আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১১-১০-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

জুলুমই শেষ কথা নয়

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘জালেমরা যা করে, সে সম্পর্কে আল্লাহকে কখনও বেখবর মনে করো না, তাদের তো ওই দিন পর্যন্ত অবকাশ দিয়ে রেখেছেন, যেদিন চক্ষুগুলো বিস্ফারিত হবে। তারা মস্তক ওপরে তুলে ভীত-বিহ্বল চিত্তে দৌড়াতে থাকবে। তাদের দিকে তাদের দৃষ্টি ফিরে আসবে না এবং তাদের অন্তর উড়ে যাবে।’ (সূরা ইবরাহিম : ৪২-৪৩)

মুহাম্মদ নূরুল্লাহ তারীফ
| ইসলাম ও সমাজ

বর্তমান পৃথিবীতে জুলুমের শেষ নেই। চারপাশে জুলুমের ছড়াছড়ি। জুলুম দেখতে দেখতে অনেক সময় মনে হয় জুলুমই বোধ হয় শেষ কথা। জালেমের কিছু হবে না। জালেমের বিরুদ্ধে আমাদের কিছু করার নেই। এ ব্যাপারে ইসলামের শিক্ষা আমাদের জেনে রাখা দরকার। 
প্রথমত, জালেমকে অনেক সময় আল্লাহ তায়ালা তাৎক্ষণিক শাস্তি দেন না বলে জালেমকে নিরাপদ ভাবার কিছু নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘জালেমরা যা করে, সে সম্পর্কে আল্লাহকে কখনও বেখবর মনে করো না, তাদের তো ওই দিন পর্যন্ত অবকাশ দিয়ে রেখেছেন, যেদিন চক্ষুগুলো বিস্ফারিত হবে। তারা মস্তক ওপরে তুলে ভীত-বিহ্বল চিত্তে দৌড়াতে থাকবে। তাদের দিকে তাদের দৃষ্টি ফিরে আসবে না এবং তাদের অন্তর উড়ে যাবে।’ (সূরা ইবরাহিম : ৪২-৪৩)। তিনি আরও বলেন, ‘জালেমরা শিগগিরই জানতে পারবে তাদের গন্তব্যস্থল কিরূপ?’ (সূরা শুআরা : ২২৭)।
দ্বিতীয়ত, সক্ষমতা থাকলে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং সাধ্য অনুযায়ী মজলুমকে সাহায্য করা ফরজ। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যদি কোন অন্যায় দেখে তবে সে তা হাত (শক্তি) দিয়ে তা পরিবর্তন করবে। যদি তাতে সক্ষম না হয় তবে সে তার মুখের (বক্তব্যের) মাধ্যমে তা পবিবর্তন করবে। এতেও যদি সক্ষম না হয় তবে সে তার অন্তর দিয়ে তা পরিবর্তন (কামনা) করবে। আর এটি ঈমানের দুর্বলতম পর্যায়।’ (মুসলিম)।
তৃতীয়ত, মজলুমের ব্যাপারে দিলের মধ্যে মুসলিম ভ্রাতৃত্ব লালন করতে হবে। এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। এ ভ্রাতৃত্বের ভিত্তি কালেমা ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহ’র স্বীকৃতি প্রদান। এর চেয়ে বড় ও মজবুত ভ্রাতৃত্বের আর কোনো বন্ধন নেই। গোত্রীয় ও গোষ্ঠীয় সব বন্ধন ও মতভেদের ওপর এ বন্ধনকে প্রাধান্য দিতে হবে। যে ভাইয়ের সঙ্গে আপনি এক কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়েন তারা সবাই আপনার মুসলিম ভাই। মুসলিম-মোমিনদের প্রতি ঘৃণার বিপরীতে ভালোবাসাকে প্রাধান্য দিন। মোমিনের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে উদ্ধার করুন। 
ইবনে ওমর (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুসলিম মুসলিমের ভাই, সে তার ওপর অত্যাচার করবে না এবং তাকে অত্যাচারীর হাতে ছেড়ে দেবে না। যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূর্ণ করবে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূর্ণ করবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের কোনো এক বিপদ দূর করে দেবে, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার বহু বিপদের একটি বিপদ দূর করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ-ত্রুটি গোপন করবে, আল্লাহ কেয়ামতে তার দোষ-ত্রুটি গোপন করবেন।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
চতুর্থত, জালেম ও তাদের দোসরদের প্রতি উপদেশ-নসিহত অব্যাহত রাখুন। এমনকি তারা নসিহত গ্রহণ করার সম্ভাবনা না থাকলেও নসিহত করুন; যাতে করে আমরা আল্লাহর কাছে দায়মুক্ত পেতে পারি। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর স্মরণ করুন, যখন তাদের একদল বলেছিল, আল্লাহ যাদের ধ্বংস করে দেবেন কিংবা কঠোর শাস্তি দেবেন, তোমরা তাদের সদুপদেশ দাও কেন?’ তারা বলেছিল, ‘তোমাদের রবের কাছে দায়িত্ব-মুক্তির জন্য এবং যদি তারা তাকওয়া অবলম্বন করে।’ (সূরা আরাফ : ১৬৪)। 
পঞ্চমত, সামগ্রিক আজাব থেকে বাঁচার জন্য সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ অব্যাহত রাখতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর তোমার পালনকর্তা এমন নন যে, তিনি জনবসতিগুলোকে অন্যায়ভাবে ধ্বংস করে দেবেন, সেখানকার অধিবাসীরা সংস্কারক হওয়া সত্ত্বেও।’ (সূরা হুদ :  ১১৭)।
তাই সামগ্রকি শাস্তি থেকে মুক্তির উপায় হচ্ছে সংস্কার। সংস্কার দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘আর তোমার পরওয়ারদেগার যখন কোনো জুলুমপূর্ণ জনপদকে ধরেন, তখন এমনিভাবেই ধরে থাকেন। নিশ্চয় তার পাকড়াও খুবই মারাত্মক, বড়ই কঠোর।’ (সূরা হুদ : ১০২)।
ষষ্ঠত, সর্বাবস্থায় মজলুমের পক্ষে এবং জালেমের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরজ। রাসুল (সা.) বলেন, আনাস বিন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমার ভাইকে সাহায্য কর, সে জালেম হোক অথবা মজলুম।’ (অর্থাৎ জালেম ভাইকে জুলুম থেকে বিরত রাখবে এবং মজলুম ভাইকে জালেমের হাত থেকে রক্ষা করবে)। (বোখারি)। 

লেখক : এমফিল গবেষক, কিং সউদ বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরব