logo
প্রকাশ: ১২:০০:০০ AM, রবিবার, জুন ১৬, ২০১৯
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কঠোর হতে হবে
আফতাব চৌধুরী

অনেকেই মনে করেন বর্তমানকালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সম্পর্কে আমাদের ধারণা ও উদ্যোগ সম্পূর্ণ আধুনিক। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। নির্বাধ, নির্বিচারে ও নৃশংসভাবে বন্যপ্রাণী নিধন করার ফলে অদূর ভবিষ্যতে মানব সভ্যতার অবলুপ্তির সম্ভাবনা হওয়ায় এ আতঙ্ক থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্যই আমরা হালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য এতটা উৎসাহী। কাজেই আমাদের এ কাজে এগিয়ে আসাটা প্রয়োজন ভিত্তিক। কিন্তু প্রাচীনকালে বন্য পশুপক্ষী রক্ষণটা ছিল মৌলিক ও আত্মিক। কেননা তারা বন্যপ্রাণী রক্ষণের ব্যাপারে শুধু সজাগই ছিলেন না, তারা বনাঞ্চল, বন্যপ্রাণী ও মানুষকে বিশ্ববোধের পরিপ্রেক্ষিতে দেখতেন। ইংরেজিতে আমরা যাকে ফরেস্ট বলি সে শব্দটা এসেছে ফারসি শব্দ থেকেÑ যার অর্থ হচ্ছে ‘বাহির’। কাজেই বনাঞ্চলকে আমরা জনাঞ্চল থেকে পৃথকভাবেই দেখতে অভ্যস্ত। বন্যপ্রাণী হিংস্র এবং বনাঞ্চল বিপদসঙ্কুলÑ এ ধারণা নিয়েই আমরা বড় হচ্ছি। কাজেই বনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বড়ই দূরসম্পর্কের।

কিন্তু প্রাচীন যুগে এমনটা ছিল না। তখন বনাঞ্চল ছিল তপোবন। প্রাচীন জনগণ জীবনের চারটি আশ্রমের তিনটি আশ্রমই কাটাতেন বনেই। বন্য পশুপক্ষীদের পরিবেশেই। তারা আত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখতেন অরণ্যকে। তাই তাদের বন্যপ্রাণী চেতনা ছিল গভীর ও অকৃত্রিম। প্রাচীন সাহিত্য রচিত হয়েছিল অরণ্যেই। এ বিষয় সম্পর্কে প্রাচীন ইতিহাস ও সাহিত্য কী বলেÑ দু-চারটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ধ্বংসপ্রাপ্ত মহেঞ্জদারো সভ্যতার আবিষ্কৃত সিলমোহরে অঙ্কিত ষাঁড়, হাতি, গ-ার, বাঘ প্রভৃতি থেকেই প্রমাণিত হয় বন্যপ্রাণীদের প্রতি সে প্রাচীন যুগের মানুষের মনোভাব ও ভালোবাসার কথা। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বন্যপ্রাণী রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। তপোবনে ও অভয়ারণ্যে বন্য পশুপক্ষী হত্যা করা নিষিদ্ধ ছিল, তারও উল্লেখ রয়েছে। চতুষ্পদ জন্তু, পাখি প্রভৃতির হত্যা নিষিদ্ধ ছিল এবং নিষেধ অমান্যকারীদের ওপর কঠোর দ-দানের বিধানও ছিল। প্রাচীনকালে এ অঞ্চলে এমন কতকগুলো এলাকা ছিল যেখানে সবরকম চতুষ্পদ প্রাণী, পাখি, এমনকী মাছ পর্যন্ত হত্যা করা নিষিদ্ধ ছিল।

এবার আসা যাক প্রাচীন সাহিত্যে। উদাহরণটা কালিদাসের ‘শকুন্তলা’ থেকেই নেওয়া যাক। শকুন্তলা পতিগৃহে যাত্রা করবেন। এখন কর্ণমুনির আশ্রমের কী করুণ দৃশ্য! আশ্রমের সম্পূর্ণ পরিবেশ শকুন্তলার বিরহে বিমর্ষ ও কাতর। হরিণগুলো তাদের আহার ছেড়ে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। শকুন্তলা পালিত মাতৃহারা মৃগ শিশু তার অঞ্চল ধরে টানছে। প্রকৃতি এবং নিম্নপ্রাণীদেরও মানুষের সঙ্গে কী অকৃত্রিম সংযোগ! প্রাচীনদের সঙ্গে প্রকৃতির এ নিবিড় সম্পর্ক আমাদের ইংরেজি কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থের বিখ্যাত লাইনগুলো মনে করিয়ে দেয়Ñ ঞড় যবৎ ঋধরৎ ড়িৎশং ফরফ ঘধঃঁৎব ষরহশ ঃযব যঁসধহ ংধহফ ঃযধঃ ঃযৎড়ঁময সব ৎধহ ধহফ সঁপয রঃ মৎরবাবফ সু যবধৎঃ ঃড় ঃযরহশ যিধঃ সধহ যধং সধফব ড়ভ সধহ.

ঠিক লিখেছেন কবি। মানুষই মানুষের সর্বনাশ ডেকে আনছে নিজেদের লোভ চরিতার্থ করার জন্য নির্দ্বিধায় অবৈধভাবে বনাঞ্চল ও বন্য পশুপক্ষীর বিনাশ সাধন করে। সংবাদপত্র খুললেই দেখবেন, বিবেকহীন ও অদূরদর্শী চোরাকারবারিরা সব সরকারি বিধিনিষেধ অমান্য করে একের পর এক বন থেকে কাঠ পাচার করে দিন দিন বনাঞ্চলকে স্ফীত করছে। যারা মনে করেন বন্যপ্রাণী হিংস্র তারা স্বীকার করবেন কি না জানি না, মানুষ এই হিংস্র থেকেও অধিকতর হিংস্র। তাই তো কাঠ চোরাকারবারিরা ও চোর শিকারিরা বিষ, করাত, হেসো, রাইফেল, বন্দুক নিয়ে বনে ঢুকে অগণিত পশুপাখি ও মূল্যবান গাছগুলো বিনাশ করছে। সংবাদপত্রগুলো খুললেই খ-বন তো বটেই; এমনকি সংরক্ষিত বনেও দেখা যায় লোভতাড়িত নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছে খড়গহীন মৃত, মৃত চিতার বস্তা বন্দি হাড়, এমনকি ‘লর্ড-অব জঙ্গল’ অর্থাৎ বাঘেরও গলিত মৃতদেহ।

এভাবে বনজসম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার, বন্যপ্রাণীদের নির্দ্বিধায় হত্যা ও তাদের চামড়া, শিং, দাঁত ও হাড় নিয়ে ব্যবসা, গণবিস্ফোরণ ও তাদের বসবাসের জন্য খ- বনগুলোতে বাসস্থান স্থাপন করে তোলা, খাদ্যানুসন্ধানে লোকালয়ে বানর, হাতি, বাঘ প্রভৃতি বন্যপ্রাণী হানা দেওয়া, বড় বড় শহর ও নগরের ক্রম বিস্তৃতি, যা শুধু যে বনসঙ্কোচ ঘটাচ্ছে তা নয়, অনেক প্রজাতির বন্য পশুপক্ষীরও পৃথিবী থেকে চিরতরে বিলুপ্তি ঘটাচ্ছে। পৃথিবী থেকে দুই খড়গী গ-ার ও শিকারি চিতা আজ প্রায় নিশ্চিহ্ন। মরিশাস দ্বীপের ডো-ডো পাখি এবং সুন্দরবনের এক খড়গবিশিষ্ট  ছোট গ-ার প্রায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত।

সবচেয়ে লজ্জাকর ব্যাপার আমেরিকায় ঔপনিবেশ স্থাপনের পর রেড ইন্ডিয়ানদের প্রধান খাদ্য মহিষের মাংস থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে সরকারের নির্দেশে সেখানকার মহিষকুলের বিলুপ্তি ঘটানো। সুন্দরবনের কর্মকর্তাদের সম্প্রতি রিপোর্ট অনুযায়ী, অবৈধভাবে বনাঞ্চল ধ্বংস করার ফলে বাঘের আবাসস্থল ও বিচরণ ভূমির সংকোচন হয়েছে এবং পর্যাপ্ত খাদ্যাভাবে বাঘগুলো ছোট হয়ে যাচ্ছে। যেখানে একটি সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক বাঘের ওজন ১৪০ কিলোগ্রাম ছিল, এখন তা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯৮ কিলোগ্রামে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে ৪০ থেকে কোনো কোনো স্থানে ৭০ শতাংশ বনাঞ্চল এরই মধ্যে তিরোহিত। যদি এভাবেই চলতে থাকে তা হলে আমাদের এ বৈচিত্র্যময় পৃথিবী একদিন মরুভূমিতে পরিণত হবে। তাই মানবজীবনও সভ্যতার পরমায়ুর জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়েছে বন সংরক্ষণ। 

আমাদের এ অঞ্চল মূলত কৃষিভিত্তিক। শিল্প বাণিজ্যের ক্রমোন্নতির যুগেও ৭০ শতাংশ লোক কৃষির ওপর নির্ভরশীল। সেই কৃষিকার্যে রয়েছে বন্যপ্রাণী, পাখি ও কীটপতঙ্গের বিরাট ভূমিকা। প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য তাদের অবস্থিতি একান্ত প্রয়োজন। বস্তুত মানবসমাজ ও প্রাণিজগতের মধ্যে আছে এক নিবিড় সম্পর্ক। প্রাণিজগতের আমাদের সবার সম্পর্ক হচ্ছে খাদ্যখাদক সম্পর্ক এবং এ সম্পর্কই সুদূর অতীত থেকে রক্ষা করে আসছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। একটি ছাড়া অন্যটি টিকে থাকা অসম্ভব। তাই আমাদের নিজেদের কল্যাণের জন্যই যে আমাদের পশুপক্ষী সংরক্ষণ একান্ত আবশ্যক, বিশেষ করে বর্তমান অবৈধ, ঢালাও ও নির্বিচারে বন্যপ্রাণী নিধনের যুগে তা সবাইকে বুঝতে হবে। আমরা বন্যপ্রাণীকে তিন ভাগে বিভক্ত করতে পারি। একশ্রেণির বন্যপ্রাণী, যারা একেবারে নিশ্চিহ্নÑ যারা আর ফিরে আসবে না। আরও একশ্রেণি, যারা কমতে কমতে এখন শেষ পর্যায়ে যাদের আমরা বিরল প্রাণী বলে থাকি, আরও একশ্রেণি, যারা মানুষের লোভ এবং প্রাকৃতিক পরিবর্তন সত্ত্বেও মোটামুটি তাদের সংখ্যাটা বজায় রেখেছে।

আমাদের এ সংরক্ষণ চেতনা দেরিতে হলেও সময় এখনও আছে। তবে এই সংরক্ষণের কাজটা যেমন অত্যন্ত জরুরি, তেমনই দুরূহ। সরকার অগ্রণী ভূমিকা নিলেও যতদিন না জনসাধারণ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে এগিয়ে না আসবে, এ সমস্যার সমাধান হবে না। এরই মধ্যে সরকার অনেক কঠোর আইন প্রণয়ন করেছে, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য রিজার্ভ ফরেস্ট, ওয়াইল্ড লাইফ স্যাঙ্কচিউয়্যারি, ন্যাশনাল পার্ক স্থাপন করেছে, এমনকি সম্প্রতি বন্যপ্রাণী স্থানান্তর করছে সরকার। যদি সরকারের ভূমিকা যথেষ্ট হতো তা হলে বিরল প্রজাতির পশুপক্ষী বিলুপ্ত হচ্ছে কেন? সেজন্য সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে ও বন্য পশুপক্ষী রক্ষার জন্য সদর্থক নিষ্ঠাভরা যৌথ উদ্যোগ নিতে হবে। বন সংকোচন বন্ধ করতে হলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই জরুরি হয়ে পড়েছে। বন্যপ্রাণীদের পর্যাপ্ত আহার ও অবাধ বিচরণের জন্য প্রয়োজন বনাঞ্চলে বসবাসকারীদের তাদের দখলিকৃত স্থান থেকে উৎখাত করে এসব স্থানকে পুনরায় সবুজ করে তোলা। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও বন সংকোচন রোধ করার জন্য সরকার যেসব বিধিনিষেধ জারি করেছে, সেগুলো যাতে যথারীতি রূপায়িত হয়, তা সরকার ও জনসাধারণের যুগ্ম দায়িত্ব। প্রতিটি সংরক্ষিত এলাকায় বন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় সশস্ত্র পাহারাদারদের নিযুক্তি দিতে হবে, রাখতে হবে জবাবদিহিতার ব্যবস্থা। চোরা শিকারিদের জন্য থাকতে হবে কঠোর আইনি ব্যবস্থা। রিজার্ভ ফরেস্ট ছাড়াও খ-বনগুলো যাতে জনবসতিমুক্ত থাকে, তাতে সরকারি খবরদারি রাখতে হবে। বিরল প্রজাতির প্রাণীগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেশের চিড়িয়াখানাগুলোর ওপর ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। দেশের উন্নতি এবং অগ্রগতি অব্যাহত রেখেও যাতে বায়ু প্রদূষণ একেবারে সীমিত থাকে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। ঝিলে-বিলে বাড়িঘর নির্মাণ করে পরিযায়ী পাখিদের কলরব স্তব্ধ করা ঠিক হবে না।

প্রাণীদের স্থানান্তরের আগে বনবিভাগকে দেখতে হবে পরিবর্তিত বনের ভিন্ন পরিবেশ ও আবহাওয়া প্রেরিত বন্যপ্রাণীদের বাঁচার ও বৃদ্ধির অনুকূল কি না। সেখানে তাদের বেঁচে থাকার জন্য পর্যাপ্ত পশু ও বনভূমি আছে কি না। তা না হলে সংখ্যা বৃদ্ধি করতে গিয়ে সংখ্যা হ্রাসই হবে। দেখা গেছে যেসব প্রাণীকে সংরক্ষণ করলে আর্থিক ফায়দা হয়, সেগুলো সংরক্ষণেরই বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে; আর যেসব প্রাণী সে উদ্দেশ্য সাধনে অসমর্থ, তারা কাগজেকলমে সংরক্ষিত বললেও হাজারো হাজারো এ জাতীয় প্রাণী ধীরে ধীরে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। তাই সামগ্রিকভাবে তাদের অকৃত্রিমভাবে ভালোবাসতে হবে এবং তাদের সঙ্গে সংযোগ পুনঃস্থাপন করতে হবে। বন্য পশুপক্ষীদের অস্তিত্ব কিছুসংখ্যক মানুষের ওপর নির্ভর করবে, তা কখনও হতে পারে না। আর মনে রাখতে হবেÑ গাছপালা, বন, বন্যজন্তু, পশুপাখি না থাকলে মানুষের অস্তিত্বই একদিন বিলীন হয়ে যাবে। হ

 

ষ আফতাব চৌধুরী 

সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]