আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১১-১০-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

মোমবাতি জ্বালিয়েও করা হয় ময়নাতদন্ত!

রামেক মর্গে হত্যার ঘটনা হয়ে যায় আত্মহত্যা

রাজশাহী ব্যুরো
| শেষ পাতা

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের (রামেক) মর্গের লাশকাটা ঘরে আছে ১৩টি রড লাইট। আছে ৯টি এনার্জি বাল্বও। কিন্তু একটাও জ্বলে না। ময়নাতদন্তের সময় যারা লাশ কাটেন তারা তিন গজের মতো বৈদ্যুতিক তার দিয়ে একটা লাইট জ্বালানোর ব্যবস্থা করেছেন। বিদ্যুৎ চলে গেলেই সে লাইট বন্ধ হয়ে যায়। তখন মোমবাতি জ্বালিয়েই লাশের ময়নাতদন্ত করতে হয়। ফলে উঠে আসে না মৃত্যুর সঠিক কারণ।

রাজশাহী মহানগরীর অভিজাত হোটেল নাইস ইন্টারন্যাশনালের একটি কক্ষ থেকে ২০১৬ সালে দুই তরুণ-তরুণীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ছেলেটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মিজানুর রহমান। আর মেয়েটি পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সুমাইয়া নাসরীন। রামেকের তৎকালীন ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ড. এনামুল হক লাশ দুটির ময়নাতদন্ত করেন। তার দেওয়া ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, সুমাইয়া নাসরীন ও মিজানুর রহমান খুব কাছাকাছি সময়ে আত্মহত্যা করেছেন।

কিন্তু এমন প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট হতে পারেননি আদালত। পরে ঘটনাটি আবার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় রাজশাহীর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। পিবিআই শুরুতেই হোটেলের ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার (সিসিটিভি) ফুটেজ ও ভিকটিমদের ফোন কল পর্যালোচনা করে। প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করা হয় আহসান হাবীব নামের এক যুবককে। তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। হাবিব জানান যে, ওই দুইজন আত্মহত্যা করেননি; তাদের হত্যা করা হয়েছে।

পিবিআইয়ের তদন্তে বেরিয়ে আসে, ব্যর্থ প্রেমের প্রতিশোধ হিসেবে খুন হন মিজানুর ও সুমাইয়া। সেদিন পাশের ভবনের ছাদ দিয়ে ঘাতকেরা হোটেল নাইসের ৩০৩ নম্বর কক্ষে ঢোকে। এরপর কয়েকজন মিলে প্রথমে সুমাইয়ার ওড়না দিয়ে গলা পেঁচিয়ে মিজানুরকে হত্যা করে। পরে মেঝেতে মিজানুরের লাশ রেখে সুমাইয়াকে ধর্ষণ করা হয়। ধর্ষণের পর বালিশ চাপা দিয়ে খুন করা হয় সুমাইয়াকেও। এরপর মিজানুরের সিলিংয়ের লাশ ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে দিয়ে তারা আবার নির্বিঘেœ চলে যায়।
মিজানুর ও সুমাইয়ার লাশের ময়নাতদন্ত করেছিলেন রামেকের ফরেনসিক বিভাগের তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান ডা. এনামুল হক। এ বছরের শুরুতে তিনি অবসরে গেছেন। দুই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর লাশের ময়নাতদন্তের ঘটনা মনে আছে তার। মনে আছে যে, তার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুর সঠিক কারণ উঠে আসেনি।
কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল। আমি যখন অবসরে যাই, তখনও প্রায় ৩০০টির মতো ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন জমা ছিল। যেগুলো দিয়ে আসতে পারিনি। এমন অনেক ঘটনা আছে, ময়নাতদন্তের সময় বিদ্যুৎ ছিল না। মোমবাতি বা টর্চ লাইটের আলোতে লাশ কাটা হয়েছে। সেক্ষেত্রে ভুল হতে পারে, প্রতিবেদন অন্য রকম আসতে পারে, এটা অস্বাভাবিক নয়।
এই চিকিৎসকের কথার সত্যতা জানতে বৃহস্পতিবার দুপুরে রামেক মর্গের লাশকাটা ঘরে যাওয়া হয়। তখন অ্যালকোহল পানে মারা যাওয়া নওগাঁর বদলগাছি উপজেলার ভা-ারপুর গ্রামের ছইমুদ্দিনের ছেলে শফিকুল ইসলাম (৩৫) ও বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার মাতাপুর গ্রামের অখিল চাকির ছেলে অলিক চাকির (৪০) লাশের ময়নাতদন্ত করা হচ্ছিল। দুটি লাশের জন্য জ্বলছিল একটি এনার্জি বাল্ব।
লাশকাটা ঘরে গুনে দেখা যায়, রড লাইট রয়েছে ১৩টি। সাধারণ লাইট লাগানো আছে আরও ৯টি। ফ্যানের সংখ্যা ১৬টি। তিনটি বোর্ডে থাকা সবগুলো সুইচ অন করে দেখা যায়, একটিও লাইট জ্বলছে না। ফ্যান চলছিল তিনটি। আর যে একটি এনার্জি বাল্ব জ্বলছিল সেটি বোর্ডের সঙ্গে সুইচ নেই। তিন গজের মতো বৈদ্যুতিক তার দিয়ে সকেটের সঙ্গে প্লাগ দিয়ে লাইটটি জ্বালানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। একটি লাশের সেলাই করছিলেন রনি নামের এক যুবক। তিনি জানালেন, তারা এই লাইটটির ব্যবস্থা করেছেন।
লাশকাটা ঘরের ভেতর দেখা গেল, মেডিকেল শিক্ষার্থীদের বসার জন্য কয়েক সারি বেঞ্চ পাতা রয়েছে। ময়নাতদন্তের বিষয়ে এখানে তাদের হাতেকলমে শিক্ষা দেওয়া হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফ্যান চলে না বলে গরমের সময় তারা সেখানে গিয়ে বসতে পারেন না। গরমের মধ্যে লাশ কাটা হলে খুব খারাপ দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা গিয়ে সেখানে বসতে পারেন না।
মর্গে লাশ কাটেন এমন আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ময়নাতদন্ত করা হয়। বিকাল ৪টার পর কোনো লাশ এলে আগামী দিনের জন্য রেখে দেওয়া হয়। কিন্তু আটটি লাশ রাখার মতো ফ্রিজ সাত থেকে আট বছর ধরেই নষ্ট। লাশকাটা ঘরে নেই পানির ব্যবস্থাও। লাশ কাটার পর রক্ত ধুয়ে ফেলতে দূর থেকে পানি আনতে হয় বালতিতে করে। এসব সমস্যার সমাধানের জন্য অনেকবারই মৌখিকভাবে কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। কিন্তু সমাধান হয়নি।
রামেকের মর্গে আগে তিন সপ্তাহ আগেও লাশের ময়নাতদন্ত করতেন ডা. মারুফুল আরেফিন। অসংখ্য লাশের ময়নাতদন্তের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। রামেকের লাশকাটা ঘরের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, একটা আদর্শ মর্গের প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো পর্যাপ্ত আলো থাকা। কিন্তু রামেকের মর্গ আধুনিক মর্গের সংজ্ঞার ভেতরে পড়ে না। লাইট জ্বলে না, ফ্যান চলে না। শিক্ষার্থীদের মানবদেহের সবকিছু দেখানো যায় না। বিদ্যুৎ চলে গেলে মোমবাতি জ্বালাতে হয়। এমন পরিবেশের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে ভুল আসাটা অস্বাভাবিক নয়। তাই ফরেনসিক বিভাগের উন্নয়ন নিয়ে ভাবতে হবে।
রাজশাহী জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখায়ের আলম বলেন, পুলিশের তদন্তে দেখা যাচ্ছে খুন হয়েছে, অথচ ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে আত্মহত্যা। এমন অনেক ঘটনা আছে। এ অবস্থায়  আমরা বিষয়টি আদালতকে অবহিত করি। আদালত তখন দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের নির্দেশ দেন। তখন দেখা যায়, সত্যিই হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছিল। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হলে এ ধরনের ভুল ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন যেসব কারণে আসে সেগুলো দূর করতে হবে।
রামেকের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. কফিল উদ্দিন বলেন, আমি দায়িত্বে এসেছি কিছু দিন হলো। মর্গে অনেক সমস্যা ছিল। কিছু কাটিয়ে উঠেছি, কিছু সমস্যা এখনও আছে। আমরা সেগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। আশা করছি, ধীরে ধীরে সবগুলোই কাটিয়ে উঠতে পারব। মর্গের আধুনিকায়নে এখন কী করা প্রয়োজন জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেক কিছুই করতে হবে।