আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১২-০৯-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

৩৩ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন সূচক

পুঁজিবাজারে বাড়ছে আস্থাহীনতা

সাখাওয়াত হোসেন
| প্রথম পাতা

চলতি মাসের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত পুঁজিবাজারের প্রধান সূচক কমেছে ১০০ পয়েন্টের বেশি। এ পতনকে আরও জোড়ালো করেছে বুধবারের লেনদেন। এখন সূচক কমতে কমতে এসে ঠেকেছে দুই বছর নয় মাসের আগের অবস্থানে। বাজার সংশ্লিষ্টরা পুঁজিবাজারের এমন পতনকে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতাকে দায়ী করলেও বিনিয়োগকারীরা বলছেন, বাজারে সঠিক তদারকি না থাকায় ক্রমেই পতনের বৃত্তে আটকে যাচ্ছে পুঁজিবাজার। 
বুধবার লেনদেন শেষে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সপ্তাহের চতুর্থ দিনের মতো সূচকের পতন অব্যাহত ছিল। সূচকের টানা পতনে ডিএসই ফিরে গেছে দুই বছর নয় মাস আগের অবস্থানে। এমন অবস্থায় কমেছে লেনদেন হওয়া অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দর। ২০১৬ সালের ২০ ডিসেম্বর ডিএসই সূচকের অবস্থান ছিল ৪ হাজার ৩৯১ পয়েন্টে। বুধবার লেনদেন শেষে ৭৬ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৪ হাজার ৯৩৩ পয়েন্টে। 
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডিএসইতে ১ লাখ ৪১ হাজার ৮২৫ বারে ১২ কোটি ৮৩ লাখ ৬৩ হাজার ১২৬টি শেয়ার লেনদেন হয়েছে। লেনদেনে অংশ নিয়েছে ৩৫৩ কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ড। এর মধ্যে দর বেড়েছে ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ বা ৩৭টির; কমেছে ৮১ দশমিক ৫৯ শতাংশ বা ২৮৮টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ বা ২৮টির। ডিএসই প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৭৬ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৯৩৩ পয়েন্টে। ডিএসইএস বা শরিয়া সূচক ১৪ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৫৫ পয়েন্টে। আর ডিএস৩০ সূচক ২১ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৩৬ পয়েন্টে। অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ২৩৫ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৯৯৩ পয়েন্টে। এদিন সিএসইতে হাত বদল হওয়া ২৬১ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শেয়ার দর বেড়েছে ৩৬টির, কমেছে ২০৮টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ১৭টির দর। ১৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক প্রেসিডেন্ট মো. শাকিল রিজভী বলেন, পুঁজিবাজারের মন্দা থাকবেই। এটা স্বাভাবিক বিষয়। বর্তমানে যে মন্দা সেটি আগে যে হয়নি তা নয়। তবে এমন মন্দায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা রাখা উচিত যে, মন্দা সব সময় থাকবে না। সমস্যা হচ্ছে, পুঁজিবাজারে যেখন কোনো মন্দা চলমান থাকে তখন বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কে তাদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করে দেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে লোকসানেও শেয়ার বিক্রি করে বের হয়ে আসেন, যা পুঁজিবাজারের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর। 
তিনি বলেন, পুঁজিবাজারে আজ বিনিয়োগ করে শেয়ার বিক্রয়যোগ্য হলেই বিক্রি করে দিতে হবে এমন ধারণা নিয়ে বিনিয়োগ করা উচিত নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়েই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা উচিত। 
পুঁজিবাজারের এমন পতনে আতঙ্কিত ইউএফটিসির বিনিয়োগকারী গিয়াস উদ্দিন বলেন, পুঁজিবাজার ভালো থাকলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থাও বাড়ে। পুঁজিবাজারের পতন অব্যাহত হলেই বরং আতঙ্ক বেশি ছড়ায়। তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকেও পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা যেন নড়বড়ে না হয় সেদিকে নজর দেওয়া উচিত। দেড় মাস ধরে পুঁজিবাজারের থেমে থেকে বড় ধরনের পতন হচ্ছে তারপরও তা সমাধানে কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। মূলত নিয়ন্ত্রক সংস্থার যথাযথ উদ্যোগ না থাকাই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতা বাড়ছে। 
এদিকে বুধবার পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বেশি পতন হয়েছে ব্যাংকিং খাতের শেয়ারের। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকিং খাতের শেয়ারের প্রায় ৭২ শতাংশ শেয়ারের দরপতন হয়েছে। এদিন তালিকাভুক্ত ৩০ ব্যাংকের মধ্যে ছয়টি ব্যাংকের শেয়ারের দর অপরিবর্তিত ছিল। ব্যাংক এশিয়া ও যমুনা ব্যাংকের সর্বোচ্চ ২০ পয়সা করে শেয়ারের দর বাড়লেও বাকি সবকটি ব্যাংকের শেয়ারের দর কমেছে। 
লেনদেন হওয়া ব্যাংকের শেয়ারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাম কমেছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের। এদিন ব্যাংকটি ১ দশমিক ৬০ টাকা দর কমেছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৩০ টাকা কমেছে ট্রাস্ট ব্যাংকের এবং তৃতীয় সর্বোচ্চ দশমিক ৬০ টাকা করে শেয়ার দর কমেছে শাহজালাল ইসলামী ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের। এছাড়া ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ও পূবালী ব্যাংকের দশমিক ৫০ টাকা করে, ইস্টার্ন ও ঢাকা ব্যাংকের দশমিক ৪০ টাকা করে, ব্র্যাক, আইএফআইসি, মার্কেন্টাইল, সাউথইস্ট, প্রিমিয়ার ও রূপালী ব্যাংকের দশমিক ৩০ টাকা করে দাম কমেছে। সিটি ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, আইসিবি ইসলামিক, ইসলামী ও ওয়ান ব্যাংকের দশমিক ২০ টাকা করে এবং ন্যাশনাল ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের শেয়ার দর দশমিক ১০ টাকা করে কমেছে। 
ব্যাংকিং খাত ছাড়াও এদিন লেনদেন হওয়া সিমেন্ট খাতের সাত কোম্পানির মধ্যে মাত্র এক কোম্পানির শেয়ারের দর অপরিবর্তিত ছিল। বাকি ছয়টি কোম্পানির শেয়ারের দর কমেছে। প্রকৌশল খাতের ৩৯ কোম্পানির মধ্যে ছয়টি কোম্পানির শেয়ারের দর বেড়েছে। বাকি ৩৩ কোম্পানির শেয়ারের দর কমেছে। ননব্যাংক আর্থিক খাতের ২৩ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দর অপরিবর্তিত ছিল। দাম বেড়েছে একটি প্রতিষ্ঠানের। আর বাকি ২০ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দর কমেছে। ওষুধ খাতের ৩২ কোম্পানির মধ্যে ১০ কোম্পানির শেয়ারের দর বুধবার বেড়েছে। আর বাকি ২২ কোম্পানির শেয়ারের দর কমেছে। 
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সহ-সভাপতি আ ন ম আতাউল্লাহ নাঈম আলোকিত বাংলাদেশকে জানান, পুঁজিবাজারে মূলত বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঠিক সময়ে পদক্ষেপের অভাবে। দেখা গেছে ক্রমাগত ১০ দিন সূচকের পতন হয়েছে। বেশিরভাগ কোম্পানির দর কমেছে। কিন্তু তারপরও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এতে পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। 
তিনি বলেন, বাজারে তারল্য সমস্যা আছে। এটি দীর্ঘ সময় ধরেই বাজার বিশ্লেষকসহ আমরা বলে আসছি। কিন্তু বাস্তবে বাজারে তারল্য বাড়ানোর জন্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। সময় সময় বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব সুযোগ সুবিধা ব্যাংক ও নন ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দিয়েছে সেগুলো বাস্তবে পুঁজিবাজারের জন্য কোনো কাজে আসেনি।