আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১১-১০-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

পরিচ্ছন্ন নগরী ও স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব

মাহমুদুল হক আনসারী
| সম্পাদকীয়

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ব্যক্তি, পরিবার, সামাজিক জীবনে অতীব জরুরি বিষয়। শহর-নগর সর্বত্র পরিচ্ছন্ন জীবন দরকার। নাগরিকের জন্য শহরকেন্দ্রিক জীবন-জীবিকা অনেকটা কষ্টকর। কিছু কিছু বিষয়ে শহরকেন্দ্রিক জীবনে বেশি কিছু প্রাপ্তি হলেও পরিচ্ছন্ন জীবন এক ধরনের কঠিন। চট্টগ্রাম শহরের আয়তন বাড়ছে, বাড়ছে জনসংখ্যা। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রছাত্রী বাড়ছে। রাস্তাঘাট, মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, গির্জা, উপাসনালয় যত্রতত্র অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে। সিডিএ ও স্থানীয় নানা প্রশাসনের অনুমতি ব্যতিরেকে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা হচ্ছে। নালা, নর্দমা, ড্রেনঘেঁষে দোকান, মার্কেট, ঘর তৈরি হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সিডিএ ও সিটি করপোরেশন কিছু অবৈধ ঘর, দোকানের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছে। আমার কথা সেখানে নয়, নগর ও নাগরিক জীবনকে পরিচ্ছন্ন রাখতে যে বিষয়গুলো স্থানীয় প্রশাসনকে কঠোরভাবে দেখা দরকার, সেখানেই আমার বক্তব্য। নগরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত রাখতে যেসব পরিকল্পনা স্থানীয় প্রশাসনের রয়েছে, সেগুলো বাস্তবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না কেন? সে বিষয়ে পরিষ্কার করতে চাই। নগরীর যেসব নালা-নর্দমা-ড্রেন রয়েছে এসব যথাসময়ে পরিষ্কার করা হয় না। যেখানেই পরিষ্কারের জন্য কিছু কর্মসূচি দেয়া হয়, সেখানে ড্রেনের ময়লাগুলো রাস্তায় দিনের পর দিন স্তূপ করে ফেলে রাখা হয়। এসব ময়লা নানাভাবে রোগ-জীবাণু ছড়িয়ে দিচ্ছে নাগরিক জীবনে। অসহ্য দুর্গন্ধে রাস্তায় চলতে-ফিরতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। নালা থেকে ময়লাগুলো উঠিয়ে কেন নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট জায়গায় হস্তান্তর করা হয় না। রাস্তার ময়লা প্রায় সময় ড্রেনে ফেলতেও দেখা যায়। শহরে যেসব পরিচ্ছন্ন কর্মী রয়েছেন তাদের একটি নির্দিষ্ট সময়ে, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর রাস্তা পরিষ্কার করতে দেখা যায়। আর ময়লাগুলো রাস্তা থেকে নালাতে ফেলে দেয়। তাহলে আবার ঘুরেফিরে ময়লায় নালার ড্রেন ভরে যায়। পরিচ্ছন্ন কাজের সুপারভাইজারকে চোখে পড়ে না। এত বড় শহরে প্রায় সত্তর লাখ জনগণের বসবাস। একচল্লিশ ওয়ার্ডের সিটি করপোরেশনের একটা প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে শহর পরিচালিত হলেও সেখানে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডগুলো সঠিকভাবে তাদের পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব পালন করছে বলে মনে হয় না। শহরের যে প্রান্তেই যাওয়া হোক না কেন, ড্রেন থেকে ময়লা তুলে রাস্তার ওপর স্তূপ করে থাকার দৃশ্য সবসময় কোনো না কোনো জায়গায় প্রায়ই নজরে আসবে। প্রতিটি ওয়ার্ডেই পরিচ্ছন্ন কর্মীদের অবস্থান। কিন্তু তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে দেখা যায় না। এখন শুষ্ক মৌসুম চলছে। নগরীর অসংখ্য নালা-নর্দমা ময়লায় গিজগিজ করছে। বাসাবাড়ির উচ্ছিষ্ট প্লাস্টিক জাতীয় পলিথিনসহ নানা ধরনের ময়লায় এসব নালা-নর্র্দমা ভরে আছে। এগুলো জরুরি ভিত্তিতে স্বল্প সময়ের মধ্যে পরিষ্কার করা দরকার। নগরীর অসংখ্য নালা-ড্রেন স্থানীয় ওয়ার্ডের মাধ্যমে কঠোরভাবে নির্দেশনা দিয়ে সিটি করপোরেশনকে পরিষ্কার করার উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায়, মৌসুমি ঝড়বৃষ্টিতে ময়লার পানি নিষ্কাশন হবে না। এসব ময়লা থেকে রোগ-জীবাণু ছড়াচ্ছে। নালা-নর্দমার ওপর থেকে দোকান, ঘর উচ্ছেদ করতে হবে। কঠোরভাবে নগরকে পরিচ্ছন্ন রাখার ও স্বাস্থ্যসম্মত নাগরিক জীবনের জন্য শহরকে যে কোনো মূল্যে পরিষ্কার রাখা চাই। পরিচ্ছন্ন কর্মীদের দায়িত্ব পালনে মনিটরিং ও সুপারভাইজারিং রাখতে হবে। কোনো অবস্থায় ড্রেনের ময়লা রাস্তায় স্তূপ করে রাখা গ্রহণযোগ্য নয়। বাসাবাড়ির ময়লা ড্রেনে না ফেলার জন্য প্রশাসনিক তদারকি জোরদার হওয়া দরকার। ময়লার ডাস্টবিন স্বাস্থ্যসম্মতভাবে করা দরকার। বেশি সময় ডাস্টবিনে ময়লা ধরে রাখার ফলে আবহাওয়া বিষাক্ত হয়ে ওঠে। ডাস্টবিনগুলোকে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে রাখা ও ময়লা স্থানান্তরের সময় নগরজীবনকে দুর্গন্ধমুক্ত রাখা চাই। অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্নতা ও দুর্গন্ধের কারণে বয়োবৃদ্ধ, নারী, শিশু প্রতিনিয়ত নানাবিধ রোগব্যাধির সম্মুখীন হচ্ছে। উন্নয়নের প্রজেক্ট রাস্তার খোঁড়াখুঁড়ি একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করে রাস্তাগুলো যান চলাচলের উপযোগী করে দেওয়া দরকার। নগরের বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির পর ফেলে রাখা হয়েছে। ফলে সেখানে যানচলাচল ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে মারাত্মক ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে জীবন ও যান দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের পর সে রাস্তা যান চলাচলের জন্য উপযোগী করা নানাভাবে বিলম্বিত হওয়ার কারণে সে এলাকার জনগণের দুর্ভোগ লেগেই থাকে। এসব বিষয় কঠোরভাবে নজরদারি করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে নির্দিষ্ট সময়ে এসব কাজ শেষ করা দরকার। কোনো কোনো রাস্তায় সারা বছর খোঁড়াখুঁড়ি দেখা যায়। এক সংস্থা শেষ করলে আরেকটি পক্ষ কাজ শুরু করে। এসব একেবারেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। সব সংস্থাকে সমন্বয় করে উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা চাই। জনগণের জন্য উন্নয়ন, আবার সে উন্নয়নে জনভোগান্তি কোনো কোনো সময় চরম পর্যায়ে নিয়ে যেতে দেখা যায়। এসব কঠোরভাবে স্থানীয় প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। জনগণ তাদের ওপর অর্পিত ট্যাক্স প্রদান করছে। প্রশাসনিক নির্দেশনা মেনেই শহরের জনগণের জীবন চলে। তাদের স্বাস্থ্যসম্মত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জীবন-জীবিকা পরিচালনায় সবধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব। কোনো অবস্থাতেই শহর জীবন অস্বাস্থ্য দুর্বিষহ দুর্গন্ধময় হয়ে উঠুক, সেটা নগরজীবনে কাম্য হতে পারে না। পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের সঠিকভাবে নির্দেশনার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসম্মত নগরজীবন প্রত্যাশা করে জনগণ। 

মাহমুদুল হক আনসারী
গবেষক, প্রাবন্ধিক
[email protected]