আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২০-০১-২০২০ তারিখে পত্রিকা

একদিনে বেড়েছে ২৩২ পয়েন্ট

প্রত্যাশিত উত্থান পুঁজিবাজারে

সাখাওয়াত হোসেন
| প্রথম পাতা

গেল এক বছর খুঁড়িয়ে চলা পুঁজিবাজারের মেরুদণ্ড যেন রোববার সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের উদ্যোগ, ব্যাংকের বিনিয়োগ আর তালিকাভুক্ত শীর্ষ কোম্পানিগুলোর ইতিবাচক সিদ্ধান্তে নতুন রেকর্ডের দিকে মুখ তুলেছে প্রধান সূচক ডিএসইএক্স। সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগের বিপরীতে পুঁজিবাজারের উত্থান হোক সেটাই কাম্য ছিল বাজার বিনিয়োগকারীদের। আর সেই প্রত্যাশার প্রত্যাশিত উত্থান দেখাল পুঁজিবাজার। দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স চালু হওয়ার পর রোববারই তা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। একদিনে বেড়েছে ২৩২ পয়েন্ট। ডিএসইএক্স সূচক ২০১৩ সালে যাত্রা শুরু করে। তখন সূচকটির ভিত্তি পয়েন্ট ছিল ৪ হাজার ৫৬ পয়েন্ট। এরপরে গেল ৭ বছরের মধ্যে রোববার সূচকটির সর্বোচ্চ উত্থান হয়েছে। এর আগে ২০১৫ সালের ১০ মে সূচকটি ১৫৫ পয়েন্ট বেড়েছিল।

জানা গেছে, পুঁজিবাজারের মন্দা কাটাতে গেল সপ্তাহে শেষের দিকে নেওয়া হয় বেশ কিছু উদ্যোগ।  এরমধ্যে ১৬ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী পুঁজিবাজারের উন্নয়নে উচ্চ পর্যায়ের নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং বেশ কিছু নির্দেশনা দেন, যা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করে। এছাড়া স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের পরিচালকদের শেয়ার ক্রয়ের ঘোষণা, গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পদে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ইয়াসির আজমানকে নিয়োগ ও তারল্য সংকট নিরসনে সরকারি ৪ ব্যাংকের বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারে প্রভাব ফেলে, যা রোববারের লেনদেনের পর বড় উত্থানে রূপ নিয়েছে।

বাজার বিনিয়োগকারী মোজাম্মেল হক বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সবক’টিই ইতিবাচক। পুঁজিবাজারের মন্দা কাটাতে আগেও বেশ কয়েকবার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যাশিত উত্থান পুঁজিবাজারে

মাধ্যমেও পুঁজিবাজারের মন্দা কাটাতে দেওয়া হয়েছে সুযোগ সুবিধা। কিন্তু তাতেও কার্যকর কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। এবার প্রধানমন্ত্রী নিজে পুঁজিবাজারের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়ায় সেটিই মূলত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সৃষ্টি করেছে। 
তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে পুঁজিবাজারে মন্দা থাকায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা বর্তমানে শূন্যের কোটায়। এখন যে উত্থান দেখা যাচ্ছে সেটি যদি আবার পতনে ফিরে যায় তাহলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও খারাপের দিকে যাবে। তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত হবে পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা ফিরাতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা। 
বাজার বিশ্লেষক দেবব্রত কুমার সরকার আলোকিত বাংলাদেশকে জানান, রোববার পুঁজিবাজারে যে হঠাৎ উত্থান হয়েছে সেটি একদিক দিয়ে বিবেচনা করলে অস্বাভাবিক বলা যায়। কিন্তু পুঁজিবাজারের জন্য প্রধানমন্ত্রী যেসব নির্দেশনা দিয়েছে তার আলোকে পুঁজিবাজারের এমন উত্থান হতে পারে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বিনিয়োগের সিদ্ধান্তও এমন উত্থানে প্রভাব ফেলেছে।
তিনি বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত ও ব্যাংকের বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের পরও যদি পুঁজিবাজারে পতন অব্যাহত থাকত তাহলে আস্থা আরও কমে আসত। যে সিদ্ধান্তের কারণেই পুঁজিবাজারের উত্থান হোক না কেন সেটি ধরে রাখাই হবে চ্যালেঞ্জ। এখন রোববার সূচক ২০০ পয়েন্ট বাড়ল আর সোমবার যদি তা আবার বড় পতনের দিকে যায় তাহলে বিনিয়োগকারীদের পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থা ফেরানো যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এর কোনো সুফল পাওয়া যাবে না।  
এদিকে পুঁজিবাজার চাঙ্গা করতে শিগগিরই অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকা প্রস্তাবনা পাঠাবে বাংলাদেশ ব্যাংক। রোববার পুঁজিবাজারের চলমান সংকট নিরসনে এবং বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে অর্থমন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ কথা জানিয়েছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। 
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী সম্মিলিত জাতীয় ঐক্যের সভাপতি আনম আতাউল্লাহ নাঈম বলেন, সূচক ২৩২ পয়েন্ট বেড়েছে। এটা সত্য। আবার লেনদেনও ৪০০ কোটি টাকা। ফলে দুইটি মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। পুঁজিবাজারে বর্তমানে সবচেয়ে বড় যে সমস্যা সেটি হচ্ছে তারল্য সংকট। সূচক বাড়ল খুব বেশি কিন্তু তারল্য বা নগদ টাকার প্রবাহ বাড়ল না সেটি কোনোভাবেই স্বাভাবিক অবস্থা হতে পারে না।  তিনি বলেন, যখন লেনদেন বাড়বে তখন বোঝা যাবে পুঁজিবাজারে নগদ টাকা প্রবেশ করছে। লেনদেনের মন্দা না কাটিয়ে শুধু সূচক বাড়ালে সেটি দিয়ে পুঁজিবাজারে স্থিতিশীল করা সম্ভব নয়। দীর্ঘদিনের মন্দায় বর্তমানে পুঁজিবাজারে সিংহভাগ বিনিয়োগকারী লোকসানে আছে। এমন অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর নিদের্শনা ইতিবাচক। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বিনিয়োগও ভালো সংবাদ। এসব সিদ্ধান্তকে কার্যকর করতে পুঁজিবাজারের তারল্য সমস্যা সমাধান করতে হবে। তবেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে।  
রোববার ডিএসইর অপর সূচকগুলোর মধ্যে শরিয়াহ সূচক ৫৭, ডিএসই-৩০ সূচক ৮১ এবং নতুন চালু হওয়া সিডিএসইটি সূচক ৪৭ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৯৯৮, ১ হাজার ৪৮৭ ও ৮৯২ পয়েন্টে। টাকার পরিমাণে লেনদেন হয়েছে ৪১১ কোটি ৩৬ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট, যা আগের দিন থেকে ১৪৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা বেশি। আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ২৬৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকার। ডিএসইতে ৩৫৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩৪৬টির বা ৯৭ শতাংশের শেয়ার ও ইউনিট দর বেড়েছে। দর কমেছে ৬টির বা ২ শতাংশের এবং ৪টি বা ১ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট দর অপরিবর্তিত রয়েছে।
টাকার অংকে ডিএসইতে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে স্কয়ার ফার্মার শেয়ার। এদিন কোম্পানিটির ১৯ কোটি ১৫ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। লেনদেনে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসা সিঙ্গারের ১৭ কোটি ১৭ লাখ টাকার এবং ১৩ কোটি ২২ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে উঠে আসে লাফার্জহোলসিম। ডিএসইর টপটেন লেনদেনে উঠে আসা অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে খুলনা পাওয়ার, এসএস স্টিল, গ্রামীণফোন, এডিএন টেলিকম, এনসিসি ব্যাংক, রিং শাইন এবং ব্যাংক এশিয়া। অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই এদিন ৬৭৭ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ২৭৭ পয়েন্টে। এদিন সিএসইতে হাতবদল হওয়া ২৫৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শেয়ার দর বেড়েছে ২৩১টির, কমেছে ১৫টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ১১টির দর। সিএসইতে রোববার ৪৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।