আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১১-১০-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

হার্ভের চিত্রে বতসোয়ানা, ভাবনায় বাংলাদেশ

আহামেদুল হক এম শাহীন
| সম্পাদকীয়

মার্টিন হার্ভে। দক্ষিণ আফ্রিকার একজন পেশাদার ফটোগ্রাফার। তিনি ১৮ সেপ্টেম্বর তার নিজের ধারণ করা একটা ভিডিও ও কিছু ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করেন। ভিডিও এবং স্থিরচিত্রগুলো ধারণ করা হয়েছে আফ্রিকার বতসোয়ানার লেক নগামি থেকে। ভিডিওটিতে দেখা গেছে বতসোয়ানার করুণ এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়। যেখানে পানিশূন্যতার কারণে শত শত মাছ কাদায় লাফাচ্ছে। গরু, ঘোড়া, হরিণ পানিশূন্য কাদাবেষ্টিত মাটিতে পানির অভাবে হাঁসফাঁস করছে। মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর এসব প্রাণীর মৃত্যুর অপেক্ষায় তাদের আশপাশে উড়াউড়ি করছে শকুন ঝাঁক। ভিডিওগ্রাফিটি যারা দেখেছেন তারা জানেন এটির হৃদয়স্পর্শী দিক। মাটি, প্রাণ ও প্রকৃতির যে দৃশ্য হার্ভে আমাদের দেখিয়েছেন, তা কতটা ভয়ংকর ও বীভৎস তা আমি বর্ণগাঁথুনি দিয়ে প্রকাশ করতে অক্ষম! আমার চিন্তার দূরদর্শী সক্ষমতা দিয়ে আমি যা প্রকাশ করতে পারি, তা হলো হার্ভের ক্যামেরার ল্যান্স দিয়ে আমার দেখা করুণ আগামী। আমি চিন্তা করেছি পানির অভাবে মৃত্যুকাতর ওইসব গরু, ঘোড়া, হরিণ আমাদের প্রজন্ম। আমাদের সন্তান। আমাদের সন্তান গড়াগড়ি করছে একটু ছায়ার আশায়। আমাদের সন্তান অপেক্ষা করছে দ্বিতীয় আরেকটি শ্বাসের জন্য। আমাদের সন্তান মারা যাচ্ছে একটু পানির জন্য। আমাদের সন্তানের মৃত্যু অপেক্ষায় প্রহর গুনছে ক্ষুদার্ত কিছু শকুন। কত নির্মমতার আগামী! আমি আমাদের আগামী নিয়ে ভয়ংকর কল্পচিত্র অঙ্কন করেছি। কেন করেছি? আমি কেন বলতে চাইছি মানুষ তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রশ্নে এক ভয়ংকর সত্যের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে? কারণ একটাই। প্রাকৃতিক বিপর্যয়। কেন প্রাকৃতির বিপর্যয়? কারণ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন। ফটোগ্রাফার হার্ভে সেটিই তুলে ধরেছেন ক্যামেরার ল্যান্সে। হার্ভে আমাদের যে পরিবেশের বর্ণনা দিয়েছেন এটি শুধু বতসোয়ানার আঞ্চলিক সমস্যা নয়; এটি যেন গোটা পৃথিবীর প্রাণ-প্রকৃতি ও মানবসভ্যতা বিলিন হওয়ার আগাম চিত্রপ্রদর্শনী!
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিন ইফেক্ট। জলবায়ু পরিবর্তন বা ক্লাইমেট চেঞ্জ। এ দুটি প্রসঙ্গ আজ কোনো একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায় কিংবা নির্দিষ্ট জাতির মধ্যকার সীমাবদ্ধ বোঝাপড়ার ব্যাপার নয়। এটি চলমান সময়ে বিশ্বব্যাপী বিশেষ আলোচনার বিষয়বস্তু। কারণ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন গোটা পৃথিবীর অস্তিত্বের প্রশ্নে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। এজন্য এশিয়া থেকে আফ্রিকা, ইউরোপ থেকে আমেরিকা সর্বত্র চলছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা ও তা মোকাবিলার পদ্ধতিগত রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক আলোচনা। কিংবা নাগরিক সমাজ কর্তৃক পৃথিবী রক্ষার আন্দোলন। এসব আলোচনা, আন্দোলন, মোকাবিলা কতটা ফলপ্রসূ প্রভাব রাখতে সক্ষম আমরা জানি না। তবে আমরা জানতে ও জানাতে চাই ‘পৃথিবী মরে যাচ্ছে’, যে কোনো মূল্যে ‘পৃথিবীকে বাঁচাতে হবে’। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বতসোয়ানার লেক নগামির মতো পৃথিবীর বিস্তৃত অঞ্চল এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে পৃথিবী-বিস্তৃত সমস্যা নিয়ে সার্বিক আলোচনায় না গিয়ে আমি এ লেখায় স্বল্প পরিসরে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করতে চাই। কারণ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে পশ্চিমা পুঁজিবাদী শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তা তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত দরিদ্র দেশগুলোর তুলনায় অনেকটা কম। বাংলাদেশ মূলত তৃতীয় বিশ্বের কৃষিপ্রধান একটি দরিদ্র দেশ। এ আলোচনায় বাংলাদেশ যদিও স্পেসিফিক; তবু প্রতীকী অর্থে বাংলাদেশকে সমগ্র তৃতীয় বিশ্বের প্রতীকী প্রতিনিধি হিসেবে মনে করা যায়। অর্থাৎ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বাংলাদেশের যা যা ক্ষতি তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য দেশেরও একই ক্ষতি। এর প্রধান কারণ বাংলাদেশের মতো এসব দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, আর্থসামাজিক অবকাঠামো, জনসংখ্যা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীলতা।
সাম্প্রতিক সময়ে পৃথিবীর তাপমাত্রা আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে যাওয়ার কারণে প্রকৃতির ওপর নেমে আসছে নানা ধরনের দুর্যোগ। যেমনÑ অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গোটা পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর দেখা দিচ্ছে ভয়াবহ বিরূপ প্রতিক্রিয়া, যা আমি শুরুতে মার্টিন হার্ভের বতসোয়ানা চিত্রের ভেতর দিয়ে জানানোর চেষ্টা করেছি। কেন হচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তন? জানা যাক মৌলিক সমস্যা। পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে বায়ু। আর এ বায়ু ধোঁয়ার ফলে দূষিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। শিল্পকারখানা, ইটভাটা, রান্না, রাস্তা নির্মাণের জন্য বিটুমিন গলানো ও দাবানলের ধোঁয়া। মানুষ আরও বহু কাজে ধোঁয়া তৈরি করে এবং বায়ুকে দূষিত করছে। রেলওয়ে ইঞ্জিন, পাওয়ার হাউসগুলোর কয়লা এবং তেল পুড়িয়ে ধোঁয়া তৈরি করা। আবার ইদানীংকালে আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে ই-বর্জ্য বা ইলেকট্রনিক্স ময়লা। বিভিন্ন অবস্থা থেকে নির্গত ধোঁয়া বাতাসের সঙ্গে মিশে বায়ুদূষণ করছে। বায়ুদূষণের ফলে পৃথিবীর ওজনস্তর নষ্ট হচ্ছে। পৃথিবীর ওজনস্তর নষ্ট হওয়ার ফলে সূর্য থেকে আসা অতিবেগুনি ক্ষতিকর রশ্মি সরাসরি পৃথিবীতে প্রবেশ করছে। ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা দিনকে দিন বেড়ে যাচ্ছে। আর এটাই হলো বৈশ্বিক উষ্ণতা। যেটাকে বিজ্ঞান বলছে গ্রিনহাউস ইফেক্ট। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মারাত্মক ফলটাই হলো জলবায়ু পরিবর্তন। যদিও জলবায়ু পরিবর্তন একটি নিয়মিত প্রাকৃতিক ঘটনা। কিন্তু চলমান সময় বিশ্বে দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তন নিয়মের চেয়ে ব্যতিক্রম এক ভয়াবহ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৯৯৬-২০১৫ সাল। প্রাপ্ত তথ্যমতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ২০ বছরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে প্রথম হন্ডুরাস, দ্বিতীয় মিয়ানমার, তৃতীয় হাইতি, চতুর্থ অবস্থানে আছে নিকারাগুয়া, পঞ্চম ফিলিপাইন ও ষষ্ঠ অবস্থানে বাংলাদেশ। কাজেই বোঝা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বাংলাদেশে বিরূপ নেতিবাচক প্রভাবের মধ্যে নিপতিত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন সক্ষমতা কমে গেছে ৩০-৩৫ শতাংশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে ২২ শতাংশ কৃষিজমি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। তাছাড়া ক্যামিকেল ও বর্জ্য পদার্থের পরিমাণ সমুদ্রে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে সমুদ্রের পানি দূষিত হচ্ছে। তাই সাগর থেকে সৃষ্ট প্রচ- ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন, টর্নেডো, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভয়াবহ আকার নিয়েছে। বাংলাদেশের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য ঝুঁঁকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের এক প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করা যাক। এ প্রতিবেদনটি আঁতকে ওঠার মতো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জানাচ্ছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হচ্ছে, ২০১১-২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ৯৬ ভাগ অভিবাসী তৈরি হবে। তলিয়ে যাবে দেশের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ। লবণাক্ততা বেড়ে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হবে। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব এরই মধ্যে আমরা পেতে শুরু করেছি। ২০০৯ সালে হওয়া প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আইলার প্রভাবে লাখ লাখ মানুষ জীবন-জীবিকা হারিয়েছে। ধ্বংস হয়েছে ফসল, বাড়িঘর। এছাড়া আইলা, মহাসেন, ফণি ইত্যাদি দুর্যোগের নিকট অতীত আমাদের ভোলার কথা নয়। দেশে অনেক পশুপাখি বিলুপ্ত হয়েছে। আরও অনেক বিলুপ্তির পথে। অতিমাত্রায় বজ্রপাতে মানুষের প্রাণহানি। শিলাবৃষ্টির কারণে ফসলের ক্ষতি। সাম্প্রতিক সময়টা চিন্তা করলে এসব সমস্যা তো দেশে নিয়মিত প্রাকৃতিক বিপর্যয় হয়ে উঠছে। ষড়ঋতুর প্রহসনের কথাও উল্লেখ করা যাক। ষড়ঋতু বিষয়টা আমাদের কাছে আজকাল মিথ কিংবা কোনো রূপকথার গল্পের মতো শুনাচ্ছে। বছরের প্রায় ১০ মাস গরম থাকা। আবার তার মধ্যে ৭-৮ মাত্রাতিরিক্ত গরম। দুই মাস কোনোরকম শীত থাকা। সময়ে অনাবৃষ্টি। অসময়ে অতিবৃষ্টি। পরিবেশের চরিত্রটাই যেন হযবরল! এসব কারণই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ সমষ্টিগত ফল, যা লাঙ্গলের ওপর ঠিকে থাকা কৃষিপ্রধান একটি দেশের পক্ষে মেনে নেওয়া দুরূহ। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে হওয়া ক্ষতি মোকাবিলায় আমরা কি যথেষ্ট প্রস্তুত? বা কেমন প্রস্তুতি প্রয়োজন? বিশেষ যে প্রস্তুতিগুলো আমাদের প্রয়োজন তা তুলে ধরছি। প্রথম এবং প্রধান যে কাজটা এই মুহূর্তে দরকার তা হলো প্রাণ-পরিবেশ রক্ষার জন্য বেশি বেশি গাছ লাগানো। বনাঞ্চল তৈরি করা। বনাঞ্চল ধ্বংসের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা। তারপর আসে নদীদূষণ কমানো। নদীদূষণের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা। পাহাড় ধ্বংস বন্ধ করা। পাহাড় ধ্বংসের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সম্মিলিত উদ্যোগে সচেতনতা তৈরি করা (কারণ বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষিতে জনসংখ্যারচাপ বিরাট এক পরিবেশগত সমস্যা)। কৃষিজমি রক্ষা। অল্প জায়গায় বহুতল ভূমি নির্মাণের মানসিকতা। শিল্পকারখানার বর্জ্য পরিশোধন করা। বর্জ্য রিসাইকেলিং করা। প্লাস্টিকজাত পলিথিনের ব্যবহার কমানো। বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি এড়াতে এসব চিহ্নিত সমস্যা ও তার সমাধান নিয়ে বেশি করে ভাবতে হবে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি মোকাবিলায় রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ একটি ভূখ-ের অস্তিত্বের প্রশ্ন যখন সামনে চলে আসে, তখন ওই ভূখ-ের চলমান সময়টা হলো জরুরি বোঝাপড়ার দ্রুত সিদ্ধান্তের দুরূহ সময়। এ সময়টাকে ঐক্যবদ্ধভাবে ভাবতে হবে। তবে এ ঐক্যবদ্ধ ভাবনার মধ্যে রাষ্ট্রের নেতৃত্বগত দায় সবার আগে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন দৃশ্যমান সামাজিক কারণের ভেতর অদৃশ্যচিত্রে বড় এক রাজনৈতিক কারণ। দেশটাকে বাঁচাতে হবে। বাংলাদেশ নামের এ ভূখ- নিয়ে আমাদের জরুরি বোঝাপড়ার ভেতর দ্রুত সিদ্ধান্তে এগুতে হবে। প্রকৃতি না বাঁচলে প্রাণ বাঁচতে পারে না। আর প্রকৃতি বাঁচতে পারে একমাত্র মানবিক রাজনৈতিক সচেতনতার ভেতর দিয়ে। মানুষ প্রকৃতির প্রতি যতটা অমানবিক হবে প্রকৃতি মানুষের সঙ্গে ততটা অমানবিক হতে বাধ্য। আসুন মানুষসহ প্রতিটি প্রাণের বাঁচার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করি। সবাই মিলে প্রকৃতি বাঁচাই। প্রাণ বাঁচাই। দেশটাকে বাঁচাই। 

আহামেদুল হক এম শাহীন 
সংগঠক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট