আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২০-০১-২০২০ তারিখে পত্রিকা

প্রবাসে নারী শ্রমিকের যন্ত্রণাময় জীবন

অভিবাসী

বিশ্বজিত রায়
| সম্পাদকীয়

 

সরকারি মাধ্যম ব্যতীত দালাল চক্রের বরাতে যারা বিদেশে যাচ্ছে সেদিকে নজর দিয়ে পাচার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা অতীব প্রয়োজন। নইলে ধস নামবে প্রবাসী আয়ে

পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে প্রতিটি মানুষই স্বপ্ন দেখে। তাই নিজেদের অভাব-অনটন দূর করতে বিভিন্ন কর্মের মাধ্যমে যুক্ত হয় তারা। সবাই পরিশ্রম করে আয়-উপার্জনের মাধ্যমে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়। সেই ভাগ্য পরিবর্তনের উদ্দেশ্যেই তারা ছুটে চলে দেশ-দেশান্তর। নিজের মধ্যে লালিত স্বপ্ন বাস্তবে রূপদান করতে নারী-পুরুষ সবাই জোরকদমে এগিয়ে চলেছে। মাধ্যম হিসেবে তারা যে কোনো কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হচ্ছে। সেই কর্মস্থলটা হোক দেশ কিংবা বিদেশ, হোক নিরাপদ কিংবা অনিরাপদ। আমাদের দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না থাকায় ভিনদেশে গিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ গ্রহণ করতে হয় আমাদের। তাই নতুন স্বপ্ন নিয়ে নারী-পুরুষ উভয়েই পাড়ি জমাচ্ছে বিদেশে। এতদিন পুরুষরা বিদেশে কাজের সন্ধানে গেলেও বিগত কয়েক বছর ধরে নারীরাও সেই পথে পা বাড়িয়েছে। যদিও নারীদের জন্য বিদেশ যাত্রা অত্যন্ত বিপদসংকুল ঝুঁকিপূর্ণ, তারপরও চ্যালেঞ্জ নিয়েই দেশের বাইরে যাচ্ছেন আমাদের নারী শ্রমিকরা।
বর্তমান সরকার বাইরে নারী শ্রমিক প্রেরণের সুযোগ সৃষ্টি করায় অনেক নারীই বিদেশ যেতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। গেল কয়েক বছরে অসংখ্য নারী শ্রমিক হিসেবে বিদেশে যাত্রা করেছেন। কিন্তু তাদের সেই যাত্রা যেন পুরোপুরি অনিরাপদ, অনিশ্চিত পথেই পা বাড়ানো হয়েছে বৈকি। অসচ্ছল পরিবারে সচ্ছলতার সন্ধান পাইয়ে দিতে যেসব নারী শ্রমিক হিসেবে বিদেশ যাত্রা করেছেন তাদের অভাবতাড়িত ভগ্ন জীবন ঘোর অন্ধকারে পতিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। বিদেশে পাড়ি জমানো প্রায় প্রতি জনকেই প্রতিনিয়ত অচেনা-অজানা পরিবেশে নিজেদের মানিয়ে নিতে অনাকাক্সিক্ষত, অনভিপ্রেত, অশালীন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। চোখের জলে ভাসা এই দুর্বিষহ প্রবাস জীবন থেকে মুক্তি চাইছেন অজানা অনেক নারী শ্রমিক। বিদেশে শ্রমিক হতে গিয়ে যৌনদাসী কিংবা নিজেদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বিক্রয় পণ্য অর্থাৎ যৌনতার বিকৃত সামগ্রী হওয়া কতটা সমর্থনযোগ্য?
প্রবাসে নারী শ্রমিকরা কতটা করুণ বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে সেটা পত্রিকান্তরে প্রকাশ পাচ্ছে। চরম অমানবিকতা ও যৌন হেনস্তার শিকার অনেক নারী দেশে ফেরার আকুতি জানাচ্ছেন, কেউবা দেশে ফিরে সেই ভয়াল যন্ত্রণার কথা সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরেছেন। ভাগ্য পরিবর্তন করতে গিয়ে এখন তারা চোখের জলে হাবুডুবু খাচ্ছেন। দেশের বাইরে অবস্থানরত অজানা অসংখ্য নারীর অসহায়ত্ব এবং দেশে ফেরার অশ্রুভেজা আবদার সংশ্লিষ্ট সংবাদ যে কাউকেই তাড়িত করবে। কতটা অসহায় যন্ত্রণার মধ্যে থাকলে একজন নারী কেঁদে কেঁদে নিজেকে বাঁচানোর মিনতি জানাতে পারে! যা বোধশক্তির সুস্থ কপাটে বারবার কড়া নাড়ে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশে অবস্থানরত বেশ কয়েকজন নারী ভিডিও বার্তাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে যেভাবে নিজেকে রক্ষার অনুরোধ জানিয়েছেন, সেটা খুবই বেদনাদায়ক ও হৃদয়স্পর্শী। মন দুর্বল হয়ে আসা এই অশ্রুপতিত আর্তনাদ স্বজন, স্বামী, সন্তানদের নিঃসন্দেহে ব্যথিত করে তুলবে। একজন সমাজ সচেতন মানুষ হিসেবে আমাকেও ব্যাপকভাবে তাড়িত করছে এই প্রবাস আর্তনাদ। অজান্তেই ভাবনার অকূল সাগরে ভেসে চলি। প্রশ্ন জাগে মনেÑ কোথায় পাঠানো হয়েছে আমাদের কর্মোৎসাহী নিরুপায় নারীদের? জেনে, শুনে, বুঝেই কি এদের অনিরাপদ জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে? না, জেনে শুনে আমাদের মা, বোন, বধূদের নারিত্ব বিক্রির হাটে প্রেরণ করা হয়েছে? মন দুর্বল করা প্রেক্ষাপটে সেই প্রশ্নটা না করে পারছি না।
আমাদের কর্মক্ষম নারীদের বিদেশমুখিতা দেশের অর্থনীতিতে আশার সঞ্চার ঘটিয়েছিল। ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে বিগত কয়েক বছরে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্নভাবে রেকর্ডসংখ্যক নারী বিদেশে গমন করেন। ২০১৪ সালের জুন মাস থেকে গেল বছরের নভেম্বর পর্যন্ত বিশ্বের ৭৪টি দেশে কাজ নিয়ে ৮ লাখ ৬৮ হাজার ৩৬৩ জন নারীকর্মী বিদেশ গেছেন। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে যান সবচেয়ে বেশি। দেশটিতে এই পাঁচ বছরে মোট নারী শ্রমিক গেছেন ৩ লাখ ৩০ হাজার ৫৯০ জন। এর মধ্যে ৮ হাজার কর্মী নির্যাতনের শিকার হয়ে বিভিন্ন সময় দেশে ফিরলেও অমানবিক অত্যাচারে না ফেরার দেশে চলে গেছেন ৫৩ জন নারী শ্রমিক। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ৮৫০ জন নারী দেশে ফিরে আসেন। তারা যৌন নিপীড়নসহ নানা ধরনের নির্যাতনের কথা জানিয়েছেন। [সূত্র : সময়ের আলো, ২৫.১২.১৯]।
সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকজন নারীর করুণ পরিণতির কথা সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। নির্যাতিত নারী শ্রমিকরা অভিযোগ করেন, এক হাজার রিয়েল বেতনের কথা বলে গিয়ে ৭০০ বা ৮০০ রিয়েল বেতন দিচ্ছে, যা বাংলাদেশি ১৫ হাজার টাকার সমান। অনেক ক্ষেত্রে বেতনই দেওয়া হয় না এবং বেতন চাইলেই নির্যাতন বেড়ে যায়। খবরে বলা হয়, ঢাকার যাত্রাবাড়ীর তানিয়া সৌদি আরবে যেখানে কাজ করতেন সেখানে পিটিয়ে তার পা ভেঙে দেওয়া হয়। ১৫ নভেম্বর সৌদি আরবে নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে ফেরত আসা গৃহকর্মী সুমি আক্তারকে তার বাবা-মায়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অষ্টম শ্রেণি পাস করা সেই সুমি দুই বছর আগে ঢাকায় একটি গার্মেন্টে চাকরি নেন। সেখানেই নুরুল ইসলাম নামের এক যুবকের সঙ্গে পরিচয় অতঃপর বিয়ে। একপর্যায়ে স্বামী নুরুল ইসলাম ‘রূপসী বাংলা ওভারসিজ’ নামের এক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাকে গৃহকর্মী ভিসায় সৌদি আরবের রিয়াদে পাঠান। সেখানে যাওয়ার পর প্রথম কর্মস্থলে মালিক তাকে মারধর, হাতের তালুতে গরম তেল ঢেলে দেওয়া এবং কক্ষে আটকে রাখাসহ বিভিন্নভাবে নির্যাতন করতেন। একপর্যায়ে সুমি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন ওই মালিক তাকে না জানিয়ে ইয়েমেন সীমান্ত এলাকায় নাজরানের এক ব্যক্তির কাছে প্রায় ২২ হাজার রিয়ালে বিক্রি করে দেন। ওই মালিকও তাকে নির্যাতন করতেন। উদ্ধার হওয়ার আগে ১৫ দিন তাকে ঘরের মধ্যে আটকে রাখা হয়েছিল। ঠিকমতো খাবার দেওয়া হয়নি। তার নিজের মুঠোফোনটিও তারা নিয়ে নিয়েছিল। এক সময় খুব কান্নাকাটি করে স্বামীর সঙ্গে একটু কথা বলার জন্য মোবাইলটি চেয়ে নেন তিনি। তারা মোবাইলটি দিলে, বাথরুমে গিয়ে একটি ভিডিও ধারণ করেন। সেই ভিডিওতে নিজের নির্যাতনের কথা বর্ণনা দেন তিনি। ভিডিওটি সঙ্গে সঙ্গে তার স্বামীর কাছে পাঠিয়ে দেন। পরে ওই ভিডিওটি সুমির স্বামী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সৌদিতে নিযুক্ত বাংলাদেশি কনস্যুলেট সৌদি পুলিশের সহযোগিতায় সুমিকে উদ্ধার করে বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।
সৌদি ফেরত নারীদের এই নির্যাতিত বর্ণনা শিউরে উঠার মতো। প্রবাসে নারীদের প্রতি এই অমানবিক আচরণে ক্ষুব্ধ নারী অধিকার ও অভিবাসন নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠন। পাশাপাশি জাতীয় সংসদেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সবাই সৌদি আরবে নারীকর্মী পাঠানো বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন জানিয়েছেন, সরকার এ নিয়ে আলোচনা করছে যে, কী করা যায়। বাসাবাড়িতে যারা কাজ নিয়ে যায়, তাদের ক্ষেত্রেই এ সমস্যাটা খুব প্রকট। সেজন্য আমরা চিন্তাভাবনা করছি, বাসাবাড়িতে পাঠানো কমিয়ে দেওয়া যায় কি না। এখনও চূন্তান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে এ বিষয় নিয়ে তারা আলোচনা করছেন এবং আলোচনায় একটা সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিদেশে নারী শ্রমিক প্রেরণে উদ্যোগী বর্তমান সরকার প্রবাসী আয় বৃদ্ধিসহ বেকারত্ব, দরিদ্র্যতা ও নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করতেই হয়তো এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তখন সরকারের এই উদ্যোগ উল্লেখিত সমস্যা দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এমনটাই প্রতীয়মান হয়েছিল। এর মাধ্যমে অসচ্ছল পরিবারে যেমন সচ্ছলতা ফিরে আসার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল, তেমনি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিসহ নারীদের মধ্যে এক কর্মমুখী বিপ্লব গড়ে ওঠার ইঙ্গিত আঁচ করছিল সাধারণ মানুষ। কিন্তু প্রবাসে নারীদের ওপর চালানো অসহ যৌন যন্ত্রণার পাশাপাশি নানাবিধ অত্যাচার-নিপীড়ন সরকারের ইতিবাচক চিন্তাধারায় চরম দুশ্চিন্তার রেখা টেনে দিয়েছে। প্রবাসে পীড়নের শিকার হাজারও নারীর মধ্যে যারা কোনো না কোনোভাবে তাদের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে যেভাবে আপনজন, সরকার ও দেশবাসীর কাছে নিজেদের রক্ষার আকুতি জানিয়েছেন তাতে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। এতে সরকারের প্রবাসী কল্যাণ কর্ম যেন সাধারণ মানুষের মাঝে অসন্তুষ্টি, অবিশ্বাস ও অশনি বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে।
যদিও নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে, তারপরও এর মাঝে অনেক অদেখা দায়িত্বহীনতা থেকে যেতে পারে, যার জন্য আমাদের নারী শ্রমিকরা অসম্ভব অত্যাচারের শিকার হচ্ছেন। এতে যদি সংশ্লিষ্টদের গাফিলতি থেকে থাকে তাহলে দিন দিন কমে আসবে নারীদের বিদেশ প্রবণতা। তার সঙ্গে কমতে থাকবে দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হওয়া প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। এ সংক্রান্ত সবকিছুতেই সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। কাউকে বিদেশ পাঠানোর আগে প্রথমে নিশ্চিত হওয়া দরকার, কোথায়, কার কাছে পাঠানো হচ্ছে আমাদের কর্মে ইচ্ছুক নারী শ্রমিকদের। সরকারি মাধ্যম ব্যতীত দালাল চক্রের বরাতে যারা বিদেশে যাচ্ছে সেদিকে নজর দিয়ে পাচার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা অতীব প্রয়োজন। নইলে ধস নামবে প্রবাসী আয়ে। তাই সময় থাকতে সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। হ

বিশ্বজিত রায়
সাংবাদিক ও কলামিস্ট[email protected]