আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৮-০৯-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

অস্থির পেঁয়াজের বাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম ব্যুরো ও বেনাপোল প্রতিনিধি
| প্রথম পাতা

রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে মঙ্গলবার পেঁয়াজ বিক্রি করে টিসিবি। পল্টনের ছবি- আলোকিত বাংলাদেশ

  • ৪৫ টাকায় পেঁয়াজ বিক্রি করছে টিসিবি
  • ভারতের রপ্তানি মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব বেনাপোল বন্দরে

দেড় মাস ধরে নিত্যদিনের অন্যতম ভোগ্যপণ্য পেঁয়াজের বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। নানা অজুহাতে দফায় দফায় বেড়েই চলেছে পেঁয়াজের দাম। চলছে নৈরাজ্য। এ পরিস্থিতিতে অসহায় ক্রেতা। চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে ক্রেতাদের ১ কেজি দেশি পেঁয়াজের জন্য গুনতে হচ্ছে ৭০ টাকা। আমদানি করা পেঁয়াজের জন্য সাধারণ ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ৬৫ থেকে ৭০ টাকা। মাত্র চার দিন আগেও খুচরা বাজারে যে পেঁয়াজ ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, ওই পেঁয়াজ বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৭০ টাকা দরে। দেড় মাস আগেও পেঁয়াজের দাম ছিল খুচরায় ২০ থেকে ২৫ টাকা। পেঁয়াজের এ দাম বৃদ্ধিকে খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতারা আমদানি পর্যায়ে দাম বৃদ্ধিকে দায়ী করছেন।
আমদানিকারকরা বলছেন, ভারত সরকার আমদানি মূল্যবৃদ্ধি করে দেওয়ায় দেশে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। মাত্র তিন থেকে চার দিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধিতে ক্ষুব্দ সাধারণ ক্রেতারা। মোমিন রোডের শরীফ স্টোরে পেঁয়াজ ক্রয় করেন আবদুর রহমান। তিনি বলেন, ২৫ টাকার পেঁয়াজ ৬৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে। পেঁয়াজের দাম বাড়ছে ঠিকই কিন্তু আমাদের তো আয় রোজগার বাড়ছে না। রিয়াজুদ্দিন বাজার থেকে প্রতি সপ্তাহে ২ কেজি করে পেঁয়াজ ক্রয় করতেন রিকশাচালক হাবিব। তিনি মঙ্গলবার পেঁয়াজ কিনলেন আধা কেজি। জানতে চাইলে বলেন, আগে ২ কেজি পেঁয়াজ কিনতাম ৫০ টাকা দিয়ে। এখন ১ কেজির দাম ৭০ টাকা। আমরা এত টাকা কই পাব? এ অবস্থায় পেঁয়াজের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সরকারের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি উঠেছে। 
প্রশাসন বলছে, কয়েক দিনের মধ্যে পেঁয়াজের দাম সহনীয় পর্যায়ে না এলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি হিসাবে দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা ২৩ লাখ টন। এ চাহিদা পূরণ না হওয়ার ১০ লাখ টনের বেশি পেঁয়াজ অন্য দেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আমদানি করা পেঁয়াজের ৯০ শতাংশ আসে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে। জান যায়, সম্প্রতি অর্থনৈতিকভাবে লাগাম টানতে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি করেছে ভারত সরকার। 
আমদানিকারকরা জানান, রপ্তানিকে নিরুৎসাহিত করতে ভারত সরকার প্রতি টন পেঁয়াজের ন্যূনতম বুকিং রেট ৮৫০ ডলার নির্ধারণ করে দিয়েছে, যা আগে ছিল সর্বোচ্চ ৩০০ ডলার। ভারতের বাজারে বর্তমানে কেজিপ্রতি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৩২ থেকে ৩৩ রুপিতে। মহারাষ্ট্র ও নাসিক রাজ্যে বন্যার কারণে পেঁয়াজের ফলন ব্যাহত হয়। ফলে ভারতের বাজারেও দাম বেড়ে যায়। মূলত রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের জন্য তারা রপ্তানি মূল্য বাড়িয়ে দেয়। 
দেশের সবচে বড় ভোগ্যপণ্যের বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সকাল-বিকাল পেঁয়াজের দাম ওঠা-নামা করছে। পেঁয়াজের দাম নিয়ে অস্থির ব্যবসায়ীরা। খাতুনগঞ্জের পাইকারি আড়তদার মেসার্স হাজী স্টোরের মালিক মো. জাবেদ ইকবাল বলেন, বাংলাদেশের পেঁয়াজের বাজার ভারতনির্ভর। ভারতে হঠাৎ পেঁয়াজের বুকিং রেট বাড়িয়ে দেওয়াতে এখন স্থলবন্দর নিয়ে পেঁয়াজ আমদানি একবারে কমিয়ে দিয়েছেন আমদানিকারকরা। এ সুযোগে সিন্ডিকেট চক্র মজুত থাকা পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, মঙ্গলবার হিলি বন্দরে ৪৬ থেকে ৪৭ টাকা পাইকারি দরে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে। খাতুনগঞ্জে পাইকারি বাজারে ভারতীয় নাসিক পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৫২ টাকা, মিয়ানমারের পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৪৪ টাকা। আজমীর স্টোরের ম্যানেজার বাবুল বলেন, ভারতীয় সাউথ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকায়। দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৫৮ টাকায়। খাতুনগঞ্জের আড়তদাররা জানান, ৪ দিন ধরে বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ কমে গেছে। পেঁয়াজের দাম আরও বাড়তে পারে বলে তারা আশঙ্কা করেছেন। তবে বাজারে মিয়ানমারের পেঁয়াজ প্রবেশ করাতে কিছুটা স্থিতিশীল থাকতে পারে বলে অভিমত অনেক আড়তদারের। 
খাতুনগঞ্জের পেঁয়াজের বড় মার্কেট হামিদ উল্লাহ মিয়া বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, কাঁচা মালের বাজারটা এমন হয়ে থাকে, পর্যাপ্ত মালামাল থাকলে দাম স্থিতিশীল থাকে। যখন সংকট দেখা দেয় তখন দামটাও বেড়ে যায়। 
পেঁয়াজের দাম ২৫ থেকে ৭০ টাকা কীভাবে : এদিকে সোমবার চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অনুষ্ঠিত বিভাগীয় কমিটির মাসিক সভায় চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল মান্নান ব্যবসায়ীদের প্রতি প্রশ্ন রেখে বলেন, কেজিপ্রতি পেঁয়াজের দাম হঠাৎ করে ২৫ থেকে ৭০ টাকা কীভাবে হলো? কয়েক দিনের মধ্যে পেঁয়াজের দাম সহনীয় পর্যায়ে না আনলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বাজারে অভিযান চালানোর হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি। মো. আবদুল মান্নান বলেন, ভারতের কয়েকটি জায়গায় বন্যা হলেও এখানে পেঁয়াজের দাম বাড়ার কথা নয়। কিন্তু সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও মজুতদার পেঁয়াজের দাম হঠাৎ করে বাড়িয়েছেন। তিনি বলেন, কয়েক দিনের মধ্যে পেঁয়াজের দাম সহনীয় পর্যায়ে না আনলে মজুতদারদের চিহ্নিত করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন এসব কিছু তদারকি করবে।
৪৫ টাকায় পেঁয়াজ বিক্রি করছে টিসিবি : গেল এক সপ্তাহের ব্যবধানে নিত্য ভোগ্যপণ্য পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় খোলাবাজারে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করেছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। মঙ্গলবার রাজধানীর পাঁচটি স্থানে ৪৫ টাকা দরে ট্রাকে পেঁয়াজ বিক্রি করেছে সংস্থাটি। 
টিসিবির তথ্য কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির জানান, সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ট্রাকে রাজধানীর পাঁচটি স্থানে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি করা হচ্ছে। একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ দুই কেজি করে পেঁয়াজ ক্রয় করতে পারছে। প্রতিটি ট্রাকে প্রায় এক হাজার কেজি পেঁয়াজ দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে রাজধানীর আরও কয়েকটি স্থানে বিক্রির কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। এ অবস্থায় বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে তুরস্ক, মিশর, মিয়ানমার এ তিনটি দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। 
রাজধানীতে পাঁচটি স্থানে খোলাবাজারে পেঁয়াজ বিক্রির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে, দিলকুশার বক চত্বর, খামারবাড়ি, মোহাম্মদপুর ও মিরপুর। এর আগে রোববার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির সভাপতিত্বে খোলাবাজারে পেঁয়াজ বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরই মধ্যে পেঁয়াজ আমদানির ক্ষেত্রে এলসি মার্জিন ও সুদের হার কমাতে বাংলাদেশের ব্যাংকে চিঠি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এছাড়া বন্দরে আমদানি করা পেঁয়াজ দ্রুত খালাস করা ও নির্বিঘœ পরিবহন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর কাছেও চিঠি দেওয়া হয়েছে।
ভারতের রপ্তানি মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব বেনাপোল বন্দরে : ভারতীয় কৃষিপণ্য মূল্য নির্ধারণকারী সংস্থা ‘ন্যাপেড’ শুক্রবার (১৩ সেপ্টেম্বর) থেকে হঠাৎ করে পেঁয়াজের রপ্তানি মূল্য বাড়িয়ে ৮৫২ ডলার নির্ধারণ করায় এর প্রভাব পড়েছে বেনাপোল বন্দরে। বর্তমানে প্রতি কেজি পেঁয়াজ আমদানিতে খরচ পড়ছে ৫২ থেকে ৫৩ টাকা। আর পাইকারি বাজারে সেটা বিক্রি হচ্ছে ৫৪ থেকে ৫৫ টাকা দরে। আর খুচরা বাজারে ওই পেঁয়াজ ৫৭ থেকে ৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বেনাপোল বন্দর দিয়ে দুয়েকটি ট্রাক পেঁয়াজ বন্দরে এলেও সেগুলো আগের এলসির পেঁয়াজ। এত দিন প্রতি মেট্রিক টন পেঁয়াজ ৩০০ থেকে ৪১০ ডলারে আমদানি করা হলেও এখন থেকে ৮৫২ ডলারে ব্যবসায়ীদের আমদানি করতে হবে। আগের এলসিগুলো পুনরায় সংশোধন করে এখন পেঁয়াজ আমদানি করতে হচ্ছে। 
এদিকে ভারত সরকার পেঁয়াজের রপ্তানি মূল্য বাড়িয়ে দেওয়ায় দেশের খোলাবাজারে পেঁয়াজের দাম তিন দিনের ব্যবধানে কেজিতে বেড়েছে প্রায় ১০ টাকা। ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতি মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে ৪১০ ডলারে। ওই সময় কেজিপ্রতি পেঁয়াজের দাম ছিল ৪০ থেকে ৪২ টাকা। ভারতের স্থানীয় বাজারে পেঁয়াজ সংকট থাকায় বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করতেই পেঁয়াজ আমদানিতে মূল্য দ্বিগুণ করা হয়েছে বলে দাবি করছেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। তবে বাংলদেশি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পেঁয়াজ মৌসুমে প্রতিবারেই ভারত এ কাজ করে থাকে। শুধু পেঁয়াজ না প্রতিটি খাদ্যদ্রব্যে এ কাজটি করে ভারত।
বেনাপোলের বন্দরের আমদানিকারক খুলনার হামিদ এন্টারপ্রাইজের জনি ইসলাম জানান, ভারতের বন্যা ও বৃষ্টির কারণে এক মাসের ব্যবধানে ভারতে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সময় পেঁয়াজ রপ্তানিতে কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকায় ভারতের বাজারে পেঁয়াজের মূল্য আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন বাজারে পেঁয়াজের মূল্য সহনশীল রাখতেই ভারত সরকারের কৃষিপণ্য মূল্য নির্ধারণকারী সংস্থা ‘ন্যাপেড’ রপ্তানিমূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি আরও জানান, ১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লি থেকে পেট্রাপোল কাস্টমসে পাঠানো ফ্যাক্স বার্তায় পেঁয়াজের রপ্তানিমূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি জানানো হয়। সেখানে বলা ছিল, এখন থেকে পেঁয়াজের কোনো চালান দেশের বাইরে রপ্তানি করতে হলে বর্তমানে নির্ধারণ করা ৮৫৫ ডলারে কার্যকর হবে। আগের কোনো এলসি থাকলে সেগুলোও বাড়তি মূল্যে সংশোধন করতে হবে। 
বেনাপোল কাস্টম হাউজের সহকারী কমিশনার উত্তম চাকমা জানান বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে প্রতিদিন প্রায় ৭০ থেকে ৮০ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানি হয়। বাজার সহনশীল রাখতে ও পেঁয়াজের আমদানি গতিশীল করতে কাস্টম হাউজ ২৪ ঘণ্টা খোলা আছে। যেহেতু পেঁয়াজের কোনো শুল্ক নেই, সে কারণে আমদানিকারকরা যে মূল্য ঘোষণা দিচ্ছে আমরা সে মূল্যে শুল্কায়ন করে দিচ্ছি। ১৫ দিনে ভারত থেকে বেনাপোল বন্দর দিয়ে প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে।