logo
প্রকাশ: ১২:০০:০০ AM, শনিবার, সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৮
বিশেষ প্রতিবেদন
আলো ছড়াচ্ছে প্রতিবন্ধী স্কুল
আবদুর রহমান মিন্টু, রংপুর

আঁধার ঘর আলোকিত করে যখন প্রিয় সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়, তখন বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজনের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দ উচ্ছ্বাস। কিন্তু প্রিয় সন্তান যদি প্রতিবন্ধী হয়, তখন মা-বাবার মাঝে নেমে আসে চরম হতাশা। সন্তানকে কীভাবে মানুষ করবেন তা নিয়েও পড়েন দুশ্চিন্তায়। 

সমাজের চোখে নিন্দিত অবহেলিত সেই প্রতিবন্ধী সন্তানকে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে এগিয়ে এসেছেন রংপুরের স্থানীয় কিছু সমাজসেবী, জনপ্রতিনিধি ও তরুণ উদ্যোক্তা। তাদের প্রচেষ্টায় ২০১৬ সালে গড়ে তোলা হয়েছে রংপুর অঞ্চলের প্রজা বিদ্রোহের মহানায়িকা দেবী চৌধুরানীর নামে ‘দেবী চৌধুরানী বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিজম বিদ্যালয়’। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই অভিজ্ঞ শিক্ষকদের চেষ্টায় বিদ্যালয়টি আলো ছড়িয়ে চললেও তাদের ভাগ্যে জোটেনি সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা। এ বিদ্যালয়ে প্রতিদিন শতাধিক প্রতিবন্ধী শিশু পড়ালেখার পাশাপাশি নাচ, গান, কবিতা ও আবৃত্তিসহ খেলাধুলায় অংশ নিচ্ছে।  ফলে দিন দিন এখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েই চলছে। 

রংপুর-সুন্দরগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক ঘেঁষে পীরগাছা সদর থেকে ৪ কিমি. দক্ষিণে রামচন্দ্রপাড়া গ্রামে গড়ে ওঠা এ বিদ্যালয়টি উপজেলার অন্য বিদ্যালয়গুলোর চেয়ে আলাদা। এলাকাবাসীর ঐচ্ছিক অনুদানে পরিচালিত বিদ্যালয়ে রয়েছে ইতিহাস খ্যাত বিদ্রোহী কন্যা দেবী চৌধুরানীর ছবি, দেশবরেণ্য ব্যক্তির ছবি ও জীবনী। এছাড়া বিদ্যালয়ে বিনা বেতনে কাজ করছেন একজন প্রধান শিক্ষকসহ ২২ জন শিক্ষক-কর্মচারী। শিক্ষার্থীদের পরিবহনে রয়েছে একটি ব্যাটারিচালিত রিকশাভ্যান।

সিসি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রিত মনোরম পরিবেশে দৃষ্টিনন্দিত বিদ্যালয়টি যেন পরিণত হয়েছে একটি পর্যটন কেন্দ্রে। স্থানীয় এমপি টিপু মুনশি, জেলা-উপজেলা সরকারি কর্মকর্তা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এরই মধ্যে বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে প্রশংসা করেছেন। বর্তমানে বিদ্যালয়ে ১৭৫ জন শিক্ষার্থী লেখাপড়া ও খেলাধুলার সুযোগ পাচ্ছে। 

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কেউ হাঁটতে পারে, কেউ পারে না। কারো হাত-পা বাঁকা। কেউ পড়ছে, কেউ খেলাধুলা ও নানা ভঙ্গিতে অভিনয় করছে। এ যেন সৃষ্টির এক বিচিত্র রূপ! ভাঙ্গা ভাঙ্গা কণ্ঠে মোশারফ হোসেন নামে এক শিক্ষার্থী জানান, আগোত বাড়িত শুতি শুতি আছিনু। এখন স্কুলোত আসি নেকাপাড়া করি। মুই গানও কবার পাও, নাইচ পারও পাও। প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে বিদ্যালয়ে আসা কাপড় ব্যবসায়ী এক অভিভাবক আবদুল মজিদ বলেন, বাড়িতে প্রতিবন্ধী সন্তান নিয়ে সব সময় টেনশনে থাকতে হয়। কখন কী করে বসে। এখন সকালে ওকে বিদ্যালয়ে দিয়ে যাই। এতে টেনশনও কমছে, তারাও কিছু শিখছে। এখানে আসার পর আগের চেয়ে তাদের আচার-আচরণও পাল্টে গেছে। 
জয়নাল, কামাল ও রবিউল ইসলাম নামে বেশ কয়েকজন এলাকাবাসী দ্রুত বিদ্যালয়টি সরকারিকরণসহ শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার দাবি জানান। বিদ্যালয়ের জমিদাতা সোলায়মান আলী বলেন, আমি এ এলাকার অবহেলিত প্রতিবন্ধী শিশুদের কথা ভেবে ২২ শতাংশ জমি দান করেছি। আমার মতো অন্যদেরও বিদ্যালয়ের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসা উচিত। 
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মতিয়ার রহমান বলেন, বিনা বেতনে প্রতিদিন সমাজের অবহেলিত এসব শিশুকে পাঠদান করছি। ফলে অন্য শিক্ষকদের এবং নিজের সংসারের অভাব-অনটন লেগেই আছে। তবুও অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে প্রতিবন্ধী শিশুদের আলোর পথ দেখাচ্ছি। 
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি শাহ মো. শাহেদ ফারুক বলেন, সমাজে লুকায়িত এবং অবহেলিত এসব প্রতিবন্ধী শিশু একদিন মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। তাই আসুন তাদের পাশে দাঁড়াই। পীরগাছা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, বিদ্যালয়টি অনেক সুন্দর। অজপাড়াগায়ে এরকম স্কুল চোখে পড়ে না। বিদ্যালয়টি যাতে সরকারি  সুযোগ-সুবিধা পায়, সে জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আবদুর রাজ্জাক বলেন, এ অঞ্চলের সুনাম উজ্জ্বল করে আলোকিত বাংলাদেশ গড়তে পারবে এই ‘দেবী চৌধুরানী বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিজম বিদ্যালয়’। তিনি বিদ্যালয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সাহায্যের আশ্বাস দেন।

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]