logo
প্রকাশ: ১২:০০:০০ AM, শনিবার, জানুয়ারী ২৮, ২০১৭
ট্রাম্প আমেরিকাকে বিপর্যস্ত করবে?
মো. শরীফুর রহমান আদিল

আমেরিকার জনগণ উদার গণতান্ত্রিক মতাদর্শে বিশ্বাসী; কিন্তু ট্রাম্পের নির্বাচনী ইশতেহারে তার বিরুদ্ধে সমালোচনাকারী সংবাদ মাধ্যমগুলো বন্ধ কিংবা লাগাম টেনে ধরার যে হুশিয়ারি দিয়েছেন, তাতে আমেরিকার উদার গণতান্ত্রিক নীতি থাকবে কিনা, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে সন্দেহ দেখা দিয়েছে

ডোনাল্ড ট্র্রাম্প আমেরিকার ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০ জানুয়ারি শপথ নিয়েছেন। এর আগে ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর তিনি ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়ে প্রেসিডেন্টে নির্বাচিত হন। যদিও এ নির্বাচন ও ট্রাম্পের জয় আমেরিকাসহ বিশ্বের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে রয়েছে, তবুও গণতন্ত্রকে রক্ষার স্বার্থে এ প্রশ্নবিদ্ধকে প্রশ্নাতীত করেছে আমেরিকার জনগণ। অনেকের মতে, ৯ নভেম্বর নির্বাচনে শুধু ডেমোক্র্যাটিকরা হারেনি, হেরেছে পুরো আমেরিকা। অন্যদিকে একই সুরে বলা যায়, এ নির্বাচনে শুধু ট্রাম্প জেতেননি; বরং জিতেছে পুতিনসহ পুরো রাশিয়া।
ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রেট করতে চান; কিন্তু কীভাবে তা করতে চান, তা স্পষ্ট নয়। অনেকের প্রশ্ন, তিনি কি শুধু শ্বেতাঙ্গদের নিয়ে এ কাজটি করতে চান, নাকি সব আমেরিকানকে নিয়ে? কারণ এখন পর্যন্ত ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পর কয়েকটি মার্কিন নিউজ পেপার বিভিন্ন জরিপ চালিয়ে দেখতে পেয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ শতাংশ মানুষ ট্রাম্পকে অপ্রিয় হিসেবে দেখেন আর ৪০ শতাংশ লোক ট্রাম্পকে সঠিক নেতা হিসেবে মনে করেন। তবে এ ৪০ শতাংশের মধ্যে ৩৭ শতাংশই আবার শ্বেতাঙ্গ নাগরিক। তাই গ্রেট আমেরিকা করতে হলে বাকি ৫০ শতাংশকে নিয়েই ট্রাম্পকে কাজ করতে হবে। অথচ এ ৫০ শতাংশের ২৫ শতাংশই ট্রাম্পের শপথ অনুষ্ঠানের দিন বিক্ষোভে ফেটে পড়ে রাস্তায় নামে। আর শপথের দিন মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে এটিই প্রথম বিক্ষোভ পরিলক্ষিত হয়েছে।
আবার ট্রাম্প তার উদ্বোধনীয় বক্তব্যে যারা তাকে ভোট দেয়নি অর্থাৎ ৫০ শতাংশ জনগণ কিংবা ডেমোক্র্যাটিক দলের নেতাদের জন্য বন্ধুত্বের কিংবা সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়ার আহ্বান পর্যন্ত জানাননি। অথচ বিরোধী দলের নেতা হিলারি ক্লিনটন তার শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে নিজের উদারতার পরিচয় দিয়েছেন। ফলে প্রশ্ন থেকে গেল, বিরোধী দলের সঙ্গে মালিন্য রেখে মেকিং আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন কীভাবে সম্ভব? 
ট্রাম্প ঘোষণা করেন মেক্সিকোর সীমান্তে দেয়াল তৈরি করে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ৩৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করবেন, অন্যদিকে জাপান, চীনসহ অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও একই নীতি অবলম্বন করবেন। যদি সত্যিই তাই হয়, তবে মুক্তবাজার অর্থনীতি কি আর থাকবে? নাকি আমেরিকার অর্থনীতি চাঙ্গা হবে? এটি আমেরিকার স্বার্থে করেছে বলে কোনো আমেরিকান মনে করেন না; বরং তারা একে একটি অনভিজ্ঞ সিদ্ধান্ত বলে মনে করে। আমেরিকার স্বার্থ চিন্তা করে ট্রাম্প কাজ করলে তাতে বিশ্ব নেতার যে তকমা এখনও আমেরিকার গায়ে লাগানো আছে তা অচিরেই নেমে যাবে, যা আমেরিকার ঐতিহ্যে সবচেয়ে বড় আঘাত বলেই ধরে নিতে হবে। এখনকার ছোট দেশগুলো আমেরিকার দিকে যে চেয়ে আছে এসব দেশকে রাশিয়া কিংবা অন্য কোনো দেশ ভাগিয়ে নিয়ে আমেরিকা থেকে সুপার পাওয়ার রাষ্ট্রের তকমাটা কেড়ে নিতে পারে, যা ট্রাম্প শাসনের সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায় ও আমেরিকানদের চোখে আজীবন ঘৃণিত হয়ে থাকবে।
অন্যদিকে আমেরিকানরা এখন যে অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে আছে, তা থেকে উত্তরণে ট্রাম্প সংরক্ষণ নীতির কথা বলেছেন। তার এ সংরক্ষণ নীতি সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতিতে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে বলে মনে হয় না। বরং এ নীতির দ্বারা আমেরিকারই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কেননা বিশ্ব এখন সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতির আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। সুতরাং তার এ ধরনের নীতি সত্যিই আমেরিকানদের চোখে আহাম্মকি নীতির পরিচয় দিচ্ছে। 
আমেরিকার স্বার্থেই ওবামা প্রশাসন জি-৮ থেকে রাশিয়াকে বাদ দিয়ে দিয়েছিল; কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের যে ইঙ্গিত তাতে ধরে নেয়া যায়, রাশিয়া ফের জি-৮ পরিবারের সদস্যপদ ফিরে পেতে যাচ্ছে। অন্যদিকে আমেরিকা রাশিয়ার ওপর যে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল, তা খুব অল্প সময়ের মধ্যে উঠে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর এটাকে আমেরিকান স্বার্থের বিপক্ষে বলে অনেকেই মনে করছেন। এতসব স্বার্থ জলাঞ্জলি দিলে আমেরিকানরা এক থাকবে তো? নাকি বিচ্ছিন্ন হয়ে ফের তারা ওয়াশিংটনের রাজপথ কাঁপাবেÑ সে প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যৎই বলে দেবে!
আমেরিকানদের জন্য ওবামা প্রশাসনের অন্যতম সফলতার একটি দিক হলো, হেলথকেয়ার, যা আমেরিকানদের মাঝে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিল; কিন্তু ট্রাম্প তার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার প্রথম দিনেই এ হেলথকেয়ার বাতিল করার মধ্য দিয়ে তার নির্বাচনী বক্তব্য ‘সব মানুষের প্রেসিডেন্ট হতে চাইয়ের’ বৈপরীত্যই প্রকাশিত হয়েছে, যা মেকিং আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইনের সঙ্গে স্ববিরোধী। 
আমেরিকার ইতিহাসে প্রশাসন চালানোর ক্ষেত্রে আগে কখনও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ পাওয়া না গেলেও এবার ট্রাম্প তাই করতে যাচ্ছেন। ট্রাম্প তার মেয়ে ও জামাতাকে তার উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়ে নৈতিকতা ও স্বজনপ্রীতির প্রশ্ন আমেরিকার মনে দানা বাঁধিয়েছেন। আর এর মধ্য দিয়ে আমেরিকানসহ বিশ্বের নাগরিকদের মনে প্রশ্ন জাগছে, ট্রাম্প যুগে আমেরিকায় গণতন্ত্রের বদলে পরিবারতন্ত্র স্থান পাচ্ছে না তো? মার্কিনিরা যে গণতন্ত্রের বড়াই করত, তা কি ট্রাম্প সত্যিই ভেস্তে দেবে? অন্যদিকে ওবামা প্রশাসনের সময় বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পাওয়া সবাইকে ট্রাম্প বরখাস্ত করে আমেরিকার উদারনৈতিক গণতন্ত্রের পরিবর্তে লেজুড়বৃত্তিক গণতন্ত্রের গন্ধ ছড়িয়েছেন। ফলে মেকিং আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইনের পরিবর্তে মেকিং আমেরিকা ব্রেক অ্যাগেইনের সম্ভাবনাই বেশি। আর এটা যদি সত্যিই হয়, তবে তা হবে আমেরিকান ঐতিহ্যের গালে চপেটাঘাত করা। 
আমেরিকার জনগণ উদার গণতান্ত্রিক মতাদর্শে বিশ্বাসী; কিন্তু ট্রাম্পের নির্বাচনী ইশতেহারে তার বিরুদ্ধে সমালোচনাকারী সংবাদ মাধ্যমগুলো বন্ধ কিংবা লাগাম টেনে ধরার যে হুশিয়ারি দিয়েছেন, তাতে আমেরিকার উদার গণতান্ত্রিক নীতি থাকবে কিনা, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। কারণ বিট্রিশ প্রেসিডেন্টের মতো আমেরিকান প্রেসিডেন্টও সংবিধানের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য এবং সিনেটররা প্রেসিডেন্টের কথায় একমত না হলে সে আইন পাস করতে পারেন না আমেরিকান প্রেসিডেন্ট; কিন্তু আমেরিকান প্রেসিডেন্টের একক ক্ষমতা তাদের সংবিধানই দিয়ে দিয়েছে। এখানে সিনেটর কিংবা অন্য কেউ প্রেসিডেন্টের বিপক্ষে গিয়ে কিছু করতে পারবে বলে মনে হয় না। আবার প্রেসিডেন্ট চাইলে জনপ্রশাসনের উচ্চস্তর কিংবা নিম্নস্তর তার একক ক্ষমতায় সর্বত্রই তিনি ৪ হাজার লোককে নিয়োগ দিতে পারেন। যদি ব্যাপারটি সত্যি হয়, তবে ওবামার শেষ ভাষণের মূল সূত্রই মনে হয় সঠিক হতে যাচ্ছে। কারণ তিনি বলেছিলেন, আমেরিকার জনগণকে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই কিংবা যুদ্ধ করতে হবে। আর এটি যদি করতেই হয় তবে আমেরিকানরা দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ফলে মেকিং গ্রেট আমেরিকার উল্টো পথটাই দেখবে বিশ্বের জনগণ।
ট্রাম্পের আচরণে অনেকে ক্ষিপ্ত; কিন্তু অনেকেই মনে করেছেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে শপথ নেয়ার আগ পর্যন্ত তিনি তার আগের আচরণকে সংশোধন করবেন; কিন্তু শপথের পরে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হয়ে তিনি যেভাবে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে তার আচরণ পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনাই দেখা যায়নি। অথচ ট্রাম্পের এ আচরণ আমেরিকাসহ বিশ্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। এ পরিস্থিতিতে অনেকের ধারণা, ট্রাম্প যেসব নীতি বা কৌশল অবলম্বন করেছেন, তা পুরো আমেরিকাকে বিপর্যস্ত করা ছাড়া অন্য কিছু তিনি উপহার দিতে পারবেন না। হ

শিক্ষক, ফেনী সাউথ ইস্ট ডিগ্রি কলেজ
 

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]