আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৮-১২-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

রূপগঞ্জে ছাড়পত্র নেই ৯৫ শতাংশ ইটভাটার

শিগগিরই অভিযান ৩০ হাজার শ্রমিক আতঙ্কে

রিয়াজ হোসেন, রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ)
| দেশ

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ইটভাটায় নতুন ইট তৈরিতে ব্যস্ত শ্রমিক। ছবিটি ভোলাব এলাকা থেকে তোলা- আলোকিত বাংলাদেশ

খুলনার পাইকগাছা থানাধীন খৌইর এলাকার মৃত আইনউদ্দিন মিস্ত্রির ছেলে ইজ্জত আলী মিস্ত্রি। ব্যক্তিগত জীবনে তিন সন্তানের জনক ইজ্জত মিস্ত্রি জীবিকার যুদ্ধের চেয়ে জীবনযুদ্ধে পরাস্ত হয়েছেন সর্বাধিক। বাবার ওয়ারিশসূত্রে পাওয়া এক শতক জমিতে তার যে আবাসস্থল সেটিতে সিডর-আইলার পর আঘাত হেনেছে সর্বশেষ বুলবুলও। হেলেপড়া ঘর মেরামত আর বছরের জীবিকার তাগিদে কাজের সন্ধানে এ পৌঢ় জীবনে ৪০ বছরের স্ত্রী রাহেলা আর বাকপ্রতিবন্ধী ছেলে আলআমিনকে নিয়ে এসেছেন রূপগঞ্জের একটি ইটভাটায়। আল্লাহ আর প্রতিবেশীদের ভরসায় বাড়িতে রেখে এসেছেন সদ্য যৌবনে পা  রাখা কন্যা ফাহিমা (১৭) আর ছোট মেয়ে সোনামনিকে (১২)। ইটভাটায় তিনজন মিলে ৬ মাস কাজ করতে পারলেই নিশ্চিত হবে তাদের বছরের আহার আর ঘরপোক্ত করার স্বপ্ন। ইজ্জত আলীর মতোই ইটভাটায় কাজ করা প্রতিটি শ্রমিকের জীবন আর জীবিকার গল্প একই। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ও ভোলাব ইউনিয়নের সব জনপদে রয়েছে জীবিকার দুটি মাত্র মাধ্যম ইটভাটা ও কৃষি কাজ। এছাড়া গোলাকান্দাইল, ভুলতা ইউনিয়ন ও কাঞ্চন এবং তারাব পৌরসভা মিলিয়ে সমগ্র রূপগঞ্জে রয়েছে শতাধিক ইটভাটা। এসব ইটভাটায় দেশের অভাবি ও মঙ্গাকবলিত অঞ্চল কুড়িগ্রাম, রংপুর, লালমনিরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, পাবনা, কুষ্টিয়া ও গাইবান্ধাসহ স্থানীয় এলাকার প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। বছরের নভেম্বর থেকে শেষ এপ্রিল পর্যন্ত ৬ মাস কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সারা বছরের জীবিকার উৎস খোঁজেন এসব অভাবি মানুষ। সম্প্রতি রাজধানীর পরিবেশ দূষণে ‘পরিবেশ ও হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’-এর দায়ের করা রিটের পক্ষে হাইকোর্টের বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কামরুল কাদেরের যৌথ বেঞ্চ রাজধানীর পরিবেশ দূষণের দায়ে ইটভাটাকে ৫২ শতাংশ দায়ী করা ঢাকাসহ আশপাশের নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জ জেলার সব অবৈধ ইটভাটা বন্ধের নির্দেশ দেয়। অপরদিকে এসব অঞ্চলের ৯৫ শতাংশ ইটভাটায় সব কাগজপত্র থাকলেও পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র না পাওয়ায় ৯৫ শতাংশ ভাটাই অবৈধ হিসেবে বিবেচ্য। এ কারণে যে কোনো সময় শ্রমিকদের কাজের শুরুতেই কর্মক্ষেত্রটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক পেয়ে বসেছে। অন্যদিকে অধিকাংশ ইটভাটা স্থানীয় বেকার শ্রমিকরা যৌথ অংশীদারের ভিত্তিতে গড়ে তুলেছেন। তাদের অনেকে ঋণ গ্রহণ, জমি বিক্রি বন্ধসহ উচ্চসুদে দাদন নিয়ে ভাটায় অংশীদার হয়েছেন। একেকটি ভাটায় ১০ থেকে ৩০/৪০ জন পর্যন্ত মালিক রয়েছে। আর প্রতিটি ভাটার মূলধন কমপক্ষে এক থেকে সোয়া কোটি টাকা। চলতি সময়ে ইটভাটাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হলে শুধু রূপগঞ্জ উপজেলার ভাটাতেই শত কোটি টাকা লোকসান গুনবে এসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। অন্যদিকে ৫ জেলার সব ইটভাটা বন্ধ করে দেওয়া হলে আগামী মৌসুমে দেশে আবারও মঙ্গা আঘাত হানতে পারে বলে আশংকা সংশ্লিষ্টদের। এ বিষয়ে দাউদপুর ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এটিএম জাহাঙ্গীর আলম বলেন, রূপগঞ্জ উপজেলার ৯৮ শতাংশ ইটভাটায় ঝিকঝাক চিমনি ব্যবহার করা হয়, যা ক্ষতিকারক কালো ধোঁয়া শোধন করে। হঠাৎ ভাটাগুলো বন্ধ হয়ে গেলে অন্তত হাজারখানেক মালিকসহ আমাদের ৩০ হাজার শ্রমিক রাস্তায় বসবে। আমাদের দাবি চলতি মৌসুম পর্যন্ত অন্তত ঝিকঝাক চিমনির জন্য হলেও আমাদের সুযোগ দেওয়া হোক। তারপর যদি আমরা ভাটাগুলো বৈধ করতে না পারি তাহলে বন্ধ করে দিব। সরকার আমাদের করুণদশা বিবেচনা না করলে আমাদের অনেকের আত্মহননের পথ বেছে নিতে হবে। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মমতাজ বেগম বলেন, বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তরের। তারাই মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা মোতাবেক আমাদের সঙ্গে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করছেন। এখন পরিবেশ অধিদপ্তর যদি আমাদের সহায়তা চান তাহলে আইনগতভাবে আমরা নিষ্ক্রিয় থাকতে পারি না।