logo
প্রকাশ: ১২:০০:০০ AM, রবিবার, জুলাই ২৪, ২০১৬
বাইয়ে মুশারাকা একটি বহুল প্রচলিত ইসলামী বিনিয়োগ পদ্ধতি। এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে, অংশীদার হওয়া। শরিয়তের পরিভাষায় যে কারবারে দুই বা ততোধিক ব্যক্তি লাভ-লোকসানের ঝুঁকি বহন করার শর্তে কোনো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে কারবার পরিচালনা করেন তাকে বাইয়ে মুশারাকা বলা হয়
সুদি বিনিয়োগের আদর্শ বিকল্প
বাইয়ে মুশারাকা
মুফতি মুহাম্মাদ শোয়াইব

বর্তমানে পৃথিবীতে সম্পদ উপার্জনের যে পদ্ধতিগুলো চালু আছে, তার অধিকাংশই সুদভিত্তিক। সুদি বিনিয়োগ পদ্ধতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো সুদভিত্তিক সিস্টেমে সম্পদের প্রবাহ থাকে ওপরের দিকে। সম্পদশালীদের হাতেই ঘুরপাক খায় সম্পদ। আর দরিদ্র্ররা হতে থাকে ক্রমেই হতদরিদ্র। ইসলামে সুদের এ সিস্টেমের বিকল্প হিসেবে মুশারাকা ব্যবস্থা চালু আছে। ইন্টারেস্ট পদ্ধতিতে সম্পদের অতি সামান্য অংশ ডিপোজিটরদের হাতে যায়। কিন্তু মুশারাকা বা অংশীদারিত্বের তাত্ত্বিক দিকটি হলো, অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে পুঁজি বিনিয়োগ (ফিন্যান্সিং) করা হলে মুনাফার একটি যৌক্তিক অংশ বিনিয়োগকারীদের হাতে যাবে। আর এ পদ্ধতিতে সম্পদের বণ্টন (ডিস্ট্রিবিউশন অব ওয়েল) উপরের দিকে যাওয়ার পরিবর্তে নিচের দিকে আসবে। কাজেই ইসলাম সুদি বিনিয়োগ ব্যবস্থার যে সর্বোত্তম বিকল্প ব্যবস্থা (ওহঃৎবংঃ ইবংঃ গড়ফবষ ড়ভ ঋরহধহপরহফ) উপস্থাপন করেছে, সেটি হলো, মুশারাকা বা ‘অংশীদারিত্বের ব্যবস্থা’। কিন্তু অর্থনীতির অনেক গবেষক মনে করেন, ইন্টারেস্টের পরিবর্তে সমাজে ব্যাপকভাবে কর্জে হাসানার প্রচলন হওয়া উচিত। ইসলাম কিন্তু সেটা মনে করে না। কারণ কর্জে হাসানার সুফল ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে। আর মুশারাকার সুফল সর্বজনীন।
বাইয়ে মুশারাকা একটি বহুল প্রচলিত ইসলামী বিনিয়োগ পদ্ধতি। এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে, অংশীদার হওয়া। শরিয়তের পরিভাষায় যে কারবারে দুই বা ততোধিক ব্যক্তি লাভ-লোকসানের ঝুঁকি বহন করার শর্তে কোনো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে কারবার পরিচালনা করেন তাকে বাইয়ে মুশারাকা বলা হয়। ২ থেকে সর্বোচ্চ ২০ জন দ্বারা এ কারবার পরিচালিত হতে পারে। একটি চুক্তিপত্রের মাধ্যমে এটি শুরু হবে এবং এতে লেখা থাকবে অংশীদারদের প্রদেয় মূলধনের পরিমাণ, দায়দায়িত্ব, প্রয়োজনে অধিক মূলধন সংগ্রহের প্রক্রিয়া, লভ্যাংশ বণ্টনের হার ও প্রক্রিয়া, নতুন অংশীদার গ্রহণের শর্ত ইত্যাদি। অংশীদারি কারবারে দেনা পরিশোধের ক্ষেত্রে সব অংশীদারের দায়িত্ব সমান থাকে। সব সদস্য সম্মিলিতভাবে অথবা সবার পক্ষ থেকে একজন কারবার পরিচালনা করেন।
রাসুল (সা.) এর যুগে আরবজুড়েই বাইয়ে মুশারাকা বিস্তৃত ছিল। হাদিস শরিফে রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, ‘দুই অংশীদারের মাঝে আমি তৃতীয় হই, যতক্ষণ তারা একে অন্যের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা না করে। যখন বিশ্বাসঘাতকতা করে তখন আমি তাদের মধ্য থেকে সরে যাই।’
বাইয়ে মুশারাকায় উভয়পক্ষের মূলধন ও লাভ সমান সমান অথবা কমবেশি হতে পারে। তবে প্রাপ্ত মুনাফা বণ্টন পদ্ধতি মূলধনভিত্তিক হতে পারবে না; বরং মুনাফাভিত্তিক হবে। চুক্তির সময়ই লাভের হার নির্ধারণ করে নেবে; কিন্তু মাসিক বা সাপ্তাহিক কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করা যাবে না। যেমন মাসে বা সপ্তাহে ৫ হাজার বা ৭ হাজার টাকা নির্ধারণ করা যাবে না।
বাইয়ে মুশারাকার প্রকারভেদ
বাইয়ে মুশারাকা দুই ভাগে বিভক্ত। ১. শিরকাতুল মিলক বা মালিকানায় অংশীদারিত্ব।
২. শিরকাতুল আকদ বা চুক্তিভিত্তিক অংশীদারিত্ব।
শিরকাতুল মিলক বা মালিকানায় অংশীদারিত্ব
কোনো বস্তুর ক্রয়সূত্রে বা মিরাস সূত্রে মালিকানায় অংশীদার হওয়াকে শিরকাতুল মিলক বলে। যেমন কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার উত্তরাধিকারীরা তার সমুদয় সম্পত্তির মালিক হয়। অথবা কোনো পূর্ব চুক্তি ছাড়াই দুই বা ততধিক ব্যক্তি কোনো কিছু কিনে তার মালিকানায় অংশীদার হয়। মনে রাখতে হবে, যদি আগে থেকে মালিকানায় বা লাভ-লোকসানে অংশগ্রহণ করার শর্তসাপেক্ষে কোনো জিনিসের মালিকানা হাসিল হয় তাহলে তা শিরকাতুল মিলক থাকবে না; বরং শিরকাতুল আকদ হয়ে যাবে।
শিরকাতুল আকদ বা চুক্তিভিত্তিক অংশীদারিত্ব চার প্রকার। যথাÑ
১. শিরকাতুল মুফাওয়াদা
২. শিরকাতুল ইনান
৩. শিরকাতুস সানায়ে
৪. শিরকাতুল উজুহ
শিরকাতুল মুফাওয়াদা (সম অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে শরিকানা কারবার)
যে কারবারে সব পক্ষ সমান পুঁজি, দায়দায়িত্ব ও ঝুঁকি বহন করে তাকে শিরকাতুল মুফাওয়াদা বলা হয়। এ কারবারে চুক্তিপত্রে ব্যবসায়িক সবক্ষেত্রে সমদায়িত্ব ও অধিকারের কথাটি উল্লেখ থাকতে হবে।
এ কারবারটি বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে। যথাÑ
১. সব অংশীদারকে আজাদ সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন বালেগ ও মুসলমান হতে হবে।
২. মূলধন টাকা-পয়সা স্বর্ণ-রোপা ইত্যাদি হতে হবে।
৩. চুক্তিপত্রে শিরকাতুল মুফাওয়াদা বা সম অংশীদারিত্ব কথাটি উল্লেখ থাকতে হবে।
৪. অংশীদাররা মাসিক বা বাৎসরিক মুনাফা নির্ধারণ করতে পারবে না। বরং লভ্যাংশ অনুপাতে মুনাফা বণ্টন করতে হবে।
৩ .চক্তিপত্রে শিরকাতুল মুফাওয়াদা উল্লেখ থাকতে হবে।
৪. সব অংশীদার সমান হারে লাভ-লোকসানের ঝুঁকি বহন করতে হবে।
৫. মূলধন সমান দেয়ার পর কেউ যদি শ্রম বেশি দেয় তাহলে তার জন্য আলাদা পারিশ্রমিক নির্ধারণ করতে হবে।
৬. নিজের পারিবারিক প্রয়োজনে কেউ কোনো জিনিস নিলে তার মূল্য পরিশোধ করে দিতে হবে।
৭. সব অংশীদার একে অন্যের প্রতিনিধি ও জামিনদার হিসেবে গণ্য হবে। বিনিয়োগকৃত অর্থের জন্য আমানতদার হিসেবে গণ্য হবে।
৮. ব্যবসায় লোকসান হলে প্রত্যেকে আপন মূলধন অনুপাতে লোকসান বহন করবে।
৯. কোনো অংশীদার একা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না, যদি নেয় এবং তাতে ক্ষতি হয় তাহলে অন্য অংশীদারদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
১০. দুইজনের যে কোনো একজন মারা গেলে অংশীদারি কারবার বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কিন্তু কারবারে যদি দুইয়ের অধিক লোক থাকে তাহলে কারবার বিলুপ্ত হবে না।
শিরকাতুল ইনান (অসম অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে শরিকানা কারবার)
যে কারবারে সব অংশীদারের মূলধন এক নয়; তবে সবার শ্রমদান সমান, সে কারবারকে শিরকাতুল ইনান বলে। লভ্যাংশ বণ্টিত হয় মূলধন অনুপাতে অথবা ব্যবসায়িক দক্ষতা বিবেচনায় আলোপ-আলোচনার মাধ্যমে।
শিকাতুস সানায়ে (পেশাজীবীদের শরিকানা কারবার)
যে কারবারে একাধিক পেশাদার এ মর্মে একত্রিত হয় যে, সবাই মিলে সম্মিলিতভাবে কাজ করে যা উপার্জন হবে তা সংশ্লিষ্ট কাজের ব্যয় নির্বাহের পর নিজেদের মাঝে সমহারে বা পূর্ব নির্ধারিত অনুপাতের ভিত্তিতে ভাগ করে নেবে। এ ধরনের পেশা সংক্রান্ত কারবারকে শিরকাতুস সানায়ে বলে।
শিরকাতুল উজুহ (ব্যবসায়ী সুনামের অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে শরিকানা কারবার)
সমাজে এমন অনেক ব্যক্তি থাকেন যাদের মূলধন থাকে না। কিন্তু ব্যবসায়িক এড়ড়ফ রিষষ বা ব্যবসায়ী সমাজে তার এমন সুনাম ও বিশ্বস্ততা আছে যে, সে পাইকারি বিক্রেতাদের কাছ থেকে বাকিতে এনে নগদ বিক্রি করতে পারে। এ ধরনের একাধিক ব্যক্তি যদি এ মর্মে চুক্তিবদ্ধ হয় যে, তারা পাইকারি বিক্রেতার কাছ থেকে বাকিতে পণ্য এনে নগদ বিক্রি করার পর এতদসংক্রান্ত ব্যয় বাদে যা থাকবে, তা তাদের মাঝে পূর্বনির্ধারিত হারে বণ্টন করে নেবে তাহলে তাকে শিরকাতুল উজুহ বলে।
উল্লেখ্য, এ অংশীদারিত্বের ব্যবস্থা যেহেতু বর্তমান পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত কোথাও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি এবং অর্থনৈতিক অঙ্গনে এর অনুসরণ পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু হয়নি, তাই এর বরকতও মানুষের সম্মুখে আসছে না। সাম্প্রতিক মুসলমানদের বিভিন্ন অঞ্চলে এ পদ্ধতিটি চালু করার চেষ্টা চালানো হয়েছে যে, এমন কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হবে, যেটি ‘ইন্টারেস্ট’ পদ্ধতির পরিবর্তে ইসলামী আইন অনুযায়ী মুদারাবা-মুশারাকাভিত্তিক পরিচালিত হবে। বর্তমানে সারা পৃথিবীতে কমপক্ষে ৮০ থেকে ১০০টি ব্যাংক ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান আছে, যেগুলোর দাবি হলো, আমরা ইসলামী নিয়ম-নীতি অনুসারে কারবার পরিচালনা করছি এবং সুদমুক্ত ব্যবসা করছি। তাদের এ দাবি শতভাগ সঠিক না মানলেও এবং তাতে কিছু ভুল-ত্রুটি থাকলেও এ কথাটি সত্য, বর্তমান পৃথিবীতে প্রায় একশ প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক সুদবিহীন ব্যবস্থার ওপর কাজ করছে। এ ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানগুলো অংশীদারিত্ব পদ্ধতির বাস্তবায়ন শুরু করে দিয়েছে। আর যেখানেই অংশীদারিত্বের পদ্ধতিকে গ্রহণ করা হয়েছে, সেখানেই ভালো সুফল পাওয়া গেছে।

লেখক : সম্পাদক, মাসিক আরবি ম্যাগাজিন ‘আলহেরা’

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]