আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৯-০৯-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

১১০ টাকার টোল ৭৩০ টাকা

শওকত আলী, চাঁদপুর
| দেশ

চাঁদপুরের হরিণা ফেরিঘাটে অবৈধ চাঁদাবাজি টাকার বিনিময়ে সিরিয়াল ভাঙার অভিযোগ

চাঁদপুর-শরীয়তপুর রুটের হরিণা ফেরিঘাট এলাকায় চরম নৈরাজ্য চলছে। ট্রাক অ্যাসোসিয়েশনের নামে অবৈধভাবে প্রতি গাড়ি থেকে চাঁদা আদায় করা হয়, টোল আদায়ে চলে ব্যাপক অনিয়ম, টাকার বিনিময়ে সিরিয়াল ভঙ্গ করে পেছনের গাড়ি সামনে দেওয়া হয়। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিআইডব্লিউটিএ চাঁদপুর কর্মকর্তা বা নৌ-ফাঁড়ির পুলিশ ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। 

চট্টগ্রাম থেকে চাঁদপুর হয়ে দক্ষিণাঞ্চলমুখী শত শত মালবাহী ট্রাক প্রতিদিন এখানকার ফেরি দিয়ে চাঁদপুরের মেঘনা পাড়ি দেয়। মেঘনা পাড়ি দেওয়ার জন্য রয়েছে ফেরি রুট। চাঁদপুর অংশে রয়েছে হরিণা আর শরীয়তপুর অংশে রয়েছে নরসিংহপুর (আলুরবাজার) ফেরিঘাট। এ ফেরি সার্ভিসকে চাঁদপুর-শরীয়তপুর ফেরি সার্ভিস বলা হয়। এ ফেরি সার্ভিসের হরিণা ফেরিঘাট এলাকায় গাড়ি পার্কিং চার্জ ও ফেরিতে ওঠার জন্য আগে ঘাটের চার্জসহ টোল আদায় হতো সরকারিভাবে অর্থাৎ বিআইডব্লিউটিসির মাধ্যমে। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে এ টোল আদায় হচ্ছে ইজারার মাধ্যমে। এজন্য হরিণা ফেরিঘাট ইজারা দেওয়া হয়েছে। এখন ইজারাদারই টোল আদায় করেন। এখানে টোল আদায় নিয়ে চলছে চরম অনিয়ম। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী মালবাহী প্রতি ট্রাক অথবা প্রতি বাস থেকে টোল আদায় করার কথা ১১০ টাকা, কিন্তু আদায় করা হয়ে ৭৩০ টাকা। অবৈধভাবে প্রতি গাড়ি থেকে ৬২০ টাকা বেশি নেওয়া হয়। অস্থানীয় ট্রাক ড্রাইভাররা অনেকটা অসহায় হয়েই বাড়তি টাকা দেন। ভয়ে তারা প্রতিবাদ করতে পারেন না। বাড়তি টোল আদায় ছাড়াও এখানে চলে চাঁদাবাজি। ট্রাক অ্যাসোসিয়েশনের নামে অবৈধভাবে প্রতি ট্রাক থেকে ৩০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়। স্থানীয় একটি চাঁদাবাজ চক্র এ চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত। নৈরাজ্য এখানেই শেষ নয়; ফেরিতে ওঠার জন্য গাড়ির যে সিরিয়াল থাকে, সেখানেও ঘটে অনিয়ম। স্থানীয় একটি চক্র ফেরির লোকজনের যোগসাজসে পেছনের গাড়ি সামনে নিয়ে আসে। এজন্য তারা হাতিয়ে নেয় ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা। 
হরিণা ফেরিঘাটের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি গেল সোমবার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত জেলা আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় কমিটির সভায় উত্থাপন করেন চাঁদপুর সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম নাজিম দেওয়ান। তখন বিষয়টি নিয়ে সভায় আলোচনা হয়। পরবর্তীতে চেয়ারম্যান নাজিম দেওয়ান বিষয়টি লিখিত অভিযোগ আকারে জেলা প্রশাসককে অবহিত করেন। অভিযোগের বিষয়টি জেলা প্রশাসক অবগত আছেন বলে জানান এবং এ বিষয়টি তিনি গুরুত্বের সঙ্গে দেখবেন বলে চেয়ারম্যান নাজিম দেওয়ানকে আশ্বস্ত করেন। সচিবও জেলা প্রশাসকের কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ করেছেন বলে জানা গেছে। 
এদিকে নূরুল ইসলাম নাজিম দেওয়ানের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সদর মডেল থানার ওসি নাসিম উদ্দিন সরেজমিন গিয়ে এর সত্যতা পেয়েছেন বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে ওসি নাসিম উদ্দিন বলেন, আমি সরেজমিন হরিণা ঘাট এলাকায় গিয়ে অতিরিক্ত টোল আদায়ের সত্যতা পেয়েছি। বিষয়টি আমি সদর ইউএনও ও পুলিশ সুপার মহোদয়কে জানিয়েছি। আমি সেখানে মোবাইল কোর্ট করার জন্য সুপারিশ করেছি।
এসব বিষয়ে হরিণা ফেরিঘাটের ম্যানেজার পারভেজ খান বলেন, ফেরিঘাটের ইজারার বিষয়টি আমরা দেখি না, দেখে বিআইডব্লিউটিএ। আমি বিআইডব্লিউটিসির অধীনে কাজ করি। বিগত দিনে আমরা টোল আদায় করেছি। তখন কোনো সমস্যা হয়নি বা কোনো অভিযোগও পাইনি। এখন বিআইডব্লিউটিএ ঘাট ইজারা দিয়েছে, এতটুকুই আমরা জানি। অথচ ইজারার কোনো কাগজপত্র এবং টোল আদায়ের তালিকাও আমাদের দেওয়া হয়নি। গাড়ির সিরিয়াল ভঙ্গ করার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করে বলেন, পচনশীল দ্রব্যের কোনো গাড়ি থাকলে সেটি নিয়ম অনুযায়ী যেভাবে ফেরিতে ওঠার সেভাবেই উঠে থাকে। এছাড়া অন্য কোনো অভিযোগের বিষয় তার জানা নেই।
অতিরিক্ত টোল আদায়ের বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ চাঁদপুরের উপ-পরিচালক আবদুর রাজ্জাক বলেন, প্রায় ১৫ দিন আগে বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যানের কাছে জাহাঙ্গীর নামে এক ট্রাক ড্রাইভার তার কাছ থেকে ৬২০ টাকা অতিরিক্ত নেওয়া হয়েছে বলে মোবাইল ফোনে অভিযোগ দিয়েছেন। চেয়ারম্যান বিষয়টি জানালে আমি ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলি। তিনিও আমার কাছে একই অভিযোগ করেন। আমি তাকে ঘাটে থাকতে বলে এসে আর পাইনি। কেউ অভিযোগ না দিলে এবং অভিযোগকারী উপস্থিত না থাকলে অ্যাকশনে যাওয়া যায় না। এখানে ১১০ টাকার বেশি টোল নেওয়ার সুযোগ নেই। বন্দরের এক কর্মকর্তা বলেন, ঘাটের টোল আদায়ের পরিমাণসহ তালিকা আমরা হরিণা ঘাট এলাকায় দর্শনীয় স্থানে লাগিয়ে দিয়েছি। কিন্তু কে বা কারা সেই তালিকার বোর্ড সিমেন্ট লেপে দিয়ে মুছে দিয়েছে।