logo
প্রকাশ: ১২:০০:০০ AM, বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৮
মোমিনদের মামা ও কাতিবে ওহি
মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান (রা.)
মাহবুুবুর রহমান নোমানি

কাতিবে ওহি তথা কোরআনের ওহি লেখক হজরত মুয়াবিয়া (রা.) ৬০৮ খ্রিষ্টাব্দে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) এর বয়স ছিল ৩৫ বছর। তার বংশ বাবার দিক থেকে পঞ্চম পুরুষে এবং মায়ের দিক থেকে চতুর্থ পুরুষে এসে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর বংশের সঙ্গে মিলে যায়। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সহধর্মিণী উম্মে হাবিবা (রা.) এর সহোদর ছিলেন। সে হিসেবে তিনি নবীজি (সা.) এর শ্যালক ছিলেন। তার বোন উম্মুল মোমিনিন উম্মে হাবিবা (রা.) যেহেতু মোমিনদের জননী তাই তিনি হলেন মোমিনদের মামা। মক্কা বিজয়ের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) এর হাতে বায়াত গ্রহণ করে ইসলামের ঘোষণা দেন। এ সময়ে তার বাবা আবু সুফিয়ান, মা হিন্দ এবং ভ্রাতা এজিদও ইসলাম গ্রহণ করেন। তবে ঐতিহাসিক ওয়াকিদি (রহ.) বলেন, মক্কা বিজয়ের আগেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু বিষয়টি গোপন রেখেছিলেন। এজন্য তিনি বদর, ওহুদ, খন্দকসহ কোনো যুদ্ধেই মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি। (উসদুল গাবা : ৫/২১০)। ইসলাম গ্রহণের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সঙ্গে হোনাইন, হাউয়াজিন ও তায়েফ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ফকিহ সাহাবিদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে তিনি ১৬৩টি হাদিস বর্ণনা করেন। 

অনন্য মর্যাদায় ভূষিত মুয়াবিয়া (রা.) 
হজরত মুয়াবিয়া (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কাছে এতই নির্ভরযোগ্য ছিলেন যে, তাকে কাতিবে ওহি তথা নাজিল হওয়া কোরআন অনুলিপি করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ইবনে আব্বাস (রা.) এর সূত্রে বর্ণিত রয়েছে, একদা জিবরাইল (আ.) এসে বললেন, হে মুহাম্মদ! আপনি মুয়াবিয়াকে সদুপদেশ দিন। কেননা তিনি আল্লাহর কিতাবের আমানতদার এবং উত্তম আমানতদার। (আল মুজামুল আওসাত : ৩৯০২)। বোখারি বর্ণনায় রয়েছে, উম্মে হারাম (রা.) বলেন, আমি রাসুল (সা.) কে বলতে শুনেছি, ‘আমার উম্মতের সর্বপ্রথম সামুদ্রিক অভিযানে অংশগ্রহণকারী বাহিনীর জন্য জান্নাত অবধারিত।’ (বোখারি : ২৯২৪)। এ হাদিসের ব্যাখ্যায় মুহাল্লাব (রহ.) বলেন, ‘হাদিসটিতে মুয়াবিয়া (রা.) এর অনন্য মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে। কেননা তিনিই সর্বপ্রথম ওই যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন।’ (উমদাতুল কারি : ২১/৪২৪)। রাসুলুল্লাহ (সা.) মুয়াবিয়া (রা.) এর জন্য দোয়া করেছেনÑ ‘হে আল্লাহ! তুমি তাকে সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখ এবং তার দ্বারা মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করো।’ (তিরমিজি : ৩৮৪২)। 
ইরবাজ ইবনে সারিয়া (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) কে মুয়াবিয়া (রা.) এর জন্য এভাবে দোয়া করতে শুনেছিÑ ‘হে আল্লাহ! তুমি মুয়াবিয়াকে কোরআন ও হিসাব-নিকাশের জ্ঞান শিক্ষা দাও এবং তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করো।’ (মুসনাদে আহমাদ : ১৭১৫২)। হাফেজ জাহাবি (রহ.) উল্লেখ করেন, একদা রাসুলুল্লাহ (সা.) মুয়াবিয়া (রা.) কে সওয়ারির পেছনে বসিয়ে বললেন, ‘তোমার শরীরের কোনো অংশ আমার পীঠের সঙ্গে লেগে আছে? মুয়াবিয়া (রা.) বললেন, আমার উদর। নবীজি (সা.) তখন দোয়া করলেন, হে আল্লাহ, তুমি তার উদরকে ইলম ও হিলম দ্বারা পূর্ণ করে দাও।’ (সিয়ারু আলামিন নুবালা)। 

খোলাফায়ে রাশেদার যুগে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন
মুয়াবিয়া (রা.) আল্লাহ প্রদত্ত অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর খেলাফতকালে তিনি স্বীয় ভ্রাতা এজিদের সঙ্গে দামেস্কের যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। ওমর (রা.) তাকে সিরিয়ার সীমান্ত এলাকায় গভর্নরের দায়িত্ব দেন। উসমান (রা.) তাকে পুরো শামের (সিরিয়ার) আমির নিযুক্ত করেন। ওসমানের শাহাদতের পর হজরত আলী (রা.) এর খেলাফতকালে অমীমাংসিতভাবেই তিনি স্বীয় অবস্থানে থেকে গেলেন। কিন্তু আলীর (রা.) ছেলে হাসান (রা.) এর খেলাফতের বিষয় সাব্যস্ত হলে তাকে এ মর্মে অসিয়ত করেন যে, মুসলিম বিশ্বের বহিরাগত ও ভেতরগত শত্রুদের মোকাবিলা করে ইসলামের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার জন্য মুয়াবিয়া (রা.) এর মতো একজন বিচক্ষণ শাসকের প্রয়োজন। সুতরাং তোমার সম্মুখে যদি সুযোগ আসে, তাহলে খেলাফতের দায়িত্ব তার কাছে সোপর্দ করে দিও। পরবর্তী সময়ে হাসান (রা.) তাই করেছিলেন। এতে মুসলিম উম্মাহর বিভক্তির অবসান হয় এবং মুয়াবিয়া (রা.) সর্বসম্মতিক্রমে মুসলিম বিশ্বের খলিফা নির্বাচিত হন। 

মুয়াবিয়া (রা.) এর প্রশাসনিক দক্ষতা 
হজরত মুয়াবিয়া (রা.) এর প্রশাসিক দক্ষতার কথা সর্বজনবিদিত। তিনি শামে খেলাফতে রাশেদার যুগে যুগে ২০ বছর গভর্নর ছিলেন। তারপর ২০ বছর খেলাফতের দায়িত্ব অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে পালন করেছেন। প্রশাসনিক দক্ষতায় তার চেয়ে অধিক যোগ্য আর কেউ ছিল না। সাহাবি ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) এর পরে মুয়াবিয়া অপেক্ষা অধিক যোগ্য প্রশাসক আর কাউকে দেখিনি। তাকে বলা হলো, তাহলে আবু বকর, ওমর, ওসমান, আলীর ব্যাপারে কী বলবেন? তিনি বললেন, তারা অবশ্যই মুয়াবিয়া থেকে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। কিন্তু প্রশাসন পরিচালনায় মুয়াবিয়া (রা.) ছিলেন সবার চেয়ে অগ্রগণ্য।’ (উসদুল গাবা)। 
তিনি চরম সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে সব ফেতনা দমন করে শান্তি ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনেন। তিনি রাজ্যে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন। তার শাসনামলে অবস্থা এমন ছিল যে, মহিলারা রাতের বেলায় ঘরের দরজা খুলে ঘুমাতেও ভয় করত না। কেউ রাস্তায় পড়ে থাকা জিনিস ছুঁঁয়ে দেখার সাহস করত না। তিনিই সর্বপ্রথম যোগাযোগের জন্য ডাক বিভাগ চালু করেন এবং সরকারি দলিল-দস্তাবেজ সংরক্ষণের জন্য পৃথক বিভাগ চালু করেন। তিনি সেনাবাহিনীকে একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীতে রূপ দেন। তার খেলাফতকালে অনেক দেশ ইসলামের ছায়াতলে আসে। এমনকি পর্তুগাল থেকে চীন পর্যন্ত এবং আফ্রিকা থেকে ইউরোপ পর্যন্ত ৬৫ লাখ বর্গমাইল বিস্তৃত অঞ্চল তার শাসনামলে ইসলামের পতাকাতলে আসে। 
তার অসাধারণ নৈপুণ্যে মুগ্ধ হয়ে ওমর ফারুক (রা.) বলেছিলেন, ‘তোমরা রোম-পারস্য সম্রাটদের বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতা নিয়ে আলোচনা কর অথচ তোমাদের মাঝে রয়েছেন মুয়াবিয়া (রা.)।’ (তাবরানি : ৫/৩৩০)।  
এজিদকে খলিফা নির্বাচনের কারণ
হজরত মুয়াবিয়া (রা.) জীবন সায়াহ্নে উপনীত হলে মুগিরা ইবনে শুবাসহ অনেক নেতৃস্থানীয় সাহাবি পরামর্শ দেন, হজরত ওসমান (রা.) এর শাহাদতের পর মুসলমানদের যে করুণ পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে, তা আপনার সামনেই রয়েছে। অতএব আপনি প্রাদেশিক গভর্নরদের ডেকে আপনার জীবদ্দশায়ই এজিদকে ওলিয়ে আহাদ (পরবর্তী খলিফা) নিযুক্ত করে উম্মতকে রক্তক্ষয়ী হাঙ্গামা থেকে রক্ষা করুন। এ পরামর্শ অনুযায়ী মুয়াবিয়া (রা.) সব গভর্নরের কাছে এ মর্মে পত্র প্রেরণ করেন যে, মুসলমানদের কল্যাণে আমার জীবদ্দশায়ই একজন খলিফা নিযুক্ত করে যেতে চাই। অতএব তোমরা নিজ নিজ পরামর্শ ও তোমাদের মধ্যে যোগ্য ব্যক্তিদের পরামর্শ লিখে পাঠাও। দেখা গেল, বেশিরভাগ পরামর্শ এসেছে এজিদ বিন মুয়াবিয়ার পক্ষে। সুতরাং পরামর্শের ভিত্তিতে হজরত মুয়াবিয়া (রা.) স্বীয় ছেলে এজিদকে খলিফা নিযুক্ত করেছেন। তাছাড়া এজিদ খলিফা হওয়ার আগে মন্দলোক হিসেবে চিত্রিত ছিলেন না এবং খলিফা হওয়ার যোগ্যতা তার মধ্যে পূর্ণরূপেই বিদ্যমান ছিল। পরবর্তী সময়ে তার শাসনামলে কারবালার যে ট্র্যাজেডি সংঘটিত হয়েছে এর দায়ভার হজরত মুয়াবিয়া (রা.) এর ওপর বর্তাবে না। এ কারণে মুয়াবিয়া (রা.) কে দোষারোপ করা হবে চরম অন্যায়।

ইন্তেকাল 
বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী এই মহান সাহাবি ৬০ হিজরিতে ৭৮ বছর বয়সে বর্তমান সিরিয়ার দামেস্কে ইন্তেকাল করেন। সেখানেই তাকে কবরস্থ করা হয়। 

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]