আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১১-১০-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

আজ কন্যা শিশু দিবস ছয় মাসে শিশু ধর্ষণ বেড়েছে ৪১ শতাংশ

আফরোজা নাজনীন
| শেষ পাতা

চলছে শিশু অধিকার সপ্তাহ। সে ধারাবাহিকতায় আজ কন্যা শিশু দিবস। কিন্তু এ কন্যা শিশুরাও নারীদের মতো নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। বিশেষ করে তাদের ওপর ধর্ষণের মতো অমানবিক অত্যাচার বেড়েই চলেছে। গেল বছরের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে শিশু ধর্ষণ বেড়েছে ৪১ শতাংশ হারে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ৪৯৬টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও বিচারহীনতা সংস্কৃতির কারণেই প্রতিনিয়ত বাড়ছে ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা। ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল ৫৭১ জন, ২০১৭ সালে ৫৯০ জন ও ২০১৬ সালে ৪৪৬ জন। শিশু অধিকার ফোরাম এসব তথ্য জানিয়েছে। 

মহিলা পরিষদ বছরের শুরুতে জানিয়েছিল, বছরের প্রথম মাসেই সারা দেশে ৭৯ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে; বাংলাদেশে পৈশাচিক এ অপরাধ ধর্ষণ বেড়েছে। সূত্র জানায়, গেল বছরে, অর্থাৎ ২০১৮ সালের জানুয়ারীতে ৬২ জন ধর্ষণের শিকার হয়। সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, অধিকাংশ সময় সম্মান হারানোর ভয় ও প্রভাবশালীদের চাপের মুখে শিশু নির্যাতনের ঘটনা চাপা পড়ে যায়। ধর্ষণের মামলা করতেও ভয় পান অভিভাবকরা। আবার অনেক সময় দরিদ্র অভিভাবকের পক্ষে দীর্ঘদিন মামলা চালিয়ে নেওয়াও সম্ভব হয় না। অপরাধীর শাস্তি না হওয়ায় সমাজে শিশু ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলেছে। শিশু নির্যাতনের আরও একটি বড় কারণ আইনি প্রক্রিয়ার ধীরগতি। দ্রুত বিচার কার্যকর না হওয়ায় জামিনের সুযোগ পেয়ে যায় অপরাধীরা। আসামি প্রভাবশালী হলে সংকট আরও বেড়ে যায়। তাদের চাপের মুখে নির্যাতিতরা সমঝোতায় যেতে ও মামলা তুলে নিতে বাধ্য হয়। 

বছর দশেক আগে ঢাকায় এক কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সহায়তায় সে পরিবার আইনের আশ্রয় নেয়। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে সময় লাগে চার বছর। সে মামলায় ধর্ষকের যাবজ্জীবন কারাদ- হয়। কিন্তু বাংলাদেশে বহু ধর্ষণের মামলা ঝুলে আছে বছরের পর বছর। ধর্ষণের শিকার নারীদের আইনগত সহায়তা দেয় বেসরকারি সংস্থা আইন সালিশ কেন্দ্র। এ সংস্থার কর্মকর্তা নীনা গোস্বামী বলেন, ধর্ষণের মামলায় চূড়ান্ত সাজা হয় হাতে গোনা কয়েকজনের। ধর্ষণের বিচার পেতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। আইনজীবীদের মতে, বিচার না হওয়ার কারণ দুটি। প্রথমত, আদালতে তথ্যপ্রমাণ ঠিকমতো উপস্থাপন না করা, অন্যদিকে মামলা না করার ক্ষেত্রে পরিবারের অনাগ্রহ। বেসরকারি সংস্থা নারী পক্ষ জানিয়েছে, তারা এক গবেষণায় দেখেছে, ২০১১ সাল থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ছয়টি জেলায় ৪ হাজার ৩৭২টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে, কিন্তু সাজা হয়েছে মাত্র ৫ জনের। আইসিডিডিআরবির জ্যেষ্ঠ গবেষক রুচিরা তাবাসসুম নভেদ জানান, ধর্ষণের শিকার নারী ও শিশু যে ধরনের ট্রোমায় ভোগে, তাকে বলে স্টেক ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার। যারা যুদ্ধে যায়, যাদের জীবনে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে, তাদের এ সমস্যা হয়। তিনি বলেন, মামলা করা ও বিচার চাওয়া তো বিরাট বিষয়। তেমন কিছু করতে হলে মেয়েটির জোরাল সমর্থন প্রয়োজন। 
ভিকটিম শিশুদের কেসস্টাডি থেকে জানা গেছে, কম বয়সি শিশুরা নিকট আত্মীয় ও প্রতিবেশির হাতে ধর্ষিত হয় বেশি। আর কিশোরীরা প্রেমে জড়িয়ে পড়ায় ধর্ষিত হয়। শিশুদের পরিসংখ্যান শতকরা ৩২ ভাগ আর প্রেমে জড়িয়ে পড়াদের পরিসংখ্যান শতকরা ২৯ ভাগ। ওয়ারীতে প্রতিবেশি এক রং মিস্ত্রির হাতে কয়েকমাস আগে ধর্ষিত হয় ১০ বছরের সুমাইয়া। নির্যাতনে শিশুটি মারাও যায়। শিশুদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের নির্বাহী পরিচালক রোকসানা সুলতানা বলেন, তারা একটি গবেষণা প্রতিবেদনে ৫০টি যৌন নির্যাতনের ঘটনা বিশ্লেষণ করেন। এতে দেখা যায়, ৪৬ জন নির্যাতনকারীই ছিল শিশুর পরিবারের সদস্য, পরিচিত ও আপনজন। সংগঠনটির অভিজ্ঞতা হলো শতভাগ শিশুই কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার। তাই শিশুর অভিভাবককে প্রথমেই বিশ্বাস করতে হবে যে, শিশুর বয়স যা-ই হোক না কেন, তারা যৌন নির্যাতনের শিকার হতে পারে। পরিবারের সব সদস্যকে বিশ্বাস করা যাবে না। 
শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফে) পরিচালক আবদুস সহিদ মাহমুদ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শিশুদের রক্ষায় সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। শিশুদের সুরক্ষায় বাজেট বাড়ানো ও তা বাস্তবায়নে সব মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় করার আহ্বান জানান তিনি। জানা যায়, ধর্ষণের মামলার প্রধান চেষ্টা থাকে আপসরফার। বিপক্ষের আইনজীবী, পুলিশ, ডাক্তার রাষ্ট্রপক্ষের অনেকের মধ্যে অবিশ্বাস ও মেয়েটির দোষ খোঁজার মানসিকতা থাকে। অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, গরিব হলে নির্যাতিতাদের বিপদ বাড়ে। তারা সমঝোতা করতে বাধ্য হয়। আদালতে এসে সাক্ষ্য দেয় ধর্ষণ করেনি। এ আপস ঠেকালেই অনেকে বিচার পাবে। বিষয়গুলো অভিভাবকদের সহায়তা করতে পারে। 
৫ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে দুই বোন ধর্ষণের মামলায় পাঁচজনকে যাবজ্জীবন সাজা দিয়েছেন আদালত। পাশাপাশি প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা করে অর্থদ- দেওয়া হয়েছে। একজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি ঘটে ২০১০ সালের ২৮ মে। নির্যাতনের শিকার এক বোন বাদী হয়ে মামলা করেন। এক বিবৃতিতে এ রায়কে সাফল্য বলে উল্লেখ করেছেন নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটি। কমিটির সভাপতি লক্ষ্মী চক্রবর্তী জানান, ২০১০ সাল থেকে এ মামলাটি নারায়ণগঞ্জ জেলা মহিলা  পরিষদ ভুক্তভোগীদের পক্ষে আদালতে আইনি সহায়তা দেয়।