আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১১-১০-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

একজন মানুষ হত্যা মানে পুরো মানবজাতি হত্যা

সুনানে তিরমিজি হাদিস বর্ণিত হয়েছে ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন ‘কেয়ামতের দিন নিহত ব্যক্তি তার খুনিকে মাথার সামনের চুল ধরে নিয়ে আসবে। তখন নিহত ব্যক্তির শরীর থাকবে রক্তে ভেজা। সে বলবে, হে আমার প্রভু! এই লোক আমাকে হত্যা করেছে। এমনিভাবে বলতে বলতে সে তাকে নিয়ে আল্লাহর আরশের কাছে চলে যাবে।’

আবদুল্লাহ শহীদ আবদুর রহমান
| ইসলাম ও সমাজ

ইন্নাল আবরারা লা-ফি নাঈম। ‘নিশ্চয় আবরার তথা সৎকর্মশীলরা থাকবে জান্নাতে।’ (সূরা ইনফিতার : ১৩)। সৌদি তরুণী নাজলা আত-তুমাইরির ক্যালিগ্রাফি

মানবহত্যা এখন নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আল্লাহর সৃষ্টি সর্বশ্রেষ্ঠ জীব মানবহত্যা শিরকের পর পৃথিবীতে সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধ। 

খুনির জন্য অনন্ত অভিশাপ
মানব হত্যাকারী ব্যক্তি আল্লাহর বিচারে খুনি। রাষ্ট্রের বিচারে খুনি। নিজের বিবেকের বিচারেও খুনি। নিজের ছেলেমেয়ে, বন্ধুবান্ধব, আপনজন, আত্মীয়স্বজনের দৃষ্টিতেও খুনি। খুনি হিসেবে সবার অভিশাপ তাকে তাড়া করে। একজন মানুষের জীবনে এর চেয়ে বড় অভিশাপ আর কী হতে পারে, সে খুনি হিসেবে বেঁচে আছে? তারপর জীবন শেষে শেষ বিচারে চিরদিন জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে। আল্লাহ বলেন ‘আর যে ব্যক্তি কোনো মোমিনকে ইচ্ছা করে হত্যা করল, তার প্রতিফল হলো জাহান্নাম। সেখানে সে স্থায়ী হবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্রোধান্বিত হয়েছেন। তিনি তাকে অভিসম্পাত করেছেন। আর তার জন্য ভয়ানক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন।’ (সূরা নিসা : ৯৩)। 

যে কোনো মানুষকে হত্যাই অপরাধ
শুধু মোমিনদের হত্যা করাই অপরাধ তা নয়, যে কোনো (ধর্মের) মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা ইসলামের দৃষ্টিতে ঘৃণ্য কাজ। আল্লাহ বলেন ‘যে ব্যক্তি কাউকে হত্যার অপরাধ বা দেশে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করার অপরাধ ব্যতীত কোনো মানুষকে হত্যা করল, সে যেন সব মানুষকে হত্যা করল।’ (সূরা মায়িদা : ৩২)। তাই খুনি সে যেই হোক, যে ধর্মের হোক, আর যে চেতনার হোক, যে কারণেই হোক, সবসময় সে মানব সমাজের জন্য, সভ্যতার জন্য হুমকি। মহান আল্লাহর এই বাণী এ কথার প্রমাণ। 

পুরো দুনিয়া ধ্বংসের চেয়েও বড় অপরাধ
মানুষের জীবনটা তার স্রষ্টার কাছে অনেক মূল্যবান। হাদিসে এসেছে ‘ন্যায্য কারণ ব্যতীত কোনো মোমিনকে খুন করা যে অপরাধ, তার চেয়ে পুরো দুনিয়া ধ্বংস করা আল্লাহ কাছে লঘুতর পাপ।’ (ইবনু মাজাহ, কিতাবুদ দিয়াত)। মানুষের মান-ইজ্জত, শরীর-রক্ত কী এত সস্তা? আল্লাহর রাসুল (সা.) বিদায় হজের ভাষণে বলে গেছেন, একবার নয় কয়েকবার, ‘আজ তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ, তোমাদের মান-সম্মানে আঘাত করাকে হারাম করা হলো।’ 

হত্যা বেড়ে যাওয়া কেয়ামতের আলামত
অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা এমন এক জাহেলিয়াত, যা পরবর্তী সভ্য যুগেও পাওয়া যায়। এগুলো কেয়ামতের মাধ্যমে পৃথিবী ধ্বংসেরই আলামত। হাদিসে এসেছে ‘যে সত্তার হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ করে বলছি, অবশ্যই মানব সমাজে এমন সময় আসবে, খুনি জানবে না, সে কেন খুন করেছে, আর নিহত ব্যক্তি বুঝবে না, কীসের জন্য তাকে হত্যা করা হয়েছে।’ (মুসলিম, কিতাবুল ফিতান)।

খুনির শুধু তওবায় কাজ হবে না
সাহাবি ইবনে আব্বাস (রা.) কে প্রশ্ন করা হলো, এক ব্যক্তি একজন মোমিনকে হত্যা করেছে। এরপর তওবা করেছে, ঈমানদার হয়ে গেছে, নেক আমল করেছে এবং হেদায়েতপ্রাপ্ত হয়েছে। তিনি বললেনÑ ‘তোমাকে ধিক্কার! সে হেদায়েত পায় কীভাবে? আমি তোমাদের নবী (সা.) এর মুখে শুনেছি নিহত ব্যক্তি তার খুনিকে টেনেহিঁচড়ে আল্লাহর কাছে নিয়ে আসবে। আর বলবে হে রব, আপনি জিজ্ঞেস করুন, সে কেন আমাকে খুন করেছে? আল্লাহর কসম! আল্লাহ এ ব্যাপারে তোমাদের নবীর ওপর যা নাজিল করেছেন (সূরা নিসার ৯৩ আয়াত) তা রহিত করেননি।’ ইবনে আব্বাস (রা.) কোরআন ব্যাখ্যাকারীদের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। তিনি এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, খুনির তওবা আল্লাহ কবুল করবেন না। যদিও অধিকাংশ আলেমের মত হলো, এটি মূলত ধমকি হিসেবে বলা হয়েছে। 
খুনির তওবা কবুল না করার বহুবিধ কারণ রয়েছে। যে কাউকে খুন করে, সে তিন শ্রেণির হক নষ্ট করে। প্রথম হক্কুল্লাহ বা আল্লাহর হক, দ্বিতীয় হক্কুল ইবাদ বা মানুষের হক। প্রথমত, আল্লাহর প্রিয় সৃষ্টি তাঁর বান্দাকে মেরে আল্লাহর অধিকার নষ্ট করল। দ্বিতীয়ত, সে নিহত ব্যক্তির পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার হরণ করল। তৃতীয়ত, সে খুনের মাধ্যমে নিহত ব্যক্তির ওয়ারিশদের অধিকার নষ্ট করে তাদের এতিম, বিধবা অসহায় বানাল। আদর-যতœ, লালন-পালন, মায়া-মমতা-ভালোবাসা, ভরণ-পোষণ থেকে বঞ্চিত করল। আল্লাহর নিয়ম অনুযায়ী মানবাধিকার বা বান্দার হক আল্লাহ মাফ করবেন না।
আর যে হাদিসে এমন একজন খুনির কথা এসেছে যে, সে একশ খুন সম্পন্ন করে হেদায়েতের সন্ধানে নেমে মাফ পেয়েছে, সেখানে মাফ পাওয়ার অর্থ হলো, আল্লাহর হক নষ্ট করার অপরাধ থেকে মাফ পেয়েছে। বান্দার হক বান্দা নিজে মাফ করার আগ পর্যন্ত ক্ষমা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অতএব, এই আয়াত ও এই দুই হাদিসের মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই।
সুনানে তিরমিজি হাদিস বর্ণিত হয়েছে ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন ‘কেয়ামতের দিন নিহত ব্যক্তি তার খুনিকে মাথার সামনের চুল ধরে নিয়ে আসবে। তখন নিহত ব্যক্তির শরীর থাকবে রক্তে ভেজা। সে বলবে, হে আমার প্রভু! এই লোক আমাকে হত্যা করেছে। এমনিভাবে বলতে বলতে সে তাকে নিয়ে আল্লাহর আরশের কাছে চলে যাবে।’ 
লোকরা ইবনে আব্বাস (রা.) কে প্রশ্ন করল, খুনি তওবা করলে নাজাত পাবে কি না। তিনি তখন এ আয়াত উল্লেখ করলেন ‘আর যে কোনো মোমিনকে ইচ্ছা করে হত্যা করল, তার প্রতিফল হলো জাহান্নাম। সেখানে সে স্থায়ী হবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্রোধান্বিত হয়েছেন। তিনি তাকে অভিসম্পাত করেছেন। আর তার জন্য ভয়ানক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন।’ (সূরা নিসা : ৯৩)। তারপর বললেন ‘এই আয়াত রহিত হয়নি। পরিবর্তন হয়নি। কীভাবে খুনির তওবা কবুল হবে?’ (তিরমিজি, তাফসির অধ্যায়)।

সবাই মিলে যখন একজনকে হত্যা করে 
হাদিসে এসেছে ইয়াজিদ আর রাকাশি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবুল হাকাম আল-বাজালি আমাদের বলেছেন, আমি আবু সাঈদ খুদরি (রা.) ও আবু হুরায়রা (রা.) কে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর হাদিস বলতে শুনেছি, আকাশ ও পৃথিবীর সব অধিবাসী মিলে যদি কোনো মোমিনকে হত্যা করে তাহলেও আল্লাহ তায়ালা হত্যায় জড়িত সবাইকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। (তিরমিজি, আবওয়াবুল জানায়িজ)।
তাহাবি ও বায়হাকিতে বর্ণিত সহিহ সনদে একটি আসার এসেছে যে, ওমর (রা.) এর যুগে ইয়েমেনের সানা শহরে ছয়-সাতজন লোক মিলে আসিল নামের একটি ছেলেকে হত্যা করেছিল। ওমর (রা.) তখন হত্যাকা-ে অংশ নেওয়া সবাইকে মৃত্যুদ- দিয়ে বলেছেন, যদি এ হত্যাকা-ে সানার (বর্তমান ইয়েমেনের রাজধানী) অধিবাসীরা সবাই জড়িত থাকত, তাহলে আমি সবাইকে হত্যা করতাম।
ইসলামের সব যুগের সব স্কলারের মত হলো একজন মানুষ হত্যার পেছনে যদি হাজার হাজার মানুষ থাকে, তাহলে বিচারে সবাইকে মৃত্যুদ- দেওয়া হবে। অতএব, দুনিয়ার সামান্য স্বার্থের জন্য যারা কথায় কথায় মানুষ হত্যা করে তাদের ভাবা উচিত কী পরিণাম তাদের জন্য অপেক্ষমাণ।