logo
প্রকাশ: ১২:০০:০০ AM, শনিবার, নভেম্বর ২৫, ২০১৭
সবজি উৎপাদনে বিপ্লব
জাহিদুল ইসলাম

ধান উৎপাদনে বড় ক্ষতির পরও গত অর্থবছরে (২০১৫-১৬) কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে সবজি। এ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো আলুর উৎপাদন হয়েছে ১০২ কোটি ১৫ লাখ টন। আগের অর্থবছরে এর ফলন হয়েছিল ৯৪ লাখ ৭৪ হাজার টন। এক বছরে ফলন বেড়েছে ৭ লাখ ৪১ হাজার টন। এ সময়ে অন্যান্য সবজি উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৩ লাখ টন। এক বছরে সবজি উৎপাদন ১০ লাখ ৪৪ হাজার টন বা ৮ শতাংশ বেড়েছে বলে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মোট দেশজ আয়ের (জিডিপি) প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সবজি উৎপাদন বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। গত ৪৫ বছরে উৎপাদন বেড়েছে ৫ গুণ। গত অর্থবছরে ৮৩৪ কোটি টাকার সবজি রফতানি হয়েছে। কৃষি শ্রমিকের মজুরি তিন বছরে বেড়েছে ৫ শতাংশ। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে সবজি উৎপাদনে বিপ্লব হয়েছে বলে দাবি করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, ধানের বিকল্প হিসেবে অনেক কৃষক এখন সবজি চাষে ঝুঁকছেন। পর্যাপ্ত সার, সেচ ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে একরপ্রতি সবজির ফলনও বাড়ছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য মতে, গত ৪৫ বছরে বাংলাদেশে সবজি উৎপাদন বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। এক দশকে সবজি চাষ বেড়েছে ৫ শতাংশ হারে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের রবি মৌসুমে ৫ লাখ ২৮ হাজার হেক্টর জমিতে সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। আগের অর্থবছরে সবজি চাষ হয়েছিল ৫ লাখ ১০ লাখ হেক্টর জমিতে। সবজির আবাদি জমির হার বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ প্রথম। আর উৎপাদন বৃদ্ধির হারের দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো সূত্র জানায়, বাংলাদেশের সবজি প্রায় ৫০টি দেশে রফতানি হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালমিয়া, সুইডেন, ডেনমার্ক, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, জাপান, সিঙ্গাপুর, ওমান প্রভৃতি দেশে সবজি রফতানি হয়ে আসছে। রফতানি করা সবজি হচ্ছে আলু, বরবটি, শসা, চিচিঙ্গা, করলা, কাঁকরোল, টমেটো, পেঁপে, বেগুন, ঢেঁড়স, লাউ, কচুর লতি, মিষ্টিকুমড়া, লালশাক, পুঁইশাক, ফুলকপি, পালংশাক, বাঁধাকপি, কাঁচামরিচ, পটোল, শিমের বিচি, কাঁচকলা, কলার ফুল, কচুশাক, কাঁঠালের বিচি, ডাঁটা শাক ইত্যাদি।
গত অর্থবছরে এ খাতে রফতানি বাবদ আয় হয়েছে ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার। এর আগের অর্থবছরে ১০ কোটি ৪৩ লাখ ডলার এসেছিল সবজি রফতানি করে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সবজি রফতানি বাবদ আয় ছিল ১৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলার।
কয়েক বছর ধরে সবজি রফতানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও চলতি অর্থবছরে খাতটি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অর্থবছরের প্রথম চার মাসে সবজি রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে এ খাতে রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৬৯ লাখ ডলারে। ২ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের লক্ষ্যের চাইতে আয় বেশি হয়েছে প্রায় ৯ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে সবজি রফতানিতে ২ কোটি ২৬ লাখ ডলার আয় হয়েছিল।
১৯৯১ সালের আগে বিশ্বের ২০টি দেশ থেকে আলু আমদানি করতে হতো। আর বর্তমানে ২৭টি দেশে আলু রফতানি হয়। আলু উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের বিশ্ববাজারে আলু রফতানির সুযোগ অবারিত হয়েছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে মাত্র ৩২ কোটি ২২ লাখ টাকার আলু রফতানি করেছিল। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা ২৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশে আলুর বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৭০ লাখ টন। এর সঙ্গে আবার যোগ হয় আগের বছরের উদ্বৃত্ত আলু। ফলে প্রতি বছর অন্তত ৩০ লাখ টন আলু রফতানি করা সম্ভব।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, বর্তমানে দেশে ১ কোটি ৬২ লাখ কৃষক পরিবার সবজি চাষের সঙ্গে জড়িত। ১৯৬০ সালে এ সংখ্যা ছিল ৫০ লাখ। তবে কৃষকের পাশাপাশি সবজি চাষে এখন এগিয়ে আসছেন শিক্ষিত তরুণরাও। পড়াশোনা শেষ করে অনেকেই এখন কৃষিকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। সেক্ষেত্রে তারা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন সবজি চাষকে। কীটনাশক ব্যবহার না করে বিষমুক্ত সবজি চাষের মাধ্যমে অনেকেই এরই মধ্যে সাড়া ফেলেছেন। 
সবজি উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে প্রতি বছর কৃষি খাতের শ্রমিকদের মজুরি বাড়ছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কৃষি খাতের শ্রমিকদের মাসিক মজুরি ৯ হাজার ৩৭২ টাকায় উন্নীত হয়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এ খাতের শ্রমিকদের গড় মাসিক মজুরি ছিল ৮ হাজার ৯৩২ টাকা। তিন বছরে কৃষি শ্রমিকের মজুরি প্রায় ৫ শতাংশ বেড়েছে।
এ বিষয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এফ এম জামাল উদ্দিন আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, সবজি চাষের আওতায় জমির পরিমাণ না বাড়লেও প্রতি বছর ফলন বাড়ছে। কয়েক বছর আগেও ৭ টন সবজি হয়েছে এমন জমিতে এখন ১৫ টন সবজি পাওয়া যাচ্ছে। মূলত উৎপাদনশীলতা বেড়ে যাওয়ায় কৃষি খাতের উৎপাদন বেড়েছে বলে তিনি মনে করেন। এ গবেষক আরও জানান, বর্তমানে শিক্ষিত লোকজন কৃষি খাতে আসছেন। আগে দুই বার চাষ করা গেছে এমন ফসল এখন বছরে চার বার চাষ করা যায় একই জমিতে। সবজি উৎপাদন বৃদ্ধি ও পরিমাণগত সফলতা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। তবে এর সঙ্গে গুণগত মানের বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি আরও জানান, এখনও প্রায় ৩০ শতাংশ সবজির অপচয় হচ্ছে। তাছাড়া মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে প্রকৃত কৃষক ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। কৃষি খাতের প্রকৃত বিপ্লবের জন্য এসব বিষয়ে নজর দিতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]