আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১১-১০-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

আবরার হত্যাকান্ড

মারার নির্দেশ সিক্রেট মেসেঞ্জার গ্রুপে

সাজ্জাদ মাহমুদ খান
| প্রথম পাতা

 আগের দিন হত্যার নির্দেশ দেন বুয়েট ছাত্রলীগ সাংগঠনিক সম্পাদক রবিন

 সময় বেঁধে দেওয়া হয় দুই দিন 

 আলোচিত অমিত সাহাসহ আরও তিনজন গ্রেপ্তার

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদ নিহত হওয়ার একদিন আগেই ‘মেরে হল থেকে বের করে’ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। আগের দিন শনিবার দুপুর ১২টা ৪৭ মিনিটে ছাত্রলীগের বুয়েট শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদি হাসান রবিন তাদের সিক্রেট ফেইসবুক গ্রুপে (এসবিএইচএসএল ১৬+১৭) আবরারকে মারার নির্দেশ দেন। নির্দেশ অনুযায়ী পরদিন রোববার সন্ধ্যায় আবরার ফাহাদ হলে ফিরলে রাত ৭টা ৫২ মিনিটে মনিরুজ্জামান সিক্রেট মেসেঞ্জারে সবাইকে নিচে নামতে বলেন। এরপর শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর রুমে নিয়ে শিবির সংশ্লিষ্টতার স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য আবরারকে বেধড়ক পেটানো হয়। পেটানোর এক পর্যায়ে মারা যান আবরার। সারারাতই সিক্রেট গ্রুপে আবরারকে নির্যাতনের বর্ণনার আপডেট দিতে থাকেন বুয়েট ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ হত্যাকা-ের তদন্ত প্রসঙ্গে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আবরার হত্যা অনেকগুলো বিষয়ের সমষ্টি। ঘটনার মোটিভ সম্পর্কে জানতে আমাদের আরও কয়েকদিন সময় লাগবে।’  

আবরার ফাহাদ হত্যায় জড়িত অভিযোগে বৃহস্পতিবার আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এদের মধ্যে আলোচিত ছাত্রলীগ নেতা অমিত সাহাও রয়েছেন। বাকি দুইজন হলেন আবরারের রুমমেট মো. মিজানুর রহমান এবং এজাহারভুক্ত আসামি হোসেন মোহাম্মদ তোহা। এ নিয়ে আবরার হত্যাকা-ে গ্রেপ্তারের সংখ্যা দাঁড়ালো ১৬ জনে। বুয়েট ছাত্রলীগের ফেইসবুকের সিক্রেট গ্রুপে কথোপকথনে পেটানোর পরিকল্পনা, নির্দেশনা এবং হত্যাকা-ের সময়কার চিত্র ফুটে উঠেছে। কথোপকথনের স্ক্রিনশর্ট আলোকিত বাংলাদেশের কাছে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, শনিবার দুপুর ১২টা ৪৭ মিনিটে মেহেদি হাসান রবিন মেসেঞ্জার গ্রুপে আবরারকে ‘মেরে হল থেকে বের করে’ দেওয়ার নির্দেশ দেন। ম্যাসেঞ্জারে যেসব কথোপকথন হয়েছে, সেগুলো হুবহু নিচে তুলে ধরা হলোÑ 

মেহেদী : ১৭ এর আবরার ফাহাদ। মেরে হল থেকে বের করে দিবি দ্রুত। এর আগেও বলছিলাম। তোদের তো কোনো বিকার নেই। শিবির চেক দিতে বলছিলাম।

মনিরুজ্জামান : ওকে ভাই।মেহেদী: বাল ওকে ভাই। দুই দিন টাইম দিলাম। 
মনিরুজ্জামান : ওকে ভাই।
মেহেদী : দরকার হলে ১৬-এর মিজানের সঙ্গে কথা বলিস। ও আরও কিছু ইনফো দিবে শিবির ইনভলভমেন্টের। নির্দেশ অনুযায়ী পরদিন রোববার সন্ধ্যায় আবরার ফাহাদ গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়া থেকে হলে ফিরলে রাত ৭টা ৫২ মিনিটে ছাত্রলীগ নেতা মনিরুজ্জামান সিক্রেট মেসেঞ্জারে সবাইকে নিচে নামতে বলেন। রাত ৮টা ১৩ মিনিটে আবরারকে নিজ কক্ষ থেকে ডেকে করিডোর দিয়ে দোতলার সিঁড়ির দিকে নিয়ে যান সাদাত, তানিম, বিল্লাহসহ কয়েকজন। 
ঘটনার রাত ১২টা ৩৮ মিনিটে সিক্রেট মেসেঞ্জার গ্রুপে অমিত সাহা জানতে চান, আবরার কী হলে আছে?
সাকিব : জী ভাই, ২০১১ তে আছে।
সামছুল : হ্যাঁ ভাই, ২০১১ তে।
রাত ১টা ২৬ মিনিটে মেহেদী মেসেঞ্জার গ্রুপে জিজ্ঞাসা করেন, তোরা আবরারকে ধরছিলি?
ইফতি: হ্যাঁ। 
মেহেদী : বের করছোস নাকি?
ইফতি : কী? হল থেকে নাকি স্বীকারোক্তি?
মেহেদী : স্বীকার করলে তো বের করা উচিত।
ইফতি : মরে যাচ্ছে, মাইর বেশি হয়ে গেছে। 
এভাবেই ফেইসবুকের সিক্রেট গ্রুপে আবরার ফাহাদকে নির্যাতন নিয়ে কথোপকথন চালান বুয়েট ছাত্রলীগের নেতারা। আবরার হত্যার ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, সেদিন রাত ১২টা ২৩ মিনিটে আশিকুল ইসলাম বিটু ২০১১ নম্বর রুমের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন। এর প্রায় ৭ মিনিট পর তিনি বেরিয়ে যান। ওই রাতে কী ঘটেছিল শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর রুমেÑ জানতে চাইলে বিটু বলেন, মনির, জেমি আর তানিমকে ফোন দিয়ে বলে আবরারকে ২০১১ নম্বর রুমে ডেকে আনতে। পরে দেখলাম দুইজন ওর দুটো ফোন ও ল্যাপটপ চেক করছে। পরে রাত সাড়ে ১২টার দিকে আমি আবার আমার ল্যাপটপ ও বই নিতে রুমে এসে দেখি আবরার একদম মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে। সেখানে আবরারের ব্যাচেরও সাত থেকে আটজন ছিল। 
ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার মাসুদুর রহমান জানান, আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় তার রুমমেট মিজানুর রহমান, ছাত্রলীগ নেতা অমিত সাহা এবং এজাহারভুক্ত আসামি হোসেন মোহাম্মদ তোহাকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। এ নিয়ে আলোচিত এ মামলায় মোট ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হলো। তাদের মধ্যে চারজনের নাম মামলার এজাহারে ছিল না। এজাহারে নাম না থাকলেও তদন্তে তাদের সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। সে কারণে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রথম দফায় গ্রেপ্তার হওয়া ১০ বুয়েট শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং ‘তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে’ ওই হত্যাকা-ে তাদের জড়িত থাকার বিষয়ে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে।
ডিবি পুলিশ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর সবুজবাগ এলাকায় এক আত্মীয়ের বাসা থেকে অমিত সাহাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বুয়েটের শেরেবাংলা হলের যে ২০১১ নম্বর কক্ষে রোববার রাতে কয়েক ঘণ্টা ধরে নির্যাতন চালিয়ে আবরার ফাহাদকে হত্যা করা হয়, সে কক্ষেরই আবাসিক ছাত্র অমিত সাহা। আবরারের রুমমেট মিজানুর রহমানকেও বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ওই কক্ষ থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মিজান বুয়েটের ওয়াটার রিসোর্সেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। আবরারের বাবার করা হত্যা মামলায় ১৯ জনের মধ্যে মিজানেরও নাম ছিল না। ওই মামলার এজাহারের ১১ নম্বর আসামি হোসেন মোহাম্মদ তোহাকে বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টার দিকে গাজীপুরের মাওনা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। যন্ত্র প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র তোহা থাকতেন শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে। তিনিও হল শাখা ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
বৃহস্পতিবার ডিএমপি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদকে একটিমাত্র কারণে হত্যা করা হয়েছে, তা এখনই বলা যাবে না। ঘটনার মোটিভ সম্পর্কে জানতে আমাদের আরও কয়েকদিন সময় লাগবে। রিমান্ডে থাকা আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অন্যদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। আবরার হত্যাকা-ে অভিযুক্তদের অধিকাংশই ছাত্রলীগের রাজনীতি করে বলে প্রমাণিত হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘কে কোন দলের সঙ্গে জড়িত, পদ-পদবি কি তা আইনে দেখার সুযোগ নেই। এটি দেখাও হচ্ছে না। পাশাপাশি সামাজিক অবস্থান তদন্তের ক্ষেত্রে যেন প্রভাব বিস্তার না করে, সে ব্যাপারে চৌকস টিমগুলো কাজ করছে।’ 
ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি নিয়ে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ায় খুন হন বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ। ভারতের সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতা করে শনিবার বিকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন তিনি। এর জের ধরে রোববার রাতে শেরেবাংলা হলের নিজের ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে তাকে ডেকে নিয়ে ২০১১ নম্বর কক্ষে বেধড়ক পেটানো হয়। এতে তিনি মারা যান। হত্যাকা-ের প্রমাণ না রাখতে সিসিটিভি ফুটেজ মুছে (ডিলেট) দেয় খুনিরা। তবে পুলিশের আইসিটি বিশেষজ্ঞরা তা উদ্ধার করতে সক্ষম হন। এ ঘটনায় বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ ও সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেলসহ ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতদের এজাহারভুক্ত ১২ জন হলেন মেহেদী হাসান রাসেল, মো. অনিক সরকার, ইফতি মোশাররফ সকাল, মো. মেহেদী হাসান রবিন, মেফতাহুল ইসলাম জিওন, মুনতাসির আলম জেমি, খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভির, মুজাহিদুর রহমান, মুহতাসিম ফুয়াদ, মনিরুজ্জামান মনির, আকাশ হোসেন ও হোসেন মোহাম্মদ তোহা। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে এজাহার বহির্ভূত চারজন হলেন ইসতিয়াক আহম্মেদ মুন্না, অমিত সাহা, মো. মিজানুর রহমান ওরফে মিজান ও শামসুল আরেফিন রাফাত।