আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৩-০৬-২০১৪ তারিখে পত্রিকা

তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞানে জীবনের ভিত হেলালের

সামনে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে হেলাল নেমে পড়ে জীবনযুদ্ধে। আলাদীনের চেরাগের মতো তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞানের সন্ধান পেয়ে যায়। তথ্যপ্রযুক্তির এ জ্ঞানকে অবলম্বন করে সে এখন স্বাবলম্বী। হেলালকে নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন শাহ ফখরুজ্জামান

যেবয়সে গ্রামের আর ১০টি ছেলে মাঠে খেলা করে, ব্যস্ত থাকে আপন ভুবনে, সে বয়সেই হেলালের কাঁধে চাপে সংসারের দায়িত্ব। হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা কেউন্দা গ্রামের হেলালকে ১৬ বছর বয়সেই নেমে যেতে হয়েছিল জীবনযুদ্ধে। নিজের এবং দুই বোনের লেখাপড়ার খরচ জোগানো ও তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে হয় তাকে। হেলাল এ দায়িত্বে চোখে সরষে ফুল দেখলেও দমে যায়নি। সামনে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে নেমে পড়ে জীবনযুদ্ধে। আলাদীনের চেরাগের মতো তথ্যপ্রযুক্তিতে জ্ঞানের সন্ধান পেয়ে যায়। তথ্যপ্রযুক্তির এ জ্ঞানকে অবলম্বন করে হেলাল এখন স্বাবলম্বী। এলাকার তরুণদের কাছে হেলাল পরিচিত হয়েছে নতুন উদাহরণ সৃষ্টিকারী হিসেবে।

বছর চারেক আগে নিজের ও বোনদের লেখাপড়ার খরচ জোগানোর জন্য গ্রাম থেকে হবিগঞ্জ শহরে আসে হেলাল উদ্দিন। দরিদ্র বাবার একমাত্র ছেলে হেলাল। অভাবের কারণে ভালো একটি কলেজে লেখাপড়া করতে পারেনি। ইচ্ছে ছিল একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। কিন্তু অভাবের কারণে তা আর হলো না। কারণ যার বাবার প্রতি মাসে ১ হাজার টাকা দেয়ার সাধ্য ছিল না সে কীভাবে একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে? এজন্য তখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায় হেলালের।

গ্রামে থাকা অবস্থায় হেলাল শিখেছিল কম্পিউটারের কাজ। কম্পিউটার চালানোর সেই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে হেলাল হবিগঞ্জ শহরে একটি পত্রিকায় কাজ নেয়। মাসে বেতন ২ হাজার টাকা। এ টাকা দিয়ে কীভাবে নিজের ও বোনদের লেখাপড়াসহ তাদের ভরণপোষণ করবে নতুন করে সেই চিন্তা চেপে বসে হেলালের মাথায়। আরও কিছু করা যায় কিনা সেই পথ খুঁজতে থাকে হেলাল। পথ খুঁজতে গিয়েই হঠাৎ ওয়েবসাইট ডিজাইন শিক্ষার ইচ্ছে জাগে তার। কিন্তু পত্রিকা অফিসের কাজে সরকারি ছুটি ব্যতীত আর কোনো ছুটি ছিল না। এছাড়া হবিগঞ্জ শহরে এমন কোনো ইনস্টিটিউট ছিল না যেখানে ওয়েব ডিজাইনের কাজ শেখানো হয়। কিন্তু হেলাল চায় যেভাবেই হোক এ কাজটা শিখতে হবে।

রাত ২টা পর্যন্ত পত্রিকা অফিসে কাজ করে হেলাল বাকি রাতটুকু ইন্টারনেটে ঘাঁটাঘাঁটি করতে থাকে কিছু শেখার জন্য।

এক পর্যায়ে ওয়েব ডিজাইনের কিছু কাজ শিখেও ফেলে হেলাল। কিছু কাজ শেখার পরপরই সে ওয়েব ডিজাইনের কাজও পেয়ে যায়।

প্রথম অবস্থায় কাজ পেতে কষ্ট হতো। কিছু দিন পর আস্তে আস্তে কাজ বাড়তে থাকে তার। সাড়ে তিন বছর কাজ করে হেলাল ৫৫টি ওয়েবসাইট তৈরি করে সফলতার স্বাক্ষর রাখে। এখন মাসে ৪ থেকে ৫টি, এমনকি কোনো মাসে তার বেশিও ওয়েবসাইট তৈরির কাজ পায় হেলাল। ওয়েব ডিজাইনের কাজ করে এখন হেলাল প্রতি মাসে আয় করে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। ঘরে বসেই আয়ের জাদুমন্ত্র পেয়ে এখন তার পরিবারে এসেছে সচ্ছলতা। নিজের লেখাপড়া অব্যাহত রাখার পাশাপাশি ভালোভাবেই চলছে বোনদেরও লেখাপড়া।

শুধু ওয়েবসাইট তৈরি নয়, এখন হেলাল বাংলাদেশ ডাক ও টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টে ওয়েব ডিজাইন ট্রেইনার হিসেবে কাজ করে।

হেলাল উদ্দিন বলেন, আসলে মানুষ পারে না এমন কিছুই নেই। ইচ্ছে করলেই নিজেই তার জীবনকে উজ্জ্বল করতে পারে। দীর্ঘ সাড়ে ৩ বছর কাজ করে আজ আমি একজন পরিপূর্ণ ওয়েব ডেভেলপার। আর আমার কাজে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন আমার মা-বাবা। হেলাল বর্তমানে বিএ ফাইনাল ইয়ারে পড়ছে। লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি হবিগঞ্জ শহরে একটি অফিস নিয়ে ওয়েব ডেভেলপমেন্টের কাজ পরিচালনা করে আসছেন। তার কোম্পানির নাম দিয়েছেন 'হেলাল হোস্ট বিডি'।

হেলাল উদ্দিন ওয়েব ডিজাইনের ব্যাপারে খুবই আশাবাদী। তিনি বলেন, বাইরে চাকরি পাওয়ার জন্য হন্যে হয়ে ঘোরার দরকার নেই। যে কেউ চাইলেই তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে ঘরে বসেই আয় করতে পারেন। আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে দেশে সে সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং অনেকে কাজ করে সফলও হয়েছেন।

হবিগঞ্জ লিঙ্ক টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ প্রদীপ দাস সাগর বলেন, সাধনা করলে যে কেউ সফল হতে পারে। এর অন্যতম উদাহরণ হেলাল উদ্দিন। ঘরে থাকা কম্পিউটার আর ল্যাপটপ যে হতে পারে টাকার খনি সেটি সবাইকে বোঝাতে পেরেছেন হেলাল উদ্দিন।

হেলাল উদ্দিনের সফলতার পেছনে ছিল শ্রম, নিষ্ঠা আর আকাঙ্ক্ষা। এ বিষয়গুলো থাকলে কাউকে বিদেশে যেতে হবে না। দেশেই নিজেদের সফলভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। হেলাল উদ্দিন সেই উদাহরণটুকুই সৃষ্টি করেছেন।

 

 

 

::::imageLeft

খবরটি পঠিত হয়েছে ৭৭২৩ বার