আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২০-০১-২০২০ তারিখে পত্রিকা

মজুরি কমিশনের সুফল নিয়ে সংশয়ে পাটকল শ্রমিকরা

-খুলনার ৯ পাটকলে সপ্তাহে বাড়তি মজুরি গুনতে হবে সাড়ে ৩ কোটি টাকা -বকেয়া ৩৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা -অর্থ জোগানের কোনো সংস্থান নেই

মুহাম্মদ নূরুজ্জামান, খুলনা
| প্রথম পাতা

লাগাতার আন্দোলনের পর মজুরি কমিশন বাস্তবায়নের দাবি পূরণ হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিকদের। মজুরি কমিশন বাস্তবায়নের সিøপও হাতে পেয়েছেন শ্রমিকরা। এমনকি ৯ জানুয়ারি থেকে মজুরি কমিশন অনুযায়ী মজুরিও যোগ হতে শুরু করেছে তাদের পাওনার খাতায়। নতুন মজুরি স্কেল অনুযায়ী ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ মজুরি বেড়েছে শ্রমিকদের। 

এদিকে, নতুন মজুরি স্কেল অনুযায়ী খুলনার ৯টি পাটকলের শ্রমিকদের সাপ্তাহিক মজুরি বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা। আগে সাপ্তাহিক মজুরি প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা প্রদান করতে হলেও এখন প্রায় ৭ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। এছাড়া শ্রমিকদের আট সপ্তাহ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৩ মাসের বেতন বাবদ বকেয়া রয়েছে প্রায় ৪০ কোটি টাকা। 

অন্যদিকে, বিপুল অঙ্কের এ অর্থ পরিশোধের জন্য অর্থ জোগানের পথ দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। মজুদকৃত পণ্য বিক্রি না হলে সরকারের ভর্তুকি ছাড়া এ অর্থ পরিশোধের বিকল্প কোনো পথ নেই। এ অবস্থায় মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন হলেও শ্রমিকরা এখনও তার সুফল কতটুকু ভোগ করতে পারবেন, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। 
বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন-বিজেএমসির খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের সূত্র জানান, মজুরি কমিশন বাস্তবায়নের আগ পর্যন্ত, অর্থাৎ গেল বছর ২৮ নভেম্বর খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত আলিম জুট মিলে ১৩ লাখ ৪২ হাজার টাকা সাপ্তাহিক মজুরি পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু নতুন মজুরি কমিশন অনুযায়ী ১৬ জানুয়ারি এ মিলে মজুরি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। একইভাবে কার্পেটিং জুট মিলে ১০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২০ লাখ টাকা, ক্রিসেন্ট জুট মিলে ৮১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ কোটি ৭২ লাখ ৫১ হাজার টাকা, দৌলতপুর জুট মিলে ৫ লাখ ৬ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ইস্টার্ন জুট মিলে ২০ লাখ ৫৩ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৫২ লাখ ৩০ হাজার টাকা, জেজেআই জুট মিলে ৪২ লাখ ১৩ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৭৪ লাখ টাকা, খালিশপুর জুট মিলে ২৯ লাখ ৫১ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৭০ লাখ টাকা, প্লাটিনাম জুট মিলে ৭৩ লাখ ৯৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং স্টার জুট মিলে ৫৪ লাখ ৪৯ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ কোটি ৬ লাখ টাকার প্রয়োজন হবে। 
অন্যদিকে, ২০১৫ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন মজুরি কমিশন বাস্তবায়নের সময় (কার্যকর) দেখানো হয়েছে। সে মোতাবেক অতিরিক্ত প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। যদিও এ হিসাব এখনও চূড়ান্ত করা হয়নি। 
এ সূত্র জানান, উল্লিখিত ৯টি জুট মিলে শ্রমিকের আট সপ্তাহের মজুরি বকেয়া রয়েছে, যার পরিমাণ ৩০ কোটি ৬০ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। এছাড়া উল্লিখিত মিলগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তিন মাসের বেতন বাবদ বকেয়া রয়েছে ৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। সবমিলে মোট বকেয়ার পরিমাণ ৩৯ কোটি ২৯ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। যে অর্থ দ্রুতই পরিশোধ করা প্রয়োজন হবে। 
এ বিষয়ে বিজেএমসির খুলনা আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. বনিজ উদ্দিন মিঞা বলেন, করপোরেশনের নির্দেশনা অনুযায়ী খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি পাটকলের শ্রমিকের ১৬ জানুয়ারি মজুরির প্রথম সিøপ দেওয়া হয়েছে। নতুন মজুরি স্কেল অনুযায়ী শ্রমিকের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ মজুরি বেড়েছে। কিন্তু আপাতত এ পরিমাণ অর্থ পরিশোধের কোনো সংস্থান নেই। তিনি বলেন, পাটকলে মজুদকৃত পণ্য বিক্রি করতে পারলে মোটামুটি মজুরি পরিশোধ করা সম্ভব হবে। অন্যথায় সরকারকে ভর্তুকি বা সরকারি অর্থায়নের কোনো বিকল্প নেই। 
বিজেএমসি সূত্র জানায়, ২০১৫ সালে পে-কমিশনের সঙ্গে মজুরি কমিশন ঘোষণা করা হয়। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের ঘোষিত মজুরি কমিশন বাস্তবায়নে শ্রমিকদের আন্দোলনে নামতে হয়। দীর্ঘ সাড়ে ৪ বছর আন্দোলনের পর শ্রমিকের আমরণ অনশনের মধ্যদিয়ে সম্প্রতি সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিকদের ১১ দফার মধ্যে অন্যতম মজুরি কমিশন বাস্তবায়নের দাবি মেনে নেয়। 
সাধারণ শ্রমিক আবদুস সালাম মিয়া বলেন, এবার ছেলেমেয়েদের নিয়ে দুই বেলা দু-মুঠো ভাত খেতে পারব। সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে পারব। অন্য শ্রমিকের মতো তার চোখে-মুখেও দেখা যায় হাসির ঝিলিক।