আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১১-১০-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস

প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ২ শতাংশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
| প্রথম পাতা

চলতি অর্থবছরে (২০১৯-২০) বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ৭.২ শতাংশ হতে পারে বলে মনে করে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বিশ্বব্যাংক। যদিও এ প্রাক্কলন সরকারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১ শতাংশ কম। সংস্থাটির নিয়মিত প্রকাশনা বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ সম্পর্কিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এ সময় সংস্থাটির কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্সি টেম্বন, ঢাকা অফিসের সিনিয়র ইকনোমিস্ট বার্নার্ড হ্যাভেন, সাবেক লিড ইকোনোমিস্ট ড. জাহিদ হোসেনসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, গেল অর্থবছরে দেশের 

জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। আর চলতি অর্থবছরে বাজেটে সরকার ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের প্রবৃদ্ধির নতুন প্রাক্কলন সরকারের এ বছরের লক্ষ্যমাত্রা এমনকি গেল অর্থবছরের অর্জিত প্রবৃদ্ধির চেয়েও প্রায় এক শতাংশ কম। যদিও গেল জুনে বিশ্বব্যাংকের অপর এক প্রতিবেদনে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিল।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ বার্নাড হ্যাভেন বলেন, আর্থিক খাতের সুশাসন, রাজস্ব খাতের সংস্কার এবং উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) যথাসময়ে বাস্তবায়নে সংস্কার দরকার। এ ছাড়া ব্যবসায় পরিবেশও উন্নতি করতে হবে। অপর দিকে ব্যাংক খাত এখনও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। ব্যাংক থেকে যে ঋণ দেওয়া হয়, তা ঝুঁকিপূর্ণ থাকে। খেলাপি ঋণ বাড়ছে। এতে সরকারি ব্যাংকগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের গ্যারান্টি দেওয়ার কারণে ঋণপত্র খোলার খরচ আগের চেয়ে বেড়েছে। এছাড়া বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা, আর্থিক খাতে অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি এবং মুদ্রার বিনিময় হার সম্পর্কে সতর্ক হতে হবে, যা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতায় একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে বছরে শ্রম বাজারে প্রবেশ করা প্রায় ২০ লাখ তরুণের মানসম্মত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এ তরুণ শ্রমশক্তিতে কাজে লাগাতে মানবসম্পদ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। প্রতিযোগিতা সক্ষম জনবল তৈরিতে শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও নজর দিতে হবে। আবার তৈরি পেশাক ও প্রবাসী আয়ের উপর নির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখী আয়ের পথ যেমন রপ্তানি সহায়ক পণ্য উৎপাদন, হালকা প্রকৌশল খাত, শিপ বিল্ডিং, এগ্রিবিজনেস, আইসিটি এবং ওষুধ শিল্পে উচ্চ দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা সম্পন্ন শ্রমশক্তি তৈরি করতে হবে।
হ্যাভেন বলেন, উচ্চ উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষাব্যবস্থা খুবই জরুরি। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে দক্ষ জনশক্তির বিকল্প নেই। কিন্তু শ্রমবাজারের সমীক্ষায় দেখায়, নিয়োগকর্তারা দক্ষ প্রযুক্তিবিদ এবং পরিচালকদের উচ্চ দক্ষতার পদ পূরণের জন্য লড়াই করছেন, যাতে দক্ষ লোকের বিশাল ঘাটতি রয়েছে। 
এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। এর মধ্যে প্রফেশনালসের ক্ষেত্রে ৬৯ শতাংশ, টেকনিশিয়ান ও অ্যাসোসিয়েটস প্রফেসনালসের ক্ষেত্রে ৬২ শতাংশ, ম্যানেজার ৬১ শতাংশ, সার্ভিস ওয়ার্কার ৩৭ শতাংশ, ক্লারিক্যাল সার্ভিস ওয়ার্কার ৩৫ শতাংশ এবং কৃষি খাতে মাত্র এক শতাংশ দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি রয়েছে। এজন্য শিক্ষার তৃতীয় স্তরে (কলেজ) কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার উপর জোর দিতে হবে। গ্র্যাজুয়েটদের চাকরি না পাওয়া দক্ষতার ক্ষেত্রে শূন্যতাকে নির্দেশ করে। কলেজের স্নাতকদের মাত্র ১৯ শতাংশ পূর্ণকালীন বা খ-কালীন কর্মরত। তাদের এক-তৃতীয়াংশ স্নাতক হওয়ার এক বা দুই বছর বেকার থাকছেন।
প্রতিবেদনে প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের সরকারিভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি আনুমানিক ৮.১ শতাংশ বলে ধরা হয়েছিল, হয়েছে ৮.১৩ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের ৭.৯ শতাংশের তুলনায় বেশি ছিল। তবে আগামী অর্থবছরের ৭ দশমিক ২ শতাংশ এবং তার পরের বছর (২০২০-২১) তা ৭ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চলতি বছর মোট জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে তার মধ্যে কৃষি খাতে তিন শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে, যা গত অর্থবছরে ছিল তিন দশমিক পাঁচ শতাংশ। শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ১৩ শতাংশ থেকে কমে ৯ শতাংশ হতে পারে। তবে সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশ বেড়ে হতে পারে ৭ শতাংশ। ব্যক্তি খাতের ভোগ বৃদ্ধি পাবে। তা দাঁড়াতে পারে ৬ দশমিক ২ শতাংশে, যা গত অর্থবছরে ছিল পাঁচ দশমিক চার শতাংশ। সরকারি ভোগ ব্যয় ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৮ দশমিক এক শতাংশ। চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি হতে পারে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। গত অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার ছিল সাড়ে ৫ শতাংশ। এক্ষেত্রে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য ফসলের উৎপাদন ক্ষতির অন্তর্ভুক্তির কারণে মুদ্রাস্ফীতি সামান্য বৃদ্ধি পাবে।
সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্সি টেম্বন বলেন, প্রবৃদ্ধির সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ নয়। টেকসই প্রবৃদ্ধি ধারা ধরে রাখাই মূল বিষয়। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বেশ শক্তিশালী, সুদৃঢ় অর্থনৈতিক মৌলিক ভিত্তি এবং কাঠামোগত সংস্কার দৃঢ় প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করে। প্রবৃদ্ধি আরও টেকসই করতে উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে। এই প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে একটি উচ্চ উৎপাদনশীল অর্থনীতি প্রয়োজন হবে। এক্ষেত্রে উচ্চ স্তরের দক্ষতা এবং দ্রুত প্রযুক্তিগত অগ্রগতির জন্য শ্রম বাজারের চাহিদা অনুযায়ী মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেন বলেন, বর্তমানে বিশ্ববাজারে দুর্বলতা বিরাজ করছে। বিক্রয়মূল্য কমে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে। যুক্তরাষ্ট্রে চায়নিজ শুল্ক বসানো হচ্ছে। ক্রেতারা এখন সস্তায় বাজার খুলছে। বাজার সস্তা হয়ে যাচ্ছে। ভিয়েতনাম ও ভারতের সঙ্গে পেরে ওঠা যাচ্ছে না। এসব মোকাবিলা করা অন্যতম চ্যালেঞ্জ বলে জানান তিনি।