আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৮-০৯-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

চমক থাকবে আ.লীগের এবারের কাউন্সিলেও

দীপক দেব
| প্রথম পাতা
  • প্রার্থী হবেন না ওবায়দুল কাদের
  • পরিবর্তন আসতে পারে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক পদে
  • বিতর্কিত ও সিদ্ধান্ত অমান্যকারীদের পদে নয়
  • শোকজের প্রতিফলন ঘটবে কাউন্সিলগুলোয় 

দেশের অন্যতম প্রাচীন ও সবচেয়ে বেশিবার রাষ্ট্র পরিচালনাকারী দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় কাউন্সিল ২০ ও ২১ ডিসেম্বর। দলটির কাউন্সিল ঘিরে বরাবরই আগ্রহের কমতি থাকে না দেশবাসীর। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। দিন ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাউন্সিলকেন্দ্রিক নানা ধরনের আলোচনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। বরাবরই কাউন্সিলের মাধ্যমে চমক দেখিয়ে নজির সৃষ্টি করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এবার শুধু চমক নয়, এর পাশাপাশি দলের মধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারেÑ এমনটা মনে করছেন আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা। সাম্প্রতিক সময়ে সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে দলীয় সভানেত্রীর কঠোর মনোভাবের কারণে অনেকে মনে করছেন, এবার শুধু জেলা উপজেলা নয়, কেন্দ্রীয় কমিটিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। 
আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ট একটি সূত্র বলেছে, নেত্রী সময়ের আগে কোনো কিছুই করেন না। যথাসময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে তার নেতৃত্ব আজ বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হচ্ছে। আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয় দফায় রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা করছে। নেত্রী গেল নির্বাচনের আগে বিশেষ করে বিভাগ ওয়ারি বর্ধিত সভায় স্পষ্টভাবেই দলের নেতাকর্মী ও দলীয় সংসদ সদস্যদের বেশকিছু বার্তা দিয়েছিলেন। দলের ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে সবাইকে নিয়ে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এরপর উপজেলা নির্বাচনের সময়ও নানাভাবে কথাগুলো আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। বিশেষ করে বিদ্রোহী প্রার্থী, দলীয় এমপি, মন্ত্রী, কেন্দ্রীয় নেতা সবাইকে সাবধান করেছেন। স্পষ্টভাবেই বলেছিলেনÑ যারা নৌকার বিরোধিতা করবেন, ভবিষ্যতে তাদের আর নৌকা দেওয়া হবে না। এমনকি দলের দায়িত্বশীল পদে থেকে দলের বিরুদ্ধে গেলেও পদে রাখা হবে না। এ প্রক্রিয়া নেত্রী শুরু করে দিয়েছেন। এরই মধ্যে বিদ্রোহীদের শোকজ নোটিশ পাঠানো হয়েছে। সামনে তৃণমূলের যে সম্মলন শুরু হতে যাচ্ছে, তাতে এসব অভিযুক্তরা কেউ পদ পাবেন না। এ প্রক্রিয়া কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের ক্ষেত্রেও দেখা যাবে। কারণ, অনেক কেন্দ্রীয় নেতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের মদত দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাই নেত্রী এবার দলের মধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। কারণ তিনি আগেই সবাইকে সতর্ক করেছেন। 
এদিকে আওয়ামী লীগের আগামী কাউন্সিলে প্রার্থী হবেন না বলে জানিয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, দলের আসন্ন জাতীয় কাউন্সিলে তিনি প্রার্থী হবেন না, তবে দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি চান, তা হলে তিনি ফের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নিতে রাজি আছেন। মঙ্গলবার সচিবালয়ে ফের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেবেন কি নাÑ সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, দ্বিতীয়বার পার্টির সাধারণ সম্পাদক থাকব কি না, তা নেত্রীর (শেখ হাসিনা) সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। আমি নিজে প্রার্থী হব না। নেত্রী চাইলে আবার দায়িত্ব দেবেন, না চাইলে অন্য কাউকে দায়িত্ব দেবেন। পার্সোনালি আমি কোনো প্রার্থিতা ঘোষণা করব না। নেত্রী যাকে ইচ্ছা দেবেন। আমাকে যদি তিনি থাকতে বলেন, সেটা তিনি বলতে পারেন। 
আওয়ামী লীগের সম্মেলন, সভাপতি অপরিবর্তিত এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আপনার নাম শোনা যাচ্ছে। আরও কয়েকজনের নামও আসছেÑ এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ওবায়দুল কাদের বলেন, আমাদের পার্টিতে আমাদের সভাপতি পার্টির সুপ্রিমও শেখ হাসিনা। আমাদের পার্টিতে বার বার যেটা হয়, দলের কাউন্সিলরা সবসময় নেতৃত্ব নির্বাচনে নেত্রীর মনোভাবের ওপর সবকিছু ছেড়ে দেন। জেনারেল সেক্রেটারি পদটি পার্টির সুপ্রিমওর নির্দেশনায় চলে। এখানে প্রার্থী হওয়ার অধিকার সবার আছে। তিনি বলেন, নেত্রীর ইচ্ছার বাইরে আসলে কিছু হয় না। নেত্রী জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে যাকেই চয়েজ করেন আওয়ামী লীগের কর্মী-কাউন্সিলররা তার প্রতি ঝুঁকে পড়েন। আমি ভাগ্যবান মানুষ; আমি আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারি হয়েছি। অনেক কর্মী আজীবন ত্যাগ করেও এ পদ পাননি। একবার হয়েছি এটাই বিরাট সম্মানের ব্যাপার।
আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, আগামী কাউন্সিলে দলের মধ্যে পরিবর্তনের কথা অনেক দিন আগে থেকেই ভেতরে ভেতরে আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে নেত্রীর মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ্যের পর বিষয়টি অনেকের কাছেই পরিষ্কার হয়ে যায়। প্রকাশ্যে এসব নিয়ে কেউ কিছু বলতে না চাইলেও নাম প্রকাশ না করা শর্তে প্রেসিডিয়ামের এক সদস্য বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পর কেন্দ্রীয় কমিটির বেশ কিছু দায়িত্বশীল নেতার কর্মকা-ে নেত্রী (শেখ হাসিনা) বিরক্ত। বিশেষ করে বিদ্রোহী দমনে ব্যর্থতা বা তাদের পেছন থেকে ইন্ধন দেওয়ার বিষয়গুলো নেত্রী বহু আগে থেকেই জানতে পেরেছেন। এজন্য বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পদেও পরিবর্তন আনা হতে পারে। কাউন্সিলের অন্যতম আকর্ষণ সাধারণ সম্পাদক পদে এরই মধ্যে বেশ কয়েকজনের নাম ওঠে এসেছে। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এরই মধ্যে প্রেসিডিয়ামের একজন যিনি আবার মন্ত্রিসভার সদস্য, দুইজন যুগ্ম সম্পাদক, একজন সাংগঠনিক ও একজন সম্পাদক-লীর সদস্য যারা বর্তমান মন্ত্রিসভায় রয়েছেন তাদের নিয়ে এরই মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। যদিও শেষ পর্যন্ত কে সাধারণ সম্পাদক হবেন, তা পুরোপুরি নির্ভর করছে আওয়ামী লীগ সভাপতিও ওপর।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, আওয়ামী লীগের কাউন্সিল হওয়াটাই একটা চমক। প্রথমে শুনছিলাম বঙ্গবন্ধুর শতবার্ষিকীর অনুষ্ঠান উদযাপনের পর দলের কাউন্সিল হবে। কিন্তু নেত্রী সবাইকে অবাক করে দিয়ে যথাসময়ে কাউন্সিল করার ঘোষণা দিয়েছেন। নেত্রী প্রতিবারই কাউন্সিলের মাধ্যমে চমক দেখান, এবারও একটা না একটা চমক দেখাবেন। কী ধরনের পরিবর্তন আনতে পারেÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনই এত কিছু পরিষ্কার করে বলা ঠিক হবে না। তবে এটুকু বলি নবীন-প্রবীণের সমন্বয়েই কমিটি হবে। নতুনদের জন্য পুরোনোদের জায়গা করে দিতে হবেÑ এটাই স্বাভাবিক। নেতৃত্ব তৈরি না করলে কী হয়, সেটা আজকের বিএনপিকে দেখে বোঝা যায়। শোকজের প্রভাব আগামী কাউন্সিলগুলোয় পড়বে বলেও মন্তব্য করেন আওয়ামী লীগের এ প্রভাবশালী নেতা।  
এদিকে আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একাধিক নেতা জানান, নেত্রী সংগঠন নিয়ে যে কঠোর মনোভার ব্যক্ত করেছেন, তার প্রথম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ভাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে অপসারণ করার মাধ্যমে। এর মধ্যদিয়ে তিনি সবার কাছে একটি বার্তা দিয়েছেন। আগামী ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, পৌরসভা কমিটি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সেখানেও নেতৃত্বে পরিতর্নের বিষয়টি প্রকাশ পাবে। আর এ পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় কেন্দ্রীয় কমিটিতেও এর প্রভাব দেখা যাবে বলেও মনে করা হচ্ছে।
দলের একটি দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, শিগগিরই তৃণমূলের সম্মেলন করতে কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়ের টিমগুলো মাঠে নামবে বলে জানা গেছে। এবার তৃণমূলের সম্মেলনের মাধ্যমে যোগ্য শিক্ষিত ও মেধাবী তরুণ প্রজন্ম, পারিবারিকভাবে ঐতিহ্যবাহী ও আওয়ামী রাজনীতিতে যুক্তÑ এমন নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিশেষ করে এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের আওয়ামী লীগের প্রতি আগ্রহ ও আস্থা রাখার জন্য ও দলকে আধুনিকতার সঙ্গে সমন্বয় ঘটাতে প্রবীণদের পাশাপাশি নবীনদের আনা হবে নেতৃত্বে। অন্যদিকে দলের সিদ্ধান্ত অমান্যকারী, নানা ধরনের অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত এলাকায় ভাবমূর্তিক্ষুণœ করেছে এমন কাউকে দলের নেতৃত্বে রাখা হবে না। পাশাপাশি তোষামোদকারী, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, অস্ত্র মহড়াকারীদের কমিটিতে না রাখাসহ কঠোর বার্তা থাকছে আসন্ন সম্মেলনে।
আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রে বিশ্বাসী একটি রাজনৈতিক দল। আর সম্মেলনের মাধ্যমে বরাবরই এ দলের নেতৃত্বের পরিবর্তন হয় জানিয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, এবারও তার ব্যত্যয় ঘটবে না। তিনি বলেন, যাদের বিরুদ্ধে কোনো অনৈতিকতার অভিযোগ নেই, দলবাজি বা নেতিবাচক কর্মকা-ে সম্পৃক্ত নয় এবং সমাজের সবার কাছে গ্রহণযোগ্য, সৎ যোগ্য তাদের হাতেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব আসবে।