, জার্মানি, চীন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং মিসর আইওআরএর ডায়ালাগ পার্টনার। ১ অক্টোবর থেকে পরবর্তী দুই বছরের জন্য আইওরাএর সহ-সভাপতি ও তার পরের দুই বছর বাংলাদেশের সভাপতির দায়িত্ব পালনের সময় সবার সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী। এবারকার অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য, উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা, বিদেশি কূটনীতিক এবং ২২টি সদস্যরাষ্ট্রের সচিবসহ বিশেষজ্ঞরা ও আইওআরএর আটটি ডায়ালগ পার্টনার সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। সম্মিলিতভাবে সমুদ্র সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট-১৪ অর্জনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে পারি আমরা। সুনীল অর্থনীতির বিকাশ ও উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে এবং সবার কল্যাণ নিশ্চিত করতে আমাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। তবেই ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ৯ বিলিয়ন মানুষের জীবন ধারণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাবে।

মাছুম বিল্লাহ
শিক্ষা গবেষক ও বিশেষজ্ঞ
[email protected]