logo
প্রকাশ: ১২:০০:০০ AM, শনিবার, সেপ্টেম্বর ১, ২০১৮
মাদকাসক্ত শিশুদের নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নিন
শামীম শিকদার

শিশুদের নয়নভরা হাসি দেখে মন ভরে না এমন মানুষ হয়তো পৃথিবীতে খুব কমই আছে। শিশুরা দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ। সমাজের বড়দের একটি অংশ যখন নীতিনৈতিকতার তোয়াক্কা না করে বহুবিধ অসামাজিক কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ে, তখন আমরা আগামী দিনের প্রত্যাশা হিসেবে শিশু-কিশোরদের নিয়ে বুক বাঁধি; স্বপ্ন দেখি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, সমাজ-দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ আশা-ভরসার স্থল আমাদের শিশু-কিশোরদের অনেকেই নানা অপকর্মের শিকার হচ্ছে। ভয়াল নেশা, মাদকের চোরাচালান, বাজারজাত ও সামগ্রিক বিপণন প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়ছে কোমলমতি শিশু-কিশোররা। এ থেকে মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানসহ বাদ নেই কোনো শ্রেণিই। তবে নেশাসক্ত শিশু-কিশোরদের মধ্যে পথশিশুদের সংখ্যাই বেশি। যাদের অধিকাংশের বাস আবার বস্তিতে। ঠিকানাবিহীন পথশিশুরা সারা দিন কাগজ কুড়িয়ে, বিভিন্ন অপরাধ কর্মকা- কিংবা ভিন্ন কোনো কাজ করে পারিশ্রমিক হিসেবে যা পায় তা দিয়েই চলে এদের মাদক সেবন। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় সরকারি হিসেবে দুই লাখের মতো পথশিশু রয়েছে, যাদের বয়স আঠারো বছরের কম। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যর মতো একেবারে মৌলিক অধিকারের সবগুলো থেকেই বঞ্চিত এসব শিশু। দরিদ্র ও সামাজিক অবক্ষয়, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অবহেলা, এমনকি নগরীতে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা মাদকের আস্তানা দিন দিন পথশিশুদের নিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুর দিকে।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য মতে, পথশিশুদের ৮৫ ভাগই কোনো না কোনোভাবে মাদক সেবন করে। এর মধ্যে ১৯ শতাংশ হেরোইন, ৪৪ শতাংশ ধূমপান, ২৮ শতাংশ বিভিন্ন ট্যাবলেট ও আট শতাংশ ইনজেকশনের মাধ্যমে নেশা করে থাকে। সংগঠনটির তথ্যানুযায়ী ঢাকা শহরে কমপক্ষে ২২৯টি স্পট রয়েছে, যেখানে ৯ থেকে ১৮ বছর বয়সি শিশু মাদক সেবন করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী ২১টি স্পটে সুচের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ, ৭৭টি স্থানে হেরোইন সেবন এবং ১৩১টি স্থানে গাঁজা ও  গ্লোসিন সেবন করা হয়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট সূত্র মতে, ঢাকা বিভাগে মাদকাসক্ত শিশুর প্রায় ৩০ শতাংশ ছেলে এবং ১৭ শতাংশ মেয়ে। মাদকাসক্ত ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সি ছেলে এবং মেয়ে শিশু শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রচ- ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
শিশু ও কিশোররা প্রথমে সিগারেট দিয়ে নেশার জগতে প্রবেশ করে। এরপর তারা আস্তে আস্তে গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিল, সিসা, ইয়াবা, পেথিড্রিন, ঘুমের ওষুধ, ড্যান্ডিসহ নানা ধরনের মাদকে আসক্ত হয়। এর মধ্যে পথশিশুদের কাছে মাদক হিসেবে আকর্ষণীয় মরণঘাতী নেশা ড্যান্ডি। ড্যান্ডি এক ধরনের আঠা, যা মূলত সলিউশন নামে পরিচিত। এতে টলুইন নামে একটি উপাদান আছে। টলুইন মাদকদ্রব্যের তালিকায় আছে। এটি জুতা তৈরি ও রিকশার টায়ার-টিউব লাগানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। এটি খেলে ক্ষুধা ও ব্যথা লাগে না। দীর্ঘমেয়াদে খেলে মস্তিষ্ক, যকৃত ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মাদকাসক্ত শিশু ও কিশোর মাদক গ্রহণের কারণে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। মাদকের বিষাক্ত নিকোটিনের কারণে তাদের কোষগুলো দুর্বল হতে থাকে। এতে তার শরীর থেকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। মধ্য বয়সে বিকলাঙ্গ হয়ে যেতে পারে। ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে ৮০ ভাগ। এছাড়াও দৃষ্টিশক্তি লোপ পাওয়া, টাকা চুরির প্রবণতা বাড়া, পড়াশোনায় মনোযোগী না হওয়া, কর্মের শক্তি কমে যাওয়া, ঝগড়াপ্রবণ হওয়া, পরিবারের কথা না শোনা, ওজন কমে যাওয়া, খাওয়ায় অরুচিসহ নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়।
বহু শিশু মাদকে আসক্ত হলেও সরকারি পর্যায়ে শিশুদের মাদকাসক্তি প্রতিরোধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা তেমন নেই। দেশে সরকারি নিরাময়কেন্দ্র আছে মাত্র চারটি। এগুলোতে শয্যাসংখ্যা ৫৫টি, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। রাজধানীতে ব্যাঙের ছাতার মতো অনেক মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্র গড়ে উঠলেও এগুলোর বেশিরভাগেরই নিবন্ধন নেই। এসব কেন্দ্রে মাদকাসক্তদের সুস্থ করার নামে চলে নানা অপচিকিৎসা। এসব কেন্দ্রে চিকিৎসক নেই, নেই চিকিৎসা সরঞ্জাম। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিপ্তরের সূত্রমতে, ২০০৫ সালে প্রণীত মাদকাসক্তি নিরাময়  কেন্দ্র ও পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা বিধিমালা অনুসারে কেন্দ্র পরিচালনার জন্য অধিদপ্তর থেকে অনুমোদন নেওয়ার কথা। কিন্তু রাজধানীতে গড়ে ওঠা কেন্দ্রগুলোর মধ্যে নিবন্ধিত হয়েছে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠান।
মাদকের হিংস্র থাবায় দেশের নারী, শিশু ও যুবসমাজ ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে মাদকাসক্তরা মাদক ক্রয়ের অর্থ সংগ্রহ করতে বিভিন্ন ধরনের চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও খুনসহ নানা ধরনের অপরাধে একের পর এক জড়িয়ে পড়ছে। সমাজের উচ্চবিত্ত ও অভিজাত পরিবারের ছেলেমেয়েরা ফেনসিডিল ও ইয়াবা কেনার টাকা সংগ্রহে পারিবারিকভাবে বাবা-মায়ের ওপর চাপ প্রয়োগসহ বিভিন্ন অসামাজিক কাজে লিপ্ত হচ্ছে। পাশাপাশি নারী নিগ্রহ, ধর্ষণ ও খুনের মতো ঘটনা ঘটছে অহরহ। সব ধরনের মাদককে ‘না’ বলার পাশাপাশি মাদকাসক্তদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সরকারকে পুনর্বাসনসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। রাষ্ট্রকে এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে সবাইকে সচেতন হতে হবে। শুধু তাই নয়, জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে। 

সাহিত্যিক ও সাংবাদিক
ভাকোয়াদী, কাপাসিয়া, গাজীপুর

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]