logo
প্রকাশ: ১২:০০:০০ AM, বৃহস্পতিবার, মে ১৬, ২০১৯
প্রকৃতিতে বহুমুখী শক্তির প্রধান উৎস : সৌরশক্তি
আফতাব চৌধুরী

আদিকালে মানুষ পেশিশক্তি এবং পশুশক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল। ধীরে ধীরে মানবসভ্যতার অগ্রগতির পর ১৮৩১ সালে মাইকেল ফেরাডের বিদ্যুৎশক্তি এবং ১৮৭২ সালে জেমস ওয়াটের বাষ্প ইঞ্জিন আবিষ্কারের পর বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসে। তারপর আমাদের শক্তির চাহিদা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। প্রচলিত প্রথায় যেসব উৎসকে কাজে লাগিয়ে আমরা শক্তি উৎপাদন এবং ব্যবহার করি, সেসব উৎস ক্রমে নিঃশেষিত হয়ে আসছে। এগুলোর মধ্যে আছে ভূগর্ভে সঞ্চিত কয়লা, তেল, গ্যাস, বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ। শক্তির চাহিদা ক্রমে বাড়তে থাকলেও আমাদের শক্তি উৎপাদনের উৎসের ভা-ার একেবারে সীমিত। তাই বর্তমান পৃথিবীতে প্রচলিত শক্তির উৎসগুলো ছাড়া অপ্রচলিত বা বিকল্প শক্তির উৎসগুলোকে কাজে লাগিয়ে আমাদের সভ্যতাকে সামনের দিকে নিয়ে যাওয়া অতীব জরুরি।
অপ্রচলিত শক্তির উৎসগুলোর মধ্যে আছে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জৈবশক্তি, ক্ষুদ্র পানিশক্তি, জোয়ারভাটা শক্তি, পানির ঢেউশক্তি, ভূগর্ভস্থ তাপশক্তি ইত্যাদি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিকল্প শক্তির কেন্দ্রবিন্দু হলো সূর্য। প্রচলিত শক্তির উৎসগুলোর কেন্দ্রবিন্দু সূর্য। তবে পার্থক্যটা এই যে, প্রচলিত শক্তির উৎসের ভা-ার যেমন সীমিত অপ্রচলিত শক্তির উৎসগুলোর ভা-ার মোটেও সীমিত নয়।
সূর্য যতদিন থাকবে, সূর্যের আলো, বাতাস, জোয়ারভাটা, পানির ঢেউ, জৈব প্রক্রিয়া ইত্যাদি ততদিন থাকবে। এ শক্তিকে আমরা সরাসরি ব্যবহার করে আমাদের শক্তির প্রয়োজন মেটাতে পারি। এতে আমাদের সীমিত সঞ্চিত শক্তির ভা-ারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে আতঙ্কিত হতে হবে না। তাছাড়া বায়ুশক্তি, জৈবশক্তি এবং অন্যান্য শক্তির উৎস তো আছেই। আগে মানুষ হয়তো ভাবতে পারেনি যে, পৃথিবীতে জ্বালানি সম্পদের ভা-ার একদিন শেষ হয়ে যাবে। তাই এতদিন বিকল্প শক্তির উৎসগুলো নিয়েও মানুষ সে রকমভাবে চিন্তাভাবনা করেনি।
গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে মানুষ দেখল এবং বুঝতে পারল যে, আমাদের প্রচলিত শক্তির উৎসের ভা-ার নিঃশেষিত হয়ে আসছে। তখন থেকে বিকল্প শক্তিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিকল্প শক্তির উৎসগুলোকে মানুষ কাজে লাগাতে শুরু করল। তার মধ্যে প্রধানত আছে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জৈবশক্তি ইত্যাদি।
সূর্য থেকে সরাসরি যে শক্তি পাওয়া যায় তাকে আমরা সৌরশক্তি বলি। সূর্য সব শক্তির উৎস। আগেই বলা হয়েছে, প্রকৃতিজাত প্রায় সব শক্তির উৎস হলো সৌরশক্তি। তবে এর ব্যতিক্রম রয়েছে যেমন জোয়ারভাটা থেকে উদ্ভূত শক্তি, যার মূলে রয়েছে চন্দ্র-সূর্য পৃথিবীর পারস্পরিক আকর্ষণ বল। প্রায় সব জীব ও বৃক্ষের জীবনী শক্তির উৎসস্থল সৌরশক্তি। সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়া এবং খাদ্য শৃঙ্খলের মাধ্যমে উদ্ভিদ এবং প্রাণিকুল সৌরশক্তিকে দেহে সঞ্চিত করে রাখে। সঞ্চিত এ শক্তির এক উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় হয় বিভিন্ন জৈবিক ক্রিয়ায় এবং বাকিটা সঞ্চিত থাকে জীব দেহে। ঝড়-ঝঞ্ঝা, ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে এসব জীবদেহ এবং উদ্ভিদ মাটিতে চাপা পড়তে পারে। এ অবস্থায় লাখ লাখ বছর ধরে এসব জৈব পদার্থগুলোর মধ্যে অতি ধীরে ধীরে চলতে থাকে রাসায়নিক পরিবর্তন। ফলে সৃষ্টি হয় কয়লা, পেট্রোলিয়াম, প্রাকৃতিক গ্যাস ইত্যাদি। এরা জীবাশ্ম জ্বালানি নামে পরিচিত। এ জীবাশ্ম জ্বালনির ওপর অনেকাংশে নির্ভর করছে আজকের সভ্যতা। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, আধুনিক সভ্যতার ধারক জীবাশ্ম শক্তি হলো আসলে বহু দিনের সঞ্চিত শক্তি।
এরপর আসা যাক বায়ুশক্তিতে। আমরা জানি, বায়ুপ্রবাহের কারণ হলো বিভিন্ন স্থানে বায়ুচাপের তারতম্য। বায়ু উচ্চচাপ থেকে নিম্নচাপযুক্ত অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়। বায়ুচাপের এ পার্থক্য ঘটে আবার ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন স্থানের উষ্ণতার তারতম্যের জন্য। কারণ আমরা দেখেছি সূর্যরশ্মির তীব্রতা ভূপৃষ্ঠের সর্বত্র সমান হয়। এভাবে সৃষ্টি হয় নিয়ত বায়ু, আয়নাবায়ু, পশ্চিমা বায়ু ও মেরু বায়ু। এছাড়া আছে সাময়িক বায়ু যেমন স্থল বায়ু, সমুদ্র বায়ু, মৌসুমি বায়ু ইত্যাদি। সেগুলো সৃষ্টির কারণ দিনের বিভিন্ন সময়ে ও বছরের বিভিন্ন ঋতুতে উষ্ণতা ও চাপের পার্থক্য। কাজেই বায়ুশক্তি প্রকৃতপক্ষে সৌরশক্তি ও মধ্যাকর্ষণ শক্তির মিলিত ফল। মধ্যযুগে, বিশেষ করে অষ্টাদশ শতাব্দীতে শিল্প বিপ্লবের আগে পর্যন্ত এ বায়ুশক্তিই ছিল বড় বড় শিল্পের যান্ত্রিক শক্তির প্রধান উৎস। এছাড়াও এ বায়ুশক্তি পাল তোলা নৌকা এবং জাহাজে ব্যবহৃত হতো।
আবার নদনদী প্রভৃতি পানিধারার অন্তর্নিহিত শক্তি হলো সৌরশক্তি ও মধ্যাকর্ষণ শক্তির মিলিত ফল। সৌরশক্তি নদনদী ও সমুদ্রের পানিকে বাষ্পীভূত করে জলীয়বাষ্প সৃষ্টি করছে। এ জলীয়বাষ্প আবার বৃষ্টি বা তুষার হয়ে ভূপৃষ্ঠে নেমে এসে নদনদী বা হিমবাহের রূপ নিয়ে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রে মিলিত হচ্ছে। নদনদীর এ স্রোত থেকে উৎপন্ন করা হচ্ছে পানিবিদ্যুৎ। পানি বিদ্যুতের মতো তাপবিদ্যুতেও সৌরশক্তির অবদান কম নয়, এ বিষয়ে আগেও আলোচনা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে জ্বলানি হলো কয়লা, গ্যাস কিংবা তেল, আবার আমরা জানি জ্বালানি তেল অথবা কয়লার সঞ্চিত শক্তি হলো সৌরশক্তির রূপভেদ। 
সমুদ্র পানির উষ্ণতা ও লবণাক্ততার পার্থক্য ইত্যাদি থেকেও বর্তমানে বিদ্যুৎ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। এসব কিছুর কারণ হলো সৌরশক্তি। সুতরাং দেখা যাচ্ছে প্রকৃতিতে শক্তির যে বহুমুখী প্রবাহ চলছে তার উৎস প্রধানত একটিই, তা হলো সৌরশক্তি। হ

ষ আফতাব চৌধুরী
সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]